বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে আশরাফ-মুঈনুদ্দীনের মৃত্যুদণ্ড

  • সুলাইমান নিলয়, কাজী শাহরীন হক ও গোলাম মুজতবা ধ্রুব, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2013-11-03 12:51:28 BdST

একাত্তরে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয়া দুই বদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

জামায়াতে ইসলামী তখনকার সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের এই দুই কেন্দ্রীয় নেতা মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় জন শিক্ষক, ছয় জন সাংবাদিক ও তিনজন চিকিৎসকসহ ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যা করেন।

পলাতক আশরাফুজ্জামান বর্তমানে আছেন যুক্তরাষ্ট্রে, আর মুঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে।

তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারপতি ওবায়দুল হাসান নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ রোববার জনাকীর্ণ আদালতে এ মামলার রায় ঘোষণা করে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের ১১টি অভিযোগের সবগুলোতেই দুই আসামির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় ‘আমৃত্যু ফাঁসিতে ঝুলিয়ে’ তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকার করার নির্দেশ দেন বিচারক।

ট্রাইব্যুনাল প্রধান বলেন, “আমরা ঐক্যমতের ভিত্তিতে এই মত দিচ্ছি, আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ না দিলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।”

এ আদালতের অপর দুই বিচারক বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও শাহিনুর ইসলামও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

 

চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান

আশরাফুজ্জামান ও মুঈনুদ্দীন ১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কীভাবে আল বদর সদস্যদের নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যার পর বধ্যভূমিতে লাশ গুম করেছিলেন, তা উঠে এসেছে এই রায়ে।   

আশরাফুজ্জামান খান ছিলেন সেই হত্যাকাণ্ডের ‘চিফ এক্সিকিউটর’। আর চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ছিলেন সেই পরিকল্পনার ‘অপারেশন ইনচার্জ’।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশরাফুজ্জামানের নাখালপাড়ার বাসা থেকে উদ্ধার করা তার ব্যক্তিগত দিনপঞ্জিতে এই হত্যা পরিকল্পনা ও একটি তালিকাও পাওয়া যায়।

এ দুই বদর নেতা ও তাদের সহযোগীদের হাতে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ড. সিরাজুল হক খান, ড. আবুল খায়ের, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য।

সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেন, সৈয়দ নাজমুল হক, এএনএম গোলাম মুস্তাফা, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, সেলিনা পারভীন, শহীদুল্লাহ কায়সার এবং চিকিৎসক মো. মর্তুজা, মো. ফজলে রাব্বি ও আলিম চৌধুরীকেও হত্যার পর গুম করে তারা।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছে, এখন আসামিদের ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করতে হবে।

তবে আসামিদের এক আইনজীবী বলেছেন, রায় তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি নবম রায়। আগের আটটি রায়ে জামায়াতের সাবেক ও বর্তমান ছয়জন এবং বিএনপির দুই নেতাকে দণ্ডাদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

 

আত্মসমর্পণ না করলে আপিল নয়

রোববার সকাল ১১টায় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। 

এরপর ১৫৪ পৃষ্ঠার এই রায়ের ৪১ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্তসারের প্রথম অংশ পড়েন বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম। ট্রাইব্যুনালের অপর বিচারক মো. মুজিবুর রহমান মিয়া রায়ের দ্বিতীয় অংশ পড়ার পর ট্রাইব্যুনাল প্রধান  বিচারপতি ওবায়দুল হাসান সাজা ঘোষণা করেন।

সূচনা বক্তব্যে ট্রাইব্যুনাল প্রধান বলেন, “এ মামলার দুই আসামি পলাতক। রায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী প্রসিকিউশন ও অ্যাটর্নি জেনরারেলকে রায়ের সোর্টিফায়েড কপি দেয়া হবে। আসামিপক্ষ রায়ের কপি চাইলে আগে তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে।”

রায়ের আগে আদালতে আসামিদেরকে হাজির করার নিয়ম থাকলেও আশরাফুজ্জামান-মুঈনুদ্দীন পলাতক থাকায় এবার তা হয়নি। আসামির অনুপস্থিতিতে রায় হওয়া ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় মামলা এটি।

এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার হয় এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে তার ফাঁসির আদেশ দেন বিচারক।

রায়ের পর নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করায় তার ক্ষেত্রে আপিল প্রযোজ্য হবে না। 

 

 

‘ফ্যাসিস্ট’ জামায়াত

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের আগের রায়গুলোর মতো এবারো বিচারকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

আদালত বলেছে, সেই সময় জামায়াতে ইসলামী একটি ফ্যাসিস্ট সংগঠন হিসাবে কাজ করেছে। ‘কিলিং স্কোয়াড’ আল বদরের নিয়ন্ত্রণ সে সময় জামায়াতের হাতেই ছিল।

“এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ফ্যাসিস্ট জামায়াতে ইসলামীর সংগঠিত মহাপরিকল্পনার আলোকেই সে সময় আল বদর বাহিনীকে নামানো হয়। বাঙালি জাতিকে প্যারালাইজড করতে তারা বুদ্ধিজীবী-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিহীন করতে চেয়েছিল।”

একাত্তরের ১৩ ডিসেম্বর দৈনিক শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীনকে অপহরণের পর হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, “সন্তানের জন্য সেলিনা পারভীন প্রাণ ভিক্ষা চান, তাকে ছেড়ে দিতে বলেন। তার ছোট একটি ছেলে রয়েছে, যাকে দেখাশুনা করার আর কেউ নেই। কিন্তু নিষ্ঠুর হত্যাকারীরা তাকে ছাড়েনি। বেয়নেট দিয়ে তাকে তাতক্ষণিকভাবে হত্যা করা হয় বলে প্রসিকিউশনের ২২ নম্বর সাক্ষী জানিয়েছেন।

“সেলিনা পারভীন ছিলেন একজন মা। ভীতিকর আক্রমণ কেবল সেলিনা পারভীনের ওপরই করা হয় নাই। বরং মাতৃত্বের ওপরও হয়েছে। এটা বরং মাতৃহন্তাও। অবর্ণনীয় এই নিষ্ঠুরতা মানবতার বিবেককে আঘাত করেছে।”

এর আগে গত জুলাইয়ে জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধকালীন আমির গোলাম আযমের রায়ে দলটিকে ‘ক্রিমিনাল দল’ আখ্যায়িত করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদ সরকারের আমলে পুলিশ প্রহরায় মুঈনুদ্দীনকে দেশে আসার সুযোগ করে দেয়ায় ওই দুই সামরিক শাসককেও ধিক্কার জানানো হয়েছে রায়ের পর্যবেক্ষণে। 

“এটা জাতির বড় একটি বিরাট লজ্জা (গ্রেট শেম) যে, জিয়া ও এরশাদ তাকে গ্রামের বাড়িতে যেতে দিয়েছেন। আত্মগোপনে গিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এই আসামিকে সে সময় পুলিশি নিরাপত্তাও দেয়া হয়। বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে তাকে রাষ্ট্রীয় মেশিনারি দিয়ে সম্মান দেয়া হলো।”

 

 

প্রতিক্রিয়া

রায়ের পর প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক এমকে রহমান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “দেশকে মেধাশূন্য করার যে চেষ্টা একাত্তরে হয়েছিল আজ তার বিচার হলো।”

প্রসিকিউটর তুরীন আফরোজ বলেন, দুই আসামি যেহেতু বিদেশে আছে, সেহেতু সরকারের উচিৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চেষ্টা শুরু করা।

অন্যদিকে চৌধুরী মঈনুদ্দীনের আইনজীবী সালমা হাই টুনি বলেছেন, রায় তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি।

“তারা দেশে এসে রায়ের কপি নিয়ে যদি আপিলে যায় তাতে প্রত্যাশিত রায় পাব বলে আশা করছি।”

দুই বদর নেতার হাতে স্বজন হারানো অনেকেই রায় শুনতে আদালতে এসেছিলেন এদিন। 

ডা. আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সুবিচার পেয়েছি।”

শহীদ সাংবাদিক এএনএম গোলাম মুস্তাফার ছেলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনির্বাণ মুস্তফা বলেন, “আমি বাবাকে পাইনি। এই দেশটা পেয়েছি। এখন চাওয়া রায় কার্যকর হোক।”

ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী শহীদ বুদ্ধিজীবী গিয়াস উদ্দিনের ভাগ্নি মাসুদা হক রত্না বলেন, ১৭ বছর বয়সে তার সামনে থেকেই তার মামাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ৫৮ বছর বয়সে এসে তিনি তার বিচার পেলেন।

গিয়াস উদ্দিনের ভাই ড. রশিদউদ্দিন আহমদ রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসামিদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, এ রায় জাতির প্রত্যাশিতই ছিল।

মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল হক, যিনি শহিদুল মামা নামেই বেশি পরিচিত, ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে বলেন, “এরা বুদ্ধিজীবী নিধনের মাস্টারমাইন্ড ছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নাকের ডগায় লন্ডনে অবস্থান করে এখনও দেশের স্বাধীনতাবিরোধী কাজ করে যাচ্ছে।”

সরকার পরিবর্তন হলে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকর হবে কি না- তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সহ সভাপতি কে এম শফিউল্লাহ রায়ের পর বলেন, “রায়ে আমরা সন্তুষ্ট, চাই দ্রুত তা কার্যকর হোক। এ সরকারের মেয়াদেই তাদের ফাঁসি কার্যকর করতে হবে।”

সকাল থেকে গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা শাহবাগে অবস্থান নেন। রায়ের পর আনন্দ মিছিল বের করেন তারা।

মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, “ফাঁসির রায় হলেও এ দুই আসামি অবস্থান করছে দেশের বাইরে। কোনো দেশ অপরাধীদের আশ্রয় দিতে পারে না। সরকারের কাজ হবে- দুই দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুই অপরাধীর সাজা কার্যকর করা।”

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, দুই আসামিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের ফিরিয়ে আনার পরই রায় কার্যকর করা হবে।

বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের ফাঁসির রায় হওয়ায় আনন্দ-উল্লাস ও মিষ্টি বিতরণ হয়েছে তার জন্মস্থান ফেনীতেও।

 

চৌধুরী মুঈনুদ্দীন

চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের জন্ম ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে,  ফেনীর দাগনভূঞা থানার চানপুর গ্রামে। তার বাবার নাম দেলোয়ার হোসাইন। 

একাত্তরে মুঈনুদ্দীন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র। দৈনিক পূর্বদেশের নিজস্ব প্রতিবেদক হিসাবেও তিনি কাজ করেছেন।

মামলার নথিপত্র  অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে মুঈনুদ্দীন  ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের একজন কেন্দ্রীয় নেতা এবং রাজাকার বাহিনীর সদস্য। সেই হিসাবে পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতার জন্য গড়ে তোলা আলবদর বাহিনীতেও তাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দায়িত্ব দেয়া হয়। যুদ্ধের শেষভাগে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।     

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুঈনুদ্দীন পালিয়ে পাকিস্তান চলে যান। সেখান থেকে যান যুক্তরাজ্যে। এখন পর্যন্ত তিনি লন্ডনেই অবস্থান করছেন। 

লন্ডনে জামায়াতের সংগঠন দাওয়াতুল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক দাওয়াতের বিশেষ সম্পাদকের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। 

মুঈনুদ্দীন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের একজন পরিচালক, মুসলিম এইডের ট্রাস্টি এবং টটেনহ্যাম মসজিদ পর্যদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।

একাত্তরে ‘পাকিস্তানের অখণ্ডতার’ পক্ষে থাকার কথা নিজের ওয়েবসাইটে দেয়া বিবৃতিতে স্বীকারও করেছেন মুঈনুদ্দীন। 

আশরাজ্জামান খান

আশরাজ্জামান খানের জন্ম ১৯৪৮ সালে, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের চিলেরপাড় গ্রামে। বাবার নাম আজহার আলী খান। 

১৯৬৭ সালে সিদ্ধেশ্বরী ডিগ্রি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর আশরাফুজ্জামান ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী স্টাডিজ বিভাগে। ওই বিভিগ থেকেই ১৯৭০ সালে স্নাতক ডিগ্রি পান ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় নেতা আশরাফুজ্জামান। 

মক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা আল বদর বাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়ার দাযিত্ব আশরাফুজ্জামানের ওপর বর্তায়। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এবং বাস্তবায়নকারী নেতা হিসাবেও তাকে অভিযুক্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পালিয়ে পাকিস্তনে চলে যান এবং কিছুদিন রেডিও পাকিস্তানে কাজ করেন। পরে সেখান থেকৈ চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে।

বর্তমানে আশরাজ্জামান খানের ঠিকানা নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা। ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকার সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

 

আব্দুল কাদের মোল্লার রায় ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় পুলিশের সতর্ক অবস্থান।

 

মামলার পূর্বাপর

২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর আশরাফুজ্জামান ও মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়। চলতি বছর ২৮ এপ্রিল দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।

এরপর ২ মে আশরাফ-মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। তাদের পাওয়া না যাওয়ায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়।

তারপরও আশরাফুজ্জামান ও মুঈনুদ্দীন আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের অনুপস্থিতিতেই মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

২৪ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের ১১টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের দুই বদর নেতার বিচার শুরু হয়। তাদের পক্ষে লড়ার জন্য দুই আইনজীবীকে নিয়োগ দেয়া হয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।

এ মামলার দুই তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। ১৫ জুলাই প্রথম সাক্ষী হিসেবে নিজের জবানবন্দি উপস্থাপন করেন শহীদ অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদের ভাগ্নি মাসুদা বানু রত্না।

আসামি পলাতক থাকায় এ মামলায় তাদের কোনো সাক্ষি ছিল না। যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষে ট্রাইবুনাল গত ৩০ সেপ্টেম্বর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।

নবম রায়

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরু হয়। প্রথম রায়ে গত ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ আসে।

৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়, যা প্রত্যাখ্যান করে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান নেয় হাজার হাজার মানুষ।

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সেই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে জনতার দাবির মুখে সরকার ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন আনে। এর মধ্যে দিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে দুই পক্ষেরই আপিলের সমান সুযোগ তৈরি হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ এ মামলার চূড়ান্ত রায়ে কাদের মোল্লাকে প্রাণদণ্ড দেয়। 

ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় রায়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসি হলে দলটির ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসেবেই পুলিশসহ নিহত হয় ৭০ জনেরও বেশি মানুষ।

এরপর গত ৯ মে চতুর্থ রায়ে জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকেও মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।

মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা ও উস্কানির দায়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াত আমীর গোলাম আযমকে গত গত ১৫ জুন ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এটি ছিল ট্রাইব্যুনালের পঞ্চম রায়।

ষষ্ঠ রায়ে গত ১৭ জুলাই জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকেও মানবতা-বিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালের সপ্তম রায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রামের সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় আসে।

আর সর্বশেষ গত ৯ অক্টোবর বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় আদালত।