পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

‘আলগা’ বিধিনিষেধের লাগাম, বেপরোয়া মানুষ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-07-31 15:17:22 BdST

করোনাভাইরাসের অতি সংক্রমণ এবং মৃত্যু ঠেকাতে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধ লাগামে প্রতিদিনই একটু একটু করে ঢিল বাড়ছে।

ঢাকার রাস্তা, অলি-গলিতে বাড়ছে মানুষ ও যান চলাচল, কেনাকাটার ভিড় জমছে বজার, দোকানপাটে। করোনাভাইরাসের অতি সংক্রমণ এবং মৃত্যুতেও যেন কোনো পরোয়া নেই। মানুষকে বিধিনিষেধ মানাতে দিনরাত কাজ করতে করতে ক্লান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও।

এমন অবস্থার মধ্যে আবার রোববার থেকে কলকারখানা খোলার ঘোষণায় রাজধানীতে যেভাবে পারছে ছুটে আসছে হাজার হাজার মানুষ। যারা এখনও সতর্কতাকে সঙ্গী করে দিন কাটাচ্ছেন, তাদের প্রশ্ন এভাবে চলছে লকডাউনের দরকারটা কি? 

ঈদের পর দ্বিতীয় ধাপে শুরু হওয়া কঠোর লকডাউনের নবম দিন শনিবার। এদিন রাজধানীতে শুধু বন্ধ বিপনী বিতানগুলো দেখলেই মনে পড়বে লকডাউন চলছে। কিন্তু সড়কের চিত্র একেবারে ভিন্ন। রিক্সা, ভ্যান, মোটর বাইক ছাড়াও ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন যান চলাচল করছে নির্বিঘ্নে। ফুটপাতে চলাচলও কম না। 

রামপুরা, মালিবাগ, কাকরাইল, শাহজাহানপুর, ফকিরের পুল, দৈনিক বাংলা মোড় ঘুরে এ দৃশ্যই চোখে পড়েছে।

মতিঝিলে একটি বেসরকারি বীমা কোম্পানির কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন বলেন, “অফিস করতে হবে সেজন্য বেরিয়েছি। রাস্তা-ঘাটের যে অবস্থা দেখছেন এটা লকডাউনের জন্য নয়। সাপ্তাহিক ছুটির কারণে যানবাহন চলাচল কম দেখছেন। রোববার দেখবেন এই রাস্তায় কত গাড়ি।”

ফকিরেরপুল বাজারেও দেখা গেল মানুষের ভিড়। ছোটো কয়েকটা খাবার দোকানে সকালের নাস্তা সারতেও দেখা গেছে মানুষজনকে। এই এলাকার একটি মেসে থাকেন হাফিজুর রহমান। ছোট্ট একটি কক্ষে সারাক্ষণ থাকাটা কষ্টকর। সেজন্য প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বের হন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “লকডাউন চলছে জানি। কিন্তু বাইরে বেরুলে তো মনে হয় না লকডাউন। আমরা তো মেসে থাকি। সারাক্ষণ এই ছোট রুমে থাকা যায় না। কিছুটা সময় এদিক-ওদিক ঘুরতে হয়।”

শাহজাহানপুর, মালিবাগের অলি-গলিতে প্রায় অধিকাংশ দোকানপাটই খোলা।

শাহজাহানপুরের মুদি দোকানি আবুল কাশেম বলেন, “বিকাল ৪টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখি। মানুষজন সদাই কিনতে আসে। লকডাউন বলে অনেকে বাজার না গিয়ে এলাকার মুদি দোকানেই আসেন।”

তবে ‘আগের মতো ব্যবসা নেই’ বলে জানান তিনি।

মুগদা, খিলগাঁও, তালতলা এলাকাতেও একই দৃশ্য দেখা গেছে। বেলা ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খুব একটা তৎপরতা দেখা যায়নি।

মুগদা বিশ্বরোড থেকে মাণ্ডা যাওয়ার রাস্তার দুইপাশে বেশ কয়েকটি চালের আড়ৎ। এখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, গত চার-পাঁচদিন ধরে প্রতিদিনই আড়ৎ খুলছেন তারা।

সরদার ট্রেডার্সের আলম সরদার বলেন, “লকডাউনের শুরুতে খুলি নাই। চার-পাঁচদিন হয় সবাই খুলতাসি। আগে ঝাপ ফালায়া রাখতাম। আমারা তো পাইকারি বেচি। এখন খুচরাও বেচতাসি।”

এক প্রশ্নে এই ব্যবসায়ী বলেন, “আগে খোলা রাখতে সাহস পাইতাম না। কোন সময় আবার জরিমানা কইরা বসে। এমনিতেই ব্যবসা নাই। এখন খোলা রাখতাসি, পুলিশ বা কেউ কিছু বলে না।”

আলম সরদারের সাথে কথা বলার সময় অন্যান্য আড়ৎ থেকে জড়ো হন ব্যবসায়ীরা। সবারই এক কথা। খোলা আড়তের ছবি না তোলার অনুরোধ জানান তারা।

খিলগাঁও বাজারেও সব ধরনের দোকান খোলা। ক্রেতাদের ভিড়ও ছিল।

এ বাজারের একটি জেনারেল স্টেরের ব্যবসায়ী আফতাব আলী বলেন, “দোকান খোলা না রাখলে কেমনে চলবে? আমার কিছু বান্ধা কাস্টমার আছে। তারাই ফোন দেয় দোকান খোলার জন্য। কয়েকদিন ঠারেঠুরে আইসা দোকান খুলতাম। এখন সকাল থাইক্কা তিনটা পর্যন্ত খোলা রাখি।”   

পুরান ঢাকার আজিমপুর, পলাশী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও এমন চিত্র দেখা গেছে। মূল রাস্তায় জন এবং যান চলাচল কম থাকলেও অলিগলিতে মানুষের আনাগোনা স্বাভাবিক দিনের মতই।

মিরপুরের রূপনগর, পল্লবী, আরামবাগসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় সব ধরনের দোকানপাটই খোলা দেখা গেছে। কোনো কোনো দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শাটার ফেলে বেচাকেনা করছে। আবার কোনো কোনোটা একেবারেই খোলা। এমনকি কোম্পানির প্রতিনিধিদের বিভিন্ন জেনারেল স্টোরে পণ্য সরবরাহ করতেও দেখা গেছে।

রূপনগরের প্রধান সড়কের সুমী হার্ডওয়্যারের বিক্রেতা হাবিব জানান, কয়েক দিন ধরেই শার্টারের একাংশ খুলে বেচাকেনা চলছে। তবে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “উপায় নেই, নিত্য দিনের ব্যয়ের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই মালিক যেভাবেই হোক কিছু বেচাকেনা করে টাকার ব্যবস্থা করতে বলেছেন।”

সুমী হার্ডওয়্যারের একটু দূরেই রূপনগর থানার টহল পুলিশদের বসে থাকতে দেখা গেছে।

সেখানে একজন পুলিশ সদস্য বলেন, “ডিউটির চাপে আমরাও এখন বিরক্ত। এখন অবসরের সুযোগ পাচ্ছি না। ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছি না। দিনে আঠার ঘণ্টা ডিউটি।”

ওই এলাকার বাসিন্দা জাহিদ পাটোয়ারি বলেন, “ভাই সকাল থেকেই রাস্তায় আছি। সকাল ৯টার দিকে একবার পুলিশ এসে টহল দিয়ে চলে যায়। এরপর আর কেউ আসে না। দেখছি সবাই যার যার মতো দোকান খোলা শুরু করছে। এভাবে চললে লকডাউনের দরকার কি?”