পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

পুঁজিবাদী উন্নয়নে বিরূপ প্রকৃতি, তার পরিণতি মহামারী: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

  • রাসেল সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-06-23 17:42:30 BdST

bdnews24
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

জীবন সায়াহ্নে এসে বৈশ্বিক এক মহামারীর সাক্ষী হয়েছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এর স্বরূপ বিশ্লেষণ করে তার উপলব্ধি, ‘পুঁজিবাদী উন্নয়ন’ যে প্রকৃতিকে বিরূপ করে তুলছে, তার ফলই এই মহামারী।

জীবনের ৮৫ বছর পেরিয়ে আসা চিন্তাশীল এই ব্যক্তি নিজের জন্মদিনে বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এই উপলব্ধির কথা জানিয়েছেন।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ঘরবন্দি জীবনে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর নানা বিষয় নিয়েই ভাবনায় কাটে এই শিক্ষাবিদের।

করোনাভাইরাস মহামারী বাংলাদেশেও হানা দেওয়ার পর গত বছর নিজের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী কেটেছিল সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর।

বয়সের সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা বাড়ছে, এটাই অর্জন: সিরাজুল ইসলাম  

বছর গড়িয়ে যখন ৮৬ বছরে তিনি পা দিতে যাচ্ছেন, তখন মহামারী আরও চেপে বসার ইঙ্গিতই দেখা দিচ্ছে।

বাম আদর্শে বিশ্বাসী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “এই যে করোনাভাইরাস, এটা অস্বাভাবিক বিষয় না। এটা পুঁজিবাদী সমাজের পরিণতি।

“পুঁজিবাদী ধারার উন্নয়ন আজ দৃশ্যমান। এই উন্নয়নের ফলে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। কেবল তাই নয়, প্রকৃতি বিরূপ হচ্ছে।”

করোনাভাইরাস মহামারী হানা দেওয়ার পর প্রকৃতির উপর মানুষের ‘অত্যাচার’ বন্ধ করার আওয়াজটি আরও জোরেশোরে উঠেছে।

টিকাসহ চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবনে কোভিড-১৯ মহামারীতে লাগাম টানা সম্ভব হলেও তাতেই ভবিষ্যৎ বিপদমুক্ত হবে বলে মনে করেন না তিনি।

“করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের যে শঙ্কা, সেটা আমাদের দেশে কঠিন আঘাত ফেলবে।”

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

করোনাভাইরাস মহামারী পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ উন্মোচন করে দিয়েছে বলেও মনে করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

“সাধারণ মানুষের কোনো নিরাপত্তা নাই। সর্বত্র দুর্নীতি ও অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে। সেই বৈষম্যের কারণে মানুষের উপর মানুষের নিপীড়ন বাড়ছে। এগুলো পুঁজিবাদী সমাজের দুর্বলতা, করোনার আক্রমণ সেই দুর্বলতাকে আরও প্রকটভাবে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে।”

মহামারীকাল শিক্ষা ব্যবস্থায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক।

“শিক্ষার্থীদের মনোজগতে, মানসিক স্বাস্থ্যে একটা বড় রকমের আঘাত এসেছে। সেটা কতটা দৃশ্যমান হবে, জানি না। তবে রাষ্ট্রের উচিৎ বিষয়টাতে গুরুত্ব দেওয়া। শিক্ষাকে যে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ ছিল, সেটা দেওয়া হয়নি। বাজেটে শিল্প কারখানাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এরকম শিক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ।”

যা ভাবি তাই শতভাগ সঠিক-এই ভাবনা থেকে বেরোতে হবে: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বেকারত্বের কারণে শিক্ষায় আগ্রহ কমছে: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী গ্রামে। তিনি পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল, নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস ও লেস্টার ইউনিভার্সিটিতে। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৫৭ সালে।

শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখিতে সমান সক্রিয় ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রবন্ধ, অনুবাদ ও কথাসাহিত্য মিলিয়ে তার রচিত বই প্রায় ১১০টি।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় তিনি মাসিক পরিক্রমা (১৯৬০-৬২), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা (১৯৭২), ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র (১৯৮৪) ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ‘নতুন দিগন্ত’ নামে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার কাজ করছেন এখনও।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যকর্মে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বাংলা একাডেমি স্বর্ণপদক’, ‘বিচারপতি ইব্রাহিম পুরস্কার’, ‘অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার’, ‘বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবুল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার’ সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৯৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি।

লেখক ব্যবস্থাকে মানলেও, লেখা মানবে না: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিকবার ‘উপাচার্য’ হওয়ার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কোনো হিসাব মেলাতে চান না, বরং যতটুকু অর্জন, তাতেই আছে তার সন্তুষ্টি। আর তার ভাবনায় এখনও রাষ্ট্র-সমাজ।

তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিজীবন নিয়ে আর দূরের কথা ভাবি না। আমি এখন হিসাব করি, প্রতিদিনের হিসাবই। তবে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো আমাকে এখনও ভাবায়।

“আমাদের রাষ্ট্রে যে পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল, সেই পরিবর্তন আসেনি। ব্রিটিশ আমল  ও পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্র যেভাবে আমলাতান্ত্রিক ছিল এবং অর্থনৈতিকভাবে পুঁজিবাদমুখী ছিল, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও সেই ধারাই চলমান।”

ব্যক্তি জীবনের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি যে কাজগুলো করেছি, এগুলোই আমার করার কথা। কিন্তু এই কাজগুলোতে আরও মনোযোগ ও শ্রম দিতে পারলে হয়ত গুণগতভাবে আরও ভালো কিছু করতে পারতাম।

“লেখালেখি করা, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যোগদান করতে পেরেছি, এটাই আমার বড় অর্জন। জীবনের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।”

সময় কাটছে কিভাবে- জানতে চাইলে বলেন, “করোনাকালে ঘরে বসে লেখালেখি করছি, এভাবে কেটে যাচ্ছে সময়।”