পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

লতিফের মন্ত্রিত্বের অবসান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর 
    Published: 2014-10-12 15:21:09 BdST

নিউ ইয়র্কে প্রবাসীদের এক অনুষ্ঠানে হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার ১৫ দিনের মাথায় আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিল সরকার।

রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসেন ভূইঞা সচিবালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান।  

এ বিষয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপন পড়ে শুনিয়ে তিনি বলেন, “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের (১) দফার (গ) উপ-দফা অনুযায়ী ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রী জনাব আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর মন্ত্রী পদে নিয়োগের অবসান হয়েছে। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।”

কেন লতিফের মন্ত্রিত্বের ‘অবসান’ ঘটানো হলো- সে বিষয়টি অবশ্য প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও এর বাইরে কিছু বলেননি। 

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি মনে করি যে এই প্রশ্নের জবাব এইখানে দেওয়ার কোনো আবশ্যকতা নাই। আমিও এ সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না।… আমি শুধু বলতে চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি অনুরূপ নির্দেশ দিয়েছেন।”

এই অবসানের অর্থ ‘অপসারণ’ না ‘অব্যাহতি’- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আপনারা যে ভাষা ব্যবহার করেন করতে পারেন। কারণ উল্লেখ করার আবশ্যকতা নেই। কারণ বলতে বাধ্যবাধকতাও নেই।… মিনিং একই। আমরা সংবিধানের ভাষা ব্যবহার করেছি।”

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লতিফ সিদ্দিকী ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ওই পদে নতুন কেউ নিয়োগ না পাওয়া পর্যন্ত এ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে বলে জানান সচিব। 

 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকও রোববার বসছে। এই বৈঠকেও দলের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।

প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের সময়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর।

সেদিন টাঙ্গাইল সমিতির এক অনুষ্ঠানে লতিফ বলেন, “আমি কিন্তু হজ আর তাবলিগ জামাতের ঘোরতর বিরোধী। আমি জামায়াতে ইসলামীরও বিরোধী।”

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বিপুল সংখ্যক মানুষ হজে যাওয়ায় দেশের অর্থ আর শ্রম শক্তির ‘অপচয়’ হয়।

তার ওই বক্তব্যের ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে কয়েকটি ইসলামী দল আন্দোলনের হুমকি দেয়। তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার পাশাপাশি গ্রেপ্তারের দাবিও তোলে বিএনপি। 

লতিফ সিদ্দিকী ঈদ করার পর এখনও নিউ ইয়র্কে রয়েছেন। এর মধ্যেই ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় অন্তত দুই ডজন মামলা হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরে গত ৩ অক্টোবরই এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেন লতিফ সিদ্দিকী আর মন্ত্রিসভায় থাকবেন না। তবে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ হজ পালনে সৌদি আরবে থাকায় লতিফকে বাদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা ঝুলে থাকে আরো এক সপ্তাহ।

ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “আমি নির্দেশ দিলে রিজাইন (পদত্যাগ) করতে হবে। নইলে বিদায় করে দিতে হবে। কিন্তু বিদায় দিতে হলে রাষ্ট্রপতির কাছে ফাইল পাঠাতে হবে। রাষ্ট্রপতি হজে গেছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও হজে গেছেন। আমি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে ফাইল তৈরি করে রাখতে বলেছি, অফিস খুললে ফাইল চলে আসবে।”

হজ পালনের পর রাষ্ট্রপতি দেশে ফেরেন শুক্রবার। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও এরইমধ্যে ফিরে আসেন। শনিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসেন ভূইঞা বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে (লতিফ সিদ্দিকীর অপসারণ) একটি ফাইল আসবে। আমরা একটি সামারি তৈরি করে তা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠাব। রাষ্ট্রপতি তাতে সাইন করার পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।”

এরপর রোববার দুপুর ২টায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সঙ্গে নিয়েই বঙ্গভবনে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তিনি সেখানে বৈঠক করেন পুরো এক ঘণ্টা।

 

রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ঈদ ও হজের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। 

এক প্রশ্নের জবাবে ইহসানুল করিম বলেন, “ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর মন্ত্রিত্বে অবসান সংক্রান্ত ফাইলে রাষ্ট্রপতি সই করেছেন।”

এরইমধ্যে রাষ্ট্রপতির সই নিয়ে সচিবালয়ে ফিরে সাংবাদিকদের সামনে আসেন মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসেন ভূইঞা।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সন্তুষ্ট হয়ে নিয়োগের (লতিফ সিদ্দিকীর) অবসান ঘটানোর জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি তাতে সন্তুষ্ট হয়েই সই করেছেন এবং অনুরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা প্রজ্ঞাপন জারি করেছি।”

গত ৬ অক্টোবর লতিফ সিদ্দিকী পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বলে সংবাদ মাধ্যমে আসা খবরের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মোশাররাফ বলেন, “এটা আমার জানা নেই। এটা আমার নলেজে নেই।”

লতিফকে দল থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গত ৩ অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হাসিনা বলেন, দল থেকে বাদ দিতে হলে তা নিয়ে দলে আলোচনা করতে হবে। অভিযোগ তুলে ধরে আলোচনা করতে হবে। ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

“ওয়ার্কিং কমিটি যদি মনে করে তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া ভাল- তাহলে অব্যাহতি দিয়ে দেবে।”

রোববার বিকালেই ওয়ার্কিং কমিটির সেই বৈঠক বসছে।

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতি) আসন থেকে পাঁচবার সংসদে যাওয়া লতিফ সিদ্দিকী গত মহাজোট সরকারের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। শেখ হাসিনা টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর চলতি বছরের শুরুতে ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।

হাসিনার গত সরকারে বাদ পড়তে হয়েছিল পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সমালোচনায় থাকা সৈয়দ আবুল হোসেনকে। এছাড়া অর্থ কেলেঙ্কারিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করলেও তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করে রাখা হয়েছিল।

 

টাঙ্গাইলে প্রভাবশালী সিদ্দিকীদের জ্যেষ্ঠ ভাই ৭৭ বছর বয়সী লতিফ সিদ্দিকী রাজনীতিতে স্পষ্টভাষী হিসেবে যেমন পরিচিত, তেমনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তীর্যক বক্তব্য দিয়ে এর আগেও আলোচনায় এসেছেন।

নিজের ভাই আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর ‘হঠাৎ জামায়াত ঘনিষ্ঠতাকে’ যেমন তিনি ‘বীর উত্তমের রাজাকার হওয়ার শখ’ বলে সমালোচনা করেছেন, তেমনি বাড়িতে ডেকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলীকে পেটানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এই লতিফ সিদ্দিকীই ১৯৮০ এর দশকে প্রবাসে থেকে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সভাপতি হওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। আবার ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর তিনিই বঙ্গবন্ধুকন্যার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন।

ষাটের দশকে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের দিনগুলোতে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয় বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য লতিফ সিদ্দিকীকে।

ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে ১৯৬৪-৬৫ সালে তিনি করটিয়া সাদত কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ৬৬ ছয় দফা ও ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানে সক্রিয় এই নেতা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসাবেও ভূমিকা রাখেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকীকে প্রায় ছয় বছর কারাগারে কাটাতে হয়। এরশাদের আমলে স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকী নারী সাংসদ হওয়ার পর মুক্তি পান তিনি।

গত সরকারের শুরুর দিকে এক অধিবেশনে সংসদের প্রথম সারিতে মন্ত্রী ও সরকারি দলের সাংসদের অনুপস্থিতি দেখে তখনকার স্পিকার ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ক্ষোভ প্রকাশ করলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই তার জবাব দেন লতিফ।

সংসদে তিনি বলেন, “স্পিকার হচ্ছেন সংসদের সেবক। তিনি প্রভু নন। কোনো সাংসদের পয়েন্ট অফ অর্ডারেই শুধু রুলিং দিতে পারেন স্পিকার।”

২০১১ সালে পাট নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘যথাযথ মর্যাদা’ না দেওয়ার অভিযোগ তুলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উপস্থিতিতেই আয়োজকদের তুলোধুনা করেন তখনকার পাটমন্ত্রী লতিফ।

বাংলাদেশে সব পোশাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন চালুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেই গত বছর রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনাকে একটি চিঠি লেখেন তখনকার বস্ত্রমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী, যে চিঠির শিরোনাম ছিল ‘ট্রেড ইউনিয়ন প্রশ্নে আপনি বলার কে?’