পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

নিয়মিত টিকাদানে ভাটা, স্বাস্থ্যঝুঁকির চোখরাঙানিতে শিশুরা

  • কাজী নাফিয়া রহমান, নিজস্ব প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-06-21 23:52:31 BdST

মিরপুর-১০ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে রোববার সাড়ে ১০ মাস বয়সী মেয়েকে হাম ও রুবেলার প্রথম ডোজ টিকা দিতে এসেছিলেন আফরোজা ইসলাম। প্রায় দুই মাস আগে টিকা দেওয়া কথা থাকলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেশি থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তখন সারতে পারেননি।

শঙ্কার এই সময়ে যখন করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে দেশে তোড়জোড় চলছে, তখন শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ভাটা পড়েছে। ফলে তাসনিয়ার মতো অনেক শিশু সঠিক সময়ে টিকা নিতে পারছে না।

এমন বাস্তবতায় ভবিষ্যতে অন্য কোনো মহামারীর বিষয়ে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে টিকাবঞ্চিত শিশুদের তালিকা করে তাদের টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুদের যক্ষ্মা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি জনিত রোগ, নিউমোকক্কাল জনিত নিউমোনিয়া, হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ টিকাদানে বিশ্বের সফল দেশগুলোর একটি। তবে মহামারীর মধ্যে যে সে কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে, সেটি বলছেন সরকারের কর্মকর্তারাও।

২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর সাধারণ ছুটির বিধিনিষেধের মধ্যে অন্যান্য কার্যক্রমের মত টিকাদান কর্মসূচিও বাধাগ্রস্ত হয়। চলতি বছরও মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ বিধিনিষেধ চলায় এই কর্মসূচিকে কক্ষপথে ফেরানোর প্রক্রিয়া হোঁচট খাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) প্রোগ্রাম ম্যানেজার মাওলা বক্স চৌধুরী বলছেন, গতবছর শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল, এ বছর তার চেয়ে অবস্থা কিছুটা ভালো। তারপরও মহামারী পূর্ব সময়ের তুলনায় টিকা দেওয়ার হার অনেকটাই কম।

“আমরা ইপিআই থেকে মনিটরিং এবং সুপারভিশন করছি সব সময়। ২০১৯ সালে টিকার ফ্লো যেমন ছিল, তেমন করার চেষ্টা করছি। তবে ২০২০ সালে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল; ২০২১ সালে ওরকম হয়নি।”

টিকাদান প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “সংক্রমণ হার অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় লকডাউন হচ্ছে, সেসব জায়গা থেকে মানুষজনকে বের হতে বারণ করা হচ্ছে। এগুলোতে একটু হলেও টিকাদানে সমস্যা হচ্ছে।

“আমরা বিষয়গুলো খুবই নজরদারিতে রাখি। যখনই কোনো এলাকায় সংক্রমণ কমে আসে, তখনই যারা লেফট আউট হল, তাদেরকে চিহ্নিত করে পরের মাসে টিকাটা দিয়ে দিই।”

টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এ কার্যক্রমের গতি কমে যাওয়ার কথা বলছে।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের অ্যাডমিন ও ফাইনান্স বিভাগের পরিচালক আহসান হাবীব বলেন, “আগের মত তো ফ্লো এখন নেই। একটু হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ফোনে ইপিআই, নন-ইপিআই দুই ক্ষেত্রেই যোগাযোগ করছি। যাদের টিকা মিস হচ্ছে, ফোনে তাদের টিকাকেন্দ্রে এসে টিকা নিতে বলছি। অনেকে আসছেনও।”

তবে গত বছরের তুলনায় এবার অবস্থার উন্নতি হওয়ার কথা জানান আহসান হাবীব।

বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ‘সূর্যের হাসি’ ক্লিনিকের পল্লবী শাখার মেডিকেল স্পেশালিস্ট নাহিদ ফারহানা চৌধুরীও জানান, গত বছরের এপ্রিল-মে মাসের মত অবস্থা এখন নেই।

“শিশুরা সময়মত টিকা পেল কিনা- এগুলো আমরা রেগুলার ফলোআপ করছি। কেউ টিকা দিতে না আসলে ফোন করে আসতে বলছি। আমাদের কেন্দ্রে আসতে না পারলে পার্শ্ববর্তী কেন্দ্র থেকে টিকাটা নিয়ে নিতে বলছি।”

তিনি জানান, শিশুর জন্মের দুই বছরের মধ্যে টিকাগুলো দিয়ে দিলে আর ঝুঁকি থাকে না। তবে নির্ধারিত সময়ে টিকা দিলে তা বেশি কার্যকর হয়।

বিপদ যেখানে

স্বাভাবিক টিকাদান প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়ায় বিপদ দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজীর আহমেদ।

বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেলে তারা অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে সেটি মহামারীর রূপ ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তার। তাতে টিকা নেওয়া শিশুদের জন্যও এসব শিশু ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “যদি বাচ্চাদের সময়মত টিকা দেওয়া না যায় এবং অনেক বাচ্চা ইপিআইর টিকা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে টিকা দ্বারা প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলোতে বাচ্চারা আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রোগের মহামারী হওয়ার একটা ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।”

হামের মত কিছু রোগ মহামারী আকার ধারণ করতে পারে বলেও হুঁশিয়ার করে দেন তিনি।

গত বছরের মার্চে রাঙামাটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে কয়েক শিশুর মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে বে-নজীর আহমেদ বলেন, “রাঙামাটির পাহাড়ে তদন্ত করে দেখা গিয়েছিল, ওরা হামের টিকা নেয়নি এবং সে কারণে ওই এলাকায় হামের বিস্তার ঘটেছে।

“সীমান্তবর্তী এলাকায় যেখানে সংক্রমণ বাড়ছে, সেখানে যদি অনেক মা তাদের বাচ্চাদের টিকা না দেয়; একটা এলাকায় একইসাথে যদি ২০০ থেকে ৩০০ বাচ্চা টিকা না নেয়, তাহলে যে গ্যাপটা তৈরি হল, সেটার কারণে ওখানে একটা মহামারী দেখা দিতে পারে।"

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডিপথেরিয়ার টিকা না দেওয়ায় সেখানে অনেক শিশু আক্রান্ত হয়। কিন্তু যে সমস্যাটা দেখা দেয়, যে বাচ্চাগুলোকে টিকা দেওয়া হয়েছিল, তাদের এবং বড়দেরও ডিপথেরিয়া হতে দেখা যায়। এটা একটা সিরিয়াস ব্যাপার।

“আমরা যদি গর্ভবতী মায়েদের টিটেনাস টিকা দিতে না পারি এবং অনেক ডেলিভারি যেহেতু বাসায় হচ্ছে, সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মা ও নবজাতকের টিটেনাস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”

যা করতে হবে

যেসব শিশু টিকা পাচ্ছে না তাদের তালিকা করে যোগাযোগ করার তাগিদ দিয়ে বে-নজীর আহমেদ বলেন, “(করোনাভাইরাস) সংক্রমণ বেশি এমন এলাকায় যদি টিকাকেন্দ্র হয়, তাহলে পার্শ্ববর্তী এলাকায় কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। যাতে নিরাপদে টিকা দেওয়া যায়।

“যারা টিকা পাচ্ছে না, তাদের প্রায়োরিটি দিয়ে সংক্রমণ কমে যাওয়ার সাথে সাথে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। স্বাস্থ্যকর্মীদের যেহেতু অতিরিক্ত কাজ করতে হবে, সেজন্য তাদের জন্য কিছু ইনসেনটিভের ব্যবস্থা করা; যাতে তারা ড্রপআউট বাচ্চাদের খুঁজে বের করে টিকা দিতে উৎসাহী হয়।”

তবে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন মনে করছেন, টিকা না নেওয়ার ঝুঁকি ততটা গুরুতর হবে না।

“একটা তো ঝুঁকি থেকেই যায়। যদি শিশুর টিকা দেওয়া না থাকে, আর সে সংক্রামক ব্যাধির সংস্পর্শে আসে, তাহলে তার ঝুঁকি বেড়েই যাবে। সেজন্য সরকার, বিশেষজ্ঞ সংস্থা জোর দিচ্ছে যে, রুটিন টিকা যেগুলো, সেগুলো বন্ধ করা যাবে না যতই লকডাউন হোক।

“কারণ অনেক শিশুর একাধারে টিকা মিস হয়ে গেলে, সেটা ভয়ের কারণ হবে। তবে বাংলাদেশ টিকার বিষয়ে বেশ সতর্ক অবস্থানে আছে।”

বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “এক বছরের মধ্যেই নিয়ে নিতে হবে। তারপরও যদি কারও মিস হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করেই টিকা নিতে পারবে।”

বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম চালানোর তাগিদ দিয়েছেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার মাওলা বক্স চৌধুরী জানিয়েছেন, মহামারীর এ সময়ে টিকাদান কর্মসূচি স্বাভাবিক রাখতে  স্ট্যান্ডার্ড অপরেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) করা হয়েছে। এছাড়া যে শিশুরা টিকাবঞ্চিত হয়েছে, সে ঘাটতি কাটাতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

জেলাওয়ারী তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিস্থিতি উন্নতি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

“দুই বা এক মাসের বাচ্চারা যারা টিকা দেয়নি, তাদের লিপিবদ্ধ করে নেক্সট সেশনে তাদের টিকা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আমাদের পুরো মনিটরিং সিস্টেম অনেক শক্তিশালী। ডিভিশন অনুযায়ী আমরা মনিটরিং করি। তারপরও কিছু বাচ্চা হয়ত থাকবে, সেটার জন্যও আমাদের পরিকল্পনা আছে।”

যেসব শিশু টিকার বাইরে থাকবে, তাদের খুঁজে বের করে ঢালাওভাবে টিকা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে এসব শিশুদরে তালিকা করে টিকা দেওয়া হবে।