পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

ডেল্টায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী যাত্রার শেষ কোথায়?

  • ওবায়দুর মাসুম, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-07-10 00:51:36 BdST

bdnews24
কোভিড রোগে মাকে হারিয়ে কান্না থামছে না শান্তার। নোয়াখালী থেকে দুই দিন আগে এনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তার মা মায়েরা বেগমকে। মঙ্গলবার সকালে তিনি মারা যান। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরনের বিস্তারের মধ্যে সংক্রমণ ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, মৃতের সংখ্যা রয়েছে ১৬ হাজারের ঘরে। সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানোর জন্য ধরনটি প্রধান নিয়ামক হলেও পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বিধি না মানাকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ৮ মে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। করোনাভাইরাসের ভারতে পাওয়া ধরনটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে বি.১.৬১৭। মিউটেশনের কারণে এর তিনটি উপ-ধরন পাওয়া গেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া গেছে বি.১.৬১৭.২।

ইতোমধ্যে প্রায় দুই ডজন দেশে করোনাভাইরাসের এ ধরনটি পৌঁছে গেছে। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম দেয় ডেল্টা ধরন।

সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা সামলে বাংলাদেশে দৈনিক শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছিল মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে।

কিন্তু নতুন করে ডেল্টার ‘সামাজিক বিস্তার বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ ঘটায় জুনের শুরু থেকে দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যু আবার বাড়তে শুরু করে।

এখন ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের’ প্রাধান্য সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বলে গত ৪ জুলাই সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর জানায়।

সেদিন আইইডিসিআর থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে জুনে কোভিড-১৯ রোগীদের নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশই ডেল্টা ধরনে আক্রান্ত। মে মাসে সংগৃহীত নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করে ৪৫ শতাংশে ভারতে উদ্ভূত করোনাভাইরাসের এই ধরনটি পাওয়া গিয়েছিল।

গত এপ্রিলেই দেশে ১ লাখ ৪৭ হাজার কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যা মহামারীর দেড় বছরের মধ্যে এক মাসে সর্বাধিক শনাক্ত। মে মাসে ৪১ হাজার শনাক্তের পর গত জুন মাসে ১ লাখ ১২ হাজার রোগী শনাক্ত হয়, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

জুলাইয়ের প্রথম নয়দিনেই আক্রান্ত হয়েছে ৮৭ হাজার ২৮৫ জন। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৫০১ জনের।

সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানোর জন্য ডেল্টা ধরন প্রধান নিয়ামক বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত জনস্বাস্থ্য পরামর্শক কমিটির কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল।

তবে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্বের বিধি না মানাকেও কম গুরুত্ব দিতে চান না তিনি।

ডা. ফয়সাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডেল্টা ধরনের উৎপত্তি পাশের দেশ ভারতে বলে তা সহজেই বাংলাদেশে চলে এসেছে। এসেই সহজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাজ্যসহ অন্য দেশে পাওয়া ভ্যারিয়েন্টগুলো আসতে সময় লেগেছে।

“এই ভ্যারিয়েন্টের (ডেল্টা) সংক্রমণক্ষমতা বেশি বলে আক্রান্তও হয়েছে বেশি। তবে শুধু দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তা ঠিক না।”

তিনি বলেন, নতুন এই ধরন এখন গ্রামেও ছড়িয়েছে। সেখানে চিকিৎসা নিতে অনীহার কারণে মৃত্যু বেশি হচ্ছে। যখন নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তখন বৃষ্টির মৌসুমও শুরু হয়েছে। বৃষ্টির মৌসুমে মানুষের জ্বর, সর্দি-কাশি স্বাভাবিকভাবেই হয়।

“এটা ধরে নিয়ে তারা (গ্রামের মানুষ) এখনও ‘ডিনায়াল ফেইজেই আছে। সময়মতো হাসপাতালে যাচ্ছে না, পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে বাসায় পড়ে থাকছে। এক সময় যখন খুব কষ্ট হয় তখন হাসপাতালে যায়। সে সময় চিকিৎসা করার কিছু আর বাকি থাকে না, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।”

লকডাউন দেওয়া হলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে সরকারের ‘কিছু বিষয়ে অবহেলা’ ও মানুষের মধ্যে বিধি না মানার প্রবণতাকে ‘সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার’ কারণ হিসেবে তুলে ধরেন এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

“আমরা লকডাউন মানিনি। শুধু বাস ছাড়া সব যানবাহনই চলাচল করেছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হলো, আমরা মাস্ক পরি না। ১০-১৫ শতাংশ মানুষ হয়তো মাস্ক পরেছে। আবার সরকার কঠোরভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারল না। সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। আগ্রহের অভাব রয়েছে। এত কিছুর অভাব থাকলে কীভাবে হবে।?”

বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সংক্রমণের চুড়ায় অবস্থান করছে জানিয়ে ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, এটা আগামী সপ্তাহখানেক ধরে চলতে পারে। এরপর কিছুটা কিছুটা কমতে পারে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “সীমান্তবর্তী জেলাগুলো যেখানে আগে সংক্রমণ শুরু হয়েছে, সেখানে আগে থেকেই লকডাউনসহ বিভিন্ন বিধিনিষেধ দেওয়া হচ্ছিল। সংক্রমণ কমাতে সেখানে কিছু কাজ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ফলে সেসব জায়গায় সংক্রমণ কমছে।

“সংক্রমণ কমার কারণে সেসব জায়গা থেকে ঢাকায় এখন আর রোগী আসবে না। যে কারণে ঢাকায় সপ্তাহ দেড়েক পর কমতে পারে।”

ডেল্টা ধরনে আক্রান্ত হলে ‘লক্ষণ-উপসর্গ’ তেমন দেখা না যাওয়ায় সংক্রমণ নিরবে দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন ডা. এবিএম আবদুল্লাহ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আগে যেটা হতো লক্ষণ উপসর্গ দেখে বোঝা যেতো। কিন্তু ডেল্টা দ্রুত সংক্রমণশীল। এত দ্রুত ছড়ায় যে লক্ষণ বোঝা যায় না। শ্বাসকষ্ট হয়, কাশি হয়, অক্সিজেন কমে যায়। দ্রুত হাসপাতালে না নিলে রোগী মারা যায়। এটাই আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে।”

সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি সবাইকে টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত এই চিকিৎসক।

“এই দুইটা ছাড়া উপায় নাই। কারণ ডেল্টার পরেও যে আরও কোনো নতুন ধরন আসবে না তা বলা যায় না।”

ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে গত ১ জুলাই থেকে সারা দেশে জারি করা লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই গত ৬ জুলাই প্রথমবারের মত দশ হাজার ছাড়িয়ে যায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা।

সেদিন ১১ হাজার ৫২৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ে।

এরপর টানা চার দিন ধরেই দৈনিক শনাক্ত ১১ হাজারের ওপরে রয়েছে। আর টানা ১২ দিন ধরে একশর বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে করোনাভাইরাসে।

এর আগে গত ৭ জুলাই সর্বোচ্চ ২০১ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার ১৯৯ জনের মৃত্যুর পরদিন তা বেড়ে ২১২ জনে দাঁড়ায়।