গণপূর্তের প্রকল্প অনেক, কিন্তু গতি নেই

  • সাজিদুল হক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-02-28 12:05:45 BdST

bdnews24
উত্তরায় রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের এসব ভবনের ফ্ল্যাট নির্ধারিত সময়ে না পেয়ে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন বরাদ্দপ্রাপ্তরা; গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনেক প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চললেও ভৌত কাজই শুরু হয়নি।

চট্টগ্রামে ৩৬টি পরিত্যক্ত বাড়ির জায়গায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি প্রকল্প হাতে নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। এক হাজার ১৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকার ওই প্রকল্প এ বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কাজটির ভৌত অগ্রগতি মাত্র এক শতাংশ।

এ প্রকল্পের আওতায় আটটি প্যাকেজে ৩৫টি বাড়ি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ছয়টি প্যাকেজে ২৮টি ভবন নির্মাণে চুক্তি হয়েছে। দুটি প্যাকেজ নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। বাকিগুলোর কাজ শুরুর বিষয়ে যেটুকু অগগ্রতি হয়েছে তা শুধুই নথিপত্রের। বাস্তব কাজ শুরু হয়নি।

  গণপূর্ত অধিদপ্তর রাজধানীর সোবহানবাগ মসজিদের আধুনিকায়ন এবং ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণে ২০১৯ সালের মার্চ মাসে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রায় ৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই কাজেরও ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র এক শতাংশ।

একই অবস্থা সংসদের একটি প্রকল্পের। ২৩৩ কোটি ৯২ লাখ ৭ হাজার টাকার এই প্রকল্প শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এ প্রকল্পের কাজের ভৌত অগ্রগতিও এক শতাংশ।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে জমা পড়া ওই প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের আওতায় বর্তমানে ১০২টি প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে গণপূর্ত অধিপ্তরের ৩৩টি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৩২টি, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) হাতে রয়েছে ১০টি প্রকল্প। বাকিগুলো এই মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য বিভাগের হাতে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের হাতে থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১৯টি প্রকল্পের অগ্রগতি ৩০ শতাংশ বা তার নিচে। এর মধ্যে ১৪টি প্রকল্পের কাজ এ বছরে শেষ করার কথা।

২০১৯ সালের জুলাই মাসে ঢাকার অফিসার্স ক্লাবের বহুতল ভবন নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যা এ বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সে কাজের অগ্রগতি শূন্য। দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে মাত্র।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আটটি প্রকল্পের কাজ এ বছরে শেষ করার কথা। কিন্তু সেগুলোর একটির কাজেও ৫০ শতাংশ অগ্রগতি হয়নি।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালের জুলাই মাসে হবিগঞ্জের সদর উপজেলায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। প্রায় সাত একর জমিতে ১৩২টি প্লট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে এ প্রকল্পের আওতায়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এই কাজের দরপত্র যাচাই করা হচ্ছে মাত্র। 

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও মনে করছে, মন্ত্রণালয়ের হাতে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি ‘ভালো নয়’।

কাজের অগ্রগতি তদারকির দায়িত্বে থাকা এই কমিটির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মন্ত্রণালয় যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে যা দেখেছি, সেটি সন্তোষজনক নয়। কাজের গতি ভালো নয়।”

প্রকল্পের কাজের ধীর গতির কারণ জানতে চাইলে সাবেক এই গণপূর্ত মন্ত্রী বলেন, “আসলে মন্ত্রণালয় যে পদ্ধতিতে কাজ করছে সেটাতে পরিবর্তন আনতে হবে। সিস্টেমের কারণে এই কম গতি, ডায়নামিক নয়।”

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের দেশে সাধারণ প্রকল্পগুলো তাড়াহুড়া করে নেওয়া হয়। যখনই বাস্তবায়নে যাওয়া হয় দেখা যায়, চলমান কাজ বাস্তবতার নিরিখে কিছু সংঘর্ষে পড়ছে। তখন জটিলতা শুরু হয়। সময় বেশি লাগে।

“সময় বেশি লাগলে খরচ বেশি লাগে। তখন ডিপিপি সংশোধন করতে হয়। ঠিকাদার তখন খরচ কমাতে চায়। কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উন্নত বিশ্বে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করা হয়। সেখানে সময় বেশি দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “আমাদের এখানে সংস্কৃতি হচ্ছে, কোনোভাবে কাজে নেমে যাও। তারপর প্রকল্প সংশোধন করে করে এগিয়ে যাও। এটি অত্যন্ত খারাপ সংস্কৃতি।”

সরকারের মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “যে অনেক দিন ধরে কাজ করতে পারবে, এমন মানুষকে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। এমনও দেখা গেছে সাত বছরে আটজন প্রকল্প পরিচালক বদল হয়েছে। এটা বন্ধ করতে হবে। যারা উঁচু পদে আছেন তাদেরই যে প্রকল্প পরিচালক থাকতে হবে এমন নয়। তারা পর্যবেক্ষণের কাজে থাকতে পারেন। প্রকল্প পরিচালক বারবার পরিবর্তন হলে কাজের গতি কমে যায়।”

রাজউকের বহুল আলোচিত ঢাকার উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ৪২ শতাংশ। ২০১১ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পে ব্লকের কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে, যদিও ছয়টি ভবন নির্মাণ এখনও বাকি রয়েছে।

অগ্রগতিতে পিছিয়ে রয়েছে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প এলাকার আবাসিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও। ২০১৭ সালের জুলাইতে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের জুন মাসে। অথচ এই প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি পাঁচ শতাংশ।

এদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) হাতে থাকা ১১টি প্রকল্পের কাজ সবগুলোরই ৩০ শতাংশের বেশি হলেও সময় হিসাবে তা পিছিয়ে রয়েছে।

বন্দর নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের জুন মাসে। এই কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের জুন মাসে। এই প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৩৮ শতাংশ। এতদিনে প্রাথমিকভাবে খালের ময়লা কাদা ও মাটি অপসারণ করা হয়েছে।

শহরের লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প শুরু হয় ২০১৭ সালের জুলাই মাসে। এ বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ হয়েছে ৩৫ শতাংশ।

১৬ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ের সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারে ১১৬টি পিয়ারের মধ্যে ১১০টির কাজ শেষ হয়েছে।

বন্দরনগরীর নাসিরাবাদে সিডিএ স্কয়ার প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে। গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের ভৌত অগ্রগতি ৪৫ শতাংশ। অগ্রগতির হিসাবে মন্ত্রণালয় বলেছে, নির্মিতব্য ১৬৫টি ফ্ল্যাটের ১৩১টির বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। আগামী বছরের জুন মাসে এই কাজ শেষ হওয়ার কথা। অথচ কাজের অগ্রগতি মাত্র ২৮ শতাংশ।

রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা চারটি প্রকল্পের মধ্যে ২০১৩ সালে শুরু হয় দুটির কাজ। এগুলোর একটি চলতি বছরের জুন মাসে এবং আরেকটি ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। অথচ এ দুটি প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৬৮ ও ২ শতাংশ।    

চারটি প্রকল্পের বাকি দুটি নেওয়া হয় ২০১৭ সালে। এ বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু একটির অগ্রগতি ৪১ শতাংশ এবং আরেকটির ২৫ শতাংশ।

স্থপতি ইকবাল হাবীব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গণপূর্তের বিভিন্ন কাজে একটি অসাধু চক্র কাজ করছে দীর্ঘ দিন ধরে। এই চক্র কলুষিত পরিবেশ তৈরি করেছে। সরকার যখন জুয়াড়ি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নিল তখন দেখা গেল গণপূর্তেও সেই একই চক্র। এর মধ্যে বালিশকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনা সামনে আসল। তখন অনেক কাজ স্থবির হয়ে গেল।

“কারণ এই চক্র অনেক কাজের ঠিকাদার। এরা গায়েব হয়ে গেল। এখানে কাজের গতি স্থবির হয়ে পড়ল। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিশেষ করে আইএমইডি কিছু অনুশাসন দিল। কাজের মাঝপথে পুনর্বীক্ষণ করতে বলল। এখানে একটু গতি হোঁচট খেল।”

তার মতে, গণপূর্তের দপ্তরগুলো সরকারের ‘কোপানলে পড়েছে’। অনেক বদলি-শাস্তি ইত্যাদি হয়েছে।

“এসব কিছু মিলে এই মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি কমে গেছে। তবে এটা আমি পজিটিভভাবে দেখি। একটু গতি কম হলেও সদি স্বচ্ছতা আসে তবে ভালো।” 

প্রকল্পগুলো থমকে থাকার কারণ জানতে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদকে গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েকবার ফোন করে এবং এসএমএস পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। সচিব শহীদ উল্লা খন্দকারও ফোনে কথা বলতে চাননি।