২৪ মার্চ ২০১৯, ১০ চৈত্র ১৪২৫

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ‘হোতাদের’ রক্ষার চেষ্টার অভিযোগ

  • নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2014-11-28 22:51:37 BdST

bdnews24

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে র‌্যাবের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ওই ঘটনায় করা মামলার বাদী পক্ষ।

তাদের অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত র‌্যাব হত্যার দায় স্বীকার করলেও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের নাম তাদের প্রতিবেদনে না রেখে প্রকারান্তরে তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে পুলিশ বলছে, র‌্যাবের প্রতিবেদনই শেষ নয়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সাত খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে গত ২৩ নভেম্বর র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে। প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত র‌্যাব-১১ এর সাবেক কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানার জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।

এবিষয়ে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির সম্প্রতি দাখিল করা প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী র‌্যাবের আরও অনেকে এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।

“তবে কেন তাদেরকে র‌্যাবের এই প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়া হলো? নিশ্চই র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের বাঁচানোর চেষ্টা চলছে। র‌্যাবের দেওয়া নিজস্ব এই প্রতিবেদনে আমাদের কোনো আস্থা নেই।”

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে সাত খুনের সঙ্গে র‌্যাবের ২৭ জন সরাসরি জড়িত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন নারায়ণগঞ্জের এই আইনজীবী বলেন, সরকার প্রভাব খাটিয়ে ডিবির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব করছে।

পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার এই মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনসহ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “ভারতের কাছে আমাদের দেশের ৪০ জন সন্ত্রাসীর যে তালিকা দেওয়া হয়েছে তাতে নূর হোসেনের নাম নেই। নূর হোসেনের চেয়ে অনেক নীচু স্তরের সন্ত্রাসীর নামও ওই তালিকায় রয়েছে।

“এতেই প্রমাণিত হয়, সরকার চায় না নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। কেননা নূর হোসেনের মুখ থেকে অনেক রাঘব বোয়ালের নাম বেরিয়ে আসতে পারে, যারা সাত খুনের পরিকল্পনায় জড়িত।”

এছাড়া নূর হোসেন ও মামলার আরেক আসামি আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াছিন মিয়াকে দীর্ঘ সাত মাসেও দল থেকে বহিষ্কার না করায় ক্ষোভপ্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে সাত খুনের মামলার বাদি নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে দিনযাপন করছেন বলে জানান।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা প্রতিনিয়ত আমাদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। সন্তানদের নিয়ে আমি ভয়ে আছি। কিন্তু এই সাত মাসেও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলো না।

“অপহরণের ১৫ দিন আগে থেকেই তারা হুমকি দিয়ে আসছিল, আমার স্বামীকে তারা মেরে ফেলবে। আমি একথা বার বার বলার পরেও প্রশাসন তাদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। মূলত তারাই পরিকল্পনা করে র‌্যাব দিয়ে আমার স্বামীসহ সাতজনকে খুন করেছে।”

নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের স্ত্রী অর্চনা সরকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হবে।

“কিন্তু র‌্যাবের রিপোর্টে নূর হোসেনসহ কয়েকজনের নাম না দেখে আমি বিস্মিত। আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে।”

এর‌্যাব প্রসঙ্গে সেলিনা ইসলাম বলেন, “নূর হোসেন ও তার সহযোগীরাই এই হত্যাকাণ্ডের হোতা। দোষী র‌্যাব সদস্যদের সাজা দেওয়ার আগে নূর হোসেনদের বিচারের দাবি জানান তিনি।”

তবে বাদিপক্ষের এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে আরো কিছু সময় চেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদউদ্দিন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের আরো কিছু সময় লাগবে। এই মামলার ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য ও স্বাক্ষ্যপ্রমাণ আমরা যোগাড় করেছি। আমাদের তদন্ত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অহেতুক সময় অতিবাহিত হোক আমরা কখনোই চাই না। মামলার প্রকৃত চিত্র আমাদের কাছে স্পষ্ট।

“হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সময় লাগলেও আমরা চাই এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হোক। যেহেতু এটি একটি স্পর্শকাতর ও বড় মামলা তাই আমরা তাড়াহুড়ো করব না। চার্জশীট বিবেচনা করে একটি স্বচ্ছ ও মানসম্পন্ন তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার অপেক্ষায় আছি।”

র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “আমাদের তদন্তে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে গেছে। যেহেতু তদন্ত এখনো চলছে তাই এ মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। আইওর (তদন্ত কর্মকর্তা) রিপোর্ট খুবই স্বচ্ছভাবে দেওয়া হবে।”

মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতার সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলেছে।”

এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার না করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এফআইআরে নাম বড় বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে তদন্ত ঠিকমতো হচ্ছে কি না।”

আলোচিত সাত খুনের ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন যথেষ্ট আন্তরিক ভূমিকা পালন করছে বলে দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।