পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

‘তুমি জিতবে, হয়তো আমি দেখে যেতে পারব না’

  • রাসেল সরকার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2022-01-20 15:42:55 BdST

স্পাই থ্রিলার ‘মাসুদ রানা’র সিরিজের স্বত্ব নিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেন শেষ জীবনে এসে যে বিতর্কের সঙ্গী হয়েছিলেন, সেই আক্ষেপ নিয়েই মৃত্যুর আগে পুত্রবধূকে ‘জেতার’ আশ্বাস দিয়ে গেছেন তিনি।

তার ছোট ছেলে কাজী মায়মুর হোসেনের স্ত্রী কাজী মাসুমা মায়মুরা বলেছেন, “যে মিথ্যা অভিযোগ সেবা প্রকাশনীর প্রতি তুলে ধরা হল, মিডিয়াতে বিভ্রান্তিকর নিউজ এল। আমরা হাতটা ধরে বাবা বলেছিলেন, আমি জানি তুমি জিতবে। হয়ত আমি দেখে যেতে পারব না।“

বৃহস্পতিবার সকালে কাজী আনোয়ার হোসেনের মরদেহ হাসপাতাল থেকে সেগুনাবাগিচার বাসায় আনা হলে সাংবাদিকদের কাছে এভাবেই সেই আক্ষেপের কথা বলেন মাসুমা মায়মুরা।

মাসুদ রানা চরিত্রের স্রষ্টা এবং সেবা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা কাজী আনোয়ার হোসেন ৮৫ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন শেষে বুধবার বিকেলে ঢাকার বারডেম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সেগুনবাগিচায় নূর জামে মসজিদে জানাযা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছে তার পরিবার।

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে শহীদ মিনারে তার জন্য শ্রদ্ধা নিবেদনের কোনো আয়োজন হয়নি। সেগুনবাগিচায় দুপুর পর্যন্ত তার বাসায় পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরা তাকে অশ্রুজলে শেষ বিদায় জানান।

কাজী আনোয়ার হোসেন।

কাজী আনোয়ার হোসেন।

অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৬৬ সালে সেবা প্রকাশনী প্রতিষ্ঠা করে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজ লেখা শুরু করেন; দ্রুতই তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিল।

পওরে কাজী আনোয়ার হোসেন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে 'ঘোস্ট রাইটার' হিসেবে অন্যদের দিয়েও ‘মাসুদ রানা’ লেখাতেন। শেখ আবদুল হাকিম ও ইফতেখার আমিন রয়েছেন সেই লেখকদের মধ্যে।

দীর্ঘদিন পর লেখক শেখ আব্দুল হাকিম মাসুদ রানার স্বত্ব দাবি করলে বিষয়টি আদালতেও গড়ায়। মামলা চলার মধ্যেই চলতি বছর অগাস্টে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান শেখ আবদুল হাকিম।

মৃত্যুর চার মাস পর আদালত থেকে তার স্বীকৃতি মেলে। মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে মালিকানা স্বত্ব শেখ আবদুল হাকিমকে দিয়ে কপিরাইট অফিসের দেওয়া সিদ্ধান্ত বহাল রাখে হাই কোর্ট।

তবে মাসুমার দাবি, আদালত স্বত্ব শেখ আবদুল হাকিমকে দেয়নি। গণমাধ্যমে ‘ভুলভাবে’ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি বলেন, “কপিরাইট অফিস বলেছে উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে কপিরাইট পেতে হবে। প্রত্যেকটা মিডিয়ায় এসেছে কপিরাইট পেয়ে গেছেন। কীভাবে পেলেন? আদালত যে রায় দিয়েছে, সেটাও গণমাধ্যমে ভুলভাবে প্রকাশিত হয়েছে। একই বই নিয়ে তো লেখক ইফতেখার আমিনও কপিরাইট দাবি করেছেন। কোনো প্রমাণ দিতে পেরেছেন?

“আমরা বলেছি, এটা সারোগেসি। আরেকজনের স্পার্ম নিয়ে সারোগেসি করলে সন্তানের দাবি করা যায় না প্রসব যন্ত্রণার অজুহাতে। তবে উনার কলমের উর্বরতা আমরা স্বীকার করি।”

কাজী আনোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ বলেন, ৪৩ বছর একই জায়গায় একই লোকের কাজ করার পরে যখন পঞ্চাশ বছর পর অভিযোগ তোলা হয়, আমাকে ঠকানো হয়েছে, তাহলে ৪৩ বছর তিনি কীভাবে কাজ করেছেন? আগে কেন এসব অভিযোগ ছিল না? শুধু এইটুকু প্রশ্নের উত্তর কেউ আমাকে দেবে?”

‘মাসুদ রানা’র ২৬০ বইয়ের স্বত্ব আবদুল হাকিমের: হাই কোর্ট

‘মাসুদ রানা’র কী হবে  

মাসুদ রানা ও কুয়াশা সিরিজের গ্রন্থস্বত্ব নিয়ে আদালতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন মাসুমা মায়মুরা।

“আমরা বিষয়টা নিয়ে আদালতে এখনও লড়ছি। বাবা আমাকে বলেছেন, সত্যের জয় হবে। তুমি জিতবে।”

শেষের দিনগুলোতে কাজী আনোয়ার হোসেনকে সার্বক্ষণিক দেখাশুনা করতেন মাসুমা মায়মুরা।

তিনি বলেন, “শেষ বয়সে এসেও বাবা সব সময় নিজেকে নিয়ে খুব খুশি ছিলেন। বলেছেন, আমি সফল জীবন কাটিয়েছি। একজীবনে মানুষ এতকিছু পায় না। আমাকে নিয়ে উনি বরাবরই খুশি ছিলেন। উনি বলতেন আমার মা পেয়েছি।

“তিনি তার নিজের সৃষ্টি নিয়ে কখনো অহংকার দেখাননি। সেটা মাসুদ রানা হোক বা সেবা প্রকাশনীই হোক। আমি সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাবাকে বোঝালাম, বাবা আপনি যেভাবে চলছেন, এটা তো কোনো বিজনেস না। তখন তিনি বলেছেন, তুমি কী নতুন জানলে এটা যে বিজনেস না? আমি বাংলাদেশের মানুষকে বই পড়াতে চেয়েছি। আমি বিজনেস করতে আসিনি।”

মাসুমা বলেন, “উনার সৃষ্টিকর্ম বা লেখা নিয়ে উনার আত্মতৃপ্তি ছিল, কিন্তু কখনো কোনো অহংকার ছিল না যে, আমি এটা করেছি বা এটাই বেস্ট।

উনার শ্রেষ্ঠ চরিত্রের মধ্যে কখনো নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে বলতেন, ‘আমি যা হতে পারিনি, তাই মাসুদ রানা’। তবে মাসুদ রানার শারীরিক গঠনটা উনার বাবার থেকে নিয়েছেন। উনার বাবা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি ছিলেন, উনার বাবার থেকে নিয়েছেন সেটা উনি আমাকে বলেছেন।

“আর যখন উনি মাসুদ রানা তৈরি করেন, তখন উনার বয়স ছিল ২৭, উনি সেই ২৭ বছর বয়সটাকে সেখানে কাজে লাগিয়ে ছিলেন।”