পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

জঙ্গিবাদ বিস্তারের সহজ পথ হয়ে উঠতে পারে রোহিঙ্গারা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-11-26 20:22:55 BdST

bdnews24

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত সময়ে নিজের দেশে না ফেরালে তাদের ঘিরে ‘সহজেই’ জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটার আশঙ্কার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

শুক্রবার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “ভারতীয় হাই কমিশনার এখানে আছেন, তারা আমাদের সহযোগিতা করছেন জানি, আমরা এটুকু বলতে চাই- এই যে ১১ লাখ লোক, এখান থেকেও জঙ্গির উত্থান হতে পারে।

”এটা ইজি প্লে হতে পারে এই সন্ত্রাসীদের জন্য, আমরা যেটা সবসময় বলে আসছি। কাজেই এ সমস্যাটা যদি শিগগির শেষ না হয়, তাহলে হয়ত আমাদের নতুন ডাইমেশনে জঙ্গির ‍উত্থান হয়েও যেতে পারে।”

বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও জরুরি মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। তবে বিপুল সংখ্যক এই শরণার্থী এখন ‘বোঝা’ হিসেবে দেখছে সরকার। 

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের অগাস্টে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কথায় উঠে আসে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ, যাকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলেছে জাতিসংঘ।

আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন আজও শুরু হয়নি।

প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মিয়ানমারকে চাপ দিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।

উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হওয়ায় কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। রাতে ক্যাম্পগুলোতে রাখঢাক ছাড়াই অস্ত্র-মাদকের ব্যবহার গা সওয়া হয়ে গেছে, খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে।

প্রত্যাবাসনের দাবিতে সোচ্চার রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ সম্প্রতি খুন হওয়ার পর ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তাদের অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়া নিয়ে কথা হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও।

২০০৮ সালে ২৬ নভেম্বর ভারতের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার বার্ষিকীতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের ঘিরে জঙ্গিবাদ বিস্তারের শঙ্কার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল।

তিনি বলেন, “যদিও আমরা সতর্ক রয়েছি, যদিও তারা আমাদের বেড়াজালের মধ্যে আছে, তারপরও আপনারা দেখছেন, তারা নিজেরা নিজেরা ক্যাম্পে রক্তক্ষরণ করছে।”

দেশে সন্ত্রাস, জঙ্গি ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নেওয়ার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী আমরা সেভাবেই ঢেলে সাজিয়েছি। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী আমরা মনে করি, যে কোনো ধরনের সহিংসতা মোকাবেলার জন্য তৈরি হয়ে রয়েছে।

”সেজন্য তারা বড় রকমের আক্রমণ আগে থেকে ডিটেক্ট করতে পারছে। সেজন্য আমরা মনে করি, আমাদের জনগণও ঘুরে দাঁড়িয়েছে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে।”

জঙ্গিবাদ দমনে ভারতসহ অন্যান্য দেশের সহযোগিতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “তারা জঙ্গি দমনে আমাদেরকে সহযোগিতা করা, ইন্টেলেজিন্স শেয়ার করা, তাদের প্রযুক্তি আমাদেরকে দিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করা- সব কিছু করছেন। সেজন্য এই জিনিসটা আমাদের কাছে আরও সহজ হয়েছে।”

জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতার পেছনে ‘পাকিস্তানের ভূমিকার’ প্রসঙ্গ ধরে কামাল বলেন, “পাকিস্তান সবসময় আমাদের দেশের উপর, ওদের ইন্টেলিজেন্স যেটা, আইএসআই, এটার মাধ্যমে তারা নানানভাবে আমাদেরকে বিব্রত করার প্রচেষ্টা নিয়েছে।

”আমরা সে ব্যাপারে সবসময় খেয়াল রাখছি। যাতে করে তারা আর এই ধরনের ঘটনা না ঘটাতে পারে, সেজন্য আমরা সবসময় তাদের গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখছি।”

জঙ্গিবাদ দমনে ভারতের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সবসময় আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারতের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে থাকি এবং আমরা তাদের থেকে আমাদের ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে সবসময় খবরাখবর রাখতে সক্ষম হয়েছি।”

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বরে মুম্বাইয়ের একাধিক স্থানে হামলা চালিয়েছিল লস্কর-ই-তৈয়বার জঙ্গিরা। সেই হামলায় নিহত হন ১৬৬ জন, আহত হন ৩০০ মানুষ।

হামলার ত্রয়োদশ বার্ষিকীতে আলোচনা সভা এবং তিন দিনব্যাপী আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। আয়োজনে সহযোগিতা দিয়েছে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতি।

ভারতীয় হাই কমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী অনুষ্ঠানে বলেন, “ওই হামলার কথা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কারণ সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত জঙ্গিরা সশস্ত্র সেনাদের ওপর ওই আক্রমণ করেনি, তারা আক্রমণ করেছিল যতটা সম্ভব জনবহুল স্থানে, সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে; হোটেল রেস্তোরাঁ, স্টেশন প্রভৃতি এলাকায়।

”আমরা দেখেছি, আমাদের বন্ধু, পরিবারের সদস্য, আমাদের পরিচিতজন, ওই সময়টায় রেস্তোরাঁয় থাকার কারণে প্রাণ দিয়েছে। আমাদের অনেকে বন্ধুদের হারিয়েছি।”

সেই ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তা এক বন্ধুকে হারানোর কথা জানিয়ে হাই কমিশনার বলেন, “আমাদের কেউ শুরুতে বুঝতেও পারিনি, কী ঘটছে।

”তবে, একটা জিনিস আমরা বুঝতে পেরেছি, এটা সাধারণ কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা নয়, এটা এমন না যে ১০ জন লোক হুট করে বা ভারতের মধ্য থেকে এসে মানুষের উপর আক্রমণ করছে; এটা ছিল প্রশিক্ষিত কমাণ্ডো কায়দার অপারেশন।”

ভারতীয় হাই কমিশনার বলেন, “এখন তথ্য বলছে, তিনজন লোক সরাসরি এটা সমন্বয় করেছে, তাদের যোগাযোগের যন্ত্রপাতি ছিল। তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মানুষকে গুলি করার জন্য। তাদেরকে বলা হয়েছে পাসপোর্ট দেখে দেখে বিদেশিদের চিহ্নিত করে ঠাণ্ডামাথায় হত্যা করার জন্য।”

দোরাইস্বামী বলেন, “এটা এমন ঘটনা, যা ভোলারও নয়, ক্ষমা করারও নয়। কারণ এটা অন্য কোনো জায়গায় না হয়ে বোম্বেতে হয়েছে এবং এটা ঘটেছে আরেকটি রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়।

“এটার পূর্বাপর যোগসূত্রও পাওয়া যায়। হামলা এমনভাবে ঘটেছে যে, যারা পেছনে রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। যেখানে খুনিরা কোনো ধরনের বিচারের মুখোমুখি না হওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। যেটা ঘটেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়েও। কেবল নিজের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে অধিকারের জন্য। এজন্য কেবল বাঙালি হওয়ার কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছিল।”

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, সংসদ সদস্য ও সমাজকর্মী আরমা দত্ত, ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশীদ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ।