পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

লতিফ সিদ্দিকী গর্হিত কাজ করেছেন: হাসিনা

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2014-10-12 20:41:27 BdST

bdnews24

নিউ ইয়র্কে প্রবাসীদের এক অনুষ্ঠানে হজ নিয়ে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর মন্তব্যকে ‘গর্হিত কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এজন্য তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিতে ‘বাধ্য’ হয়েছেন বলে রোববার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের প্রারম্ভিক বক্তব্যে বলেছেন তিনি।

এই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেই লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণের প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

দলীয় সভানেত্রীর বক্তব্যের পর গণভবনে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ।

এই বৈঠকেই দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আগেই ইঙ্গিত মিলেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কেন এটা বলল আমি জানি না, কিসের জন্য বললো জানি না; তবে যেটা বলেছে তা গর্হিত কাজ বলেই আমি মনে করি।”

শেখ হাসিনার জাতিসংঘ সফরের মধ্যেই নিউ ইয়র্কে এক সভায় হজ নিয়ে লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য প্রচার হলে তা নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

বিভিন্ন ইসলামী দল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানায় বিএনপি। বিভিন্ন স্থানে এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলাও হতে থাকে।

এরপর নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী গত ৩ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে লতিফ সিদ্দিকীকে। দল থেকেও বাদ দেওয়া হবে।

এরপর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সেরে রোববার ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার প্রজ্ঞাপন হয়।

ওই পদক্ষেপের পর দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে বক্তব্যের শুরুতে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সিপিএর চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার প্রসঙ্গের পরই লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে বলতে শুরু করেন শেখ হাসিনা।

“আপনারা জানেন যে, সাম্প্রতিককালে আমাদের একজন মন্ত্রী, প্রাক্তন মন্ত্রীই বলতে হয় এবং আমাদের প্রেসিডিয়াম মেম্বার লতিফ সিদ্দিকী নিউ ইয়র্কে আমাদের নবী করিম (সা.) সম্পর্কে, হজ সম্পর্কে এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বেশ কিছু বিরূপ মন্তব্য করেছেন, যেটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য না।”

“আমরা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি। তার মানে এই না যে ধর্মহীনতা। ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে সকল ধর্মের প্রতি সন্মান দেখানো।”

শেখ হাসিনা বলেন, “যখন হজ চলছে এবং বাংলাদেশ এত সুন্দর করে হজে যাওয়ার ব্যবস্থাপনা করেছে; যেখানে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত হজে গেছেন, ঠিক সেইসময় আমাদের দলের কেউ এই ধরনের কটূক্তি করবে, মন্তব্য করবে এটা তো কখনোই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য না।

“বিষয়টা জানার সাথে সাথেই আমি সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছি। .. আমি আগেই নির্দেশ দিয়েছিলাম ফাইল তৈরি করতে। কেবিনেট ডিভিশনে ফাইল তৈরি ছিল। কেবিনেট সেক্রেটারি কাল হজ থেকে আসার পর তার সঙ্গে আমি বসেছি। কেবিনেট সেক্রেটারিসহ মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে গেছি। তারপর উনি সেটা সই করে দিলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।”

সংবিধান অনুযায়ী এক মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান যেভাবে ঘটানো যায় ঠিক সেভাবেই লতিফ সিদ্দিকীকে বাদ হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

“আমরা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি, কারণ প্রত্যেকটা মুসলমানের মনের মধ্যে একটা আঘাত লাগবে এটা কারো কাছে গ্রহণযোগ্য না।”

ধর্মের বিষয়ে নিজের দলের অবস্থান তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই সব থেকে বেশি ধর্ম পালন করে, সব থেকে বেশি নামাজ পড়ে। সব থেকে বেশি হজ, হাজি সংখ্যা সব থেকে আমাদেরই বেশি।

“ধর্মীয় নিয়ম নীতি মানা, গরিবের প্রতি দরদ, মায়া-মমতা, তাদের জন্য কাজ করা সব থেকে বেশি আমরাই করি।”

লতিফ সিদ্দিকী নিউ ইয়র্কে টাঙ্গাইল সমিতির এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “আমি কিন্তু হজ আর তাবলিগ জামাতের ঘোরতর বিরোধী। আমি জামায়াতে ইসলামীর যতটা বিরোধী, তার চেয়ে বেশি হজ আর তাবলিগের বিরোধী। ”

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বিপুল সংখ্যক মানুষ হজে যাওয়ায় দেশের অর্থ আর শ্রম শক্তির ‘অপচয়’ হয়।

টাঙ্গাইলে প্রভাবশালী সিদ্দিকীদের জ্যেষ্ঠ ভাই ৭৭ বছর বয়সী লতিফ সিদ্দিকী রাজনীতিতে স্পষ্টভাষী হিসেবে যেমন পরিচিত, তেমনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তীর্যক বক্তব্য দিয়ে এর আগেও আলোচনায় এসেছেন তিনি।

নিজের ভাই আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর ‘হঠাৎ জামায়াত ঘনিষ্ঠতাকে’ যেমন তিনি ‘বীর উত্তমের রাজাকার হওয়ার শখ’ বলে সমালোচনা করেছেন, তেমনি বাড়িতে ডেকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলীকে পেটানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতি) আসন থেকে পাঁচবার সংসদে যাওয়া লতিফ সিদ্দিকী গত মহাজোট সরকারের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। শেখ হাসিনা টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর চলতি বছরের শুরুতে ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।

তবে এই লতিফ সিদ্দিকীই ১৯৮০ এর দশকে প্রবাসে থেকে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সভাপতি হওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন, আবার ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর বঙ্গবন্ধুকন্যার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন।

ষাটের দশকে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের দিনগুলোতে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয় বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য লতিফ সিদ্দিকীকে।

ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে ১৯৬৪-৬৫ সালে করটিয়া সাদত কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ৬৬ ছয় দফা ও ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানে সক্রিয় এই নেতা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসাবে ভূমিকা রাখেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকীকে প্রায় ছয় বছর কারাগারে কাটাতে হয়। এরশাদের আমলে স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকী জাতীয় পার্টির নারী সাংসদ হওয়ার পর মুক্তি পান তিনি।