পেঁয়াজের বাজার আরও গরম, না কিনেই ফিরছেন অনেকে

  • ফয়সাল আতিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-11-13 21:17:10 BdST

আগের দিনও যে পেঁয়াজের কেজি ১৪০-১৫০ টাকার মধ্যে ছিল, সকালেই তার দাম উঠে গেছে ১৭০-১৮০ তে; এ যেন ধাক্কার মতো লেগেছে- তাই পেঁয়াজ না কিনেই বাজার থেকে ফিরেছেন অনেকে।

বুধবার ঢাকার পাড়া-মহল্লার বাজার ও মুদি দোকানগুলোতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১৭০ টাকা থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, কোথাও কোথাও ২০০ টাকাও দাম চাওয়া হচ্ছে।

বিকালে মিরপুরের পীরেরবাগ কাচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, দেশি ক্রস জাতের পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়। এর থেকে বাছাই করা তুলনামূলক ভালো মানের পেঁয়াজের দাম চাওয়া হচ্ছিল প্রতি কেজি ২০০ টাকা।

এই বাজারের একটি মুদি দোকানের সামনে প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অন্তত পাঁচজন ক্রেতাকে পেঁয়াজের দাম শুনে ভ্রু কুচকাতে দেখা যায়। অন্য দুটি দোকানে গিয়েও একই দাম দেখেন তারা। এক পর্যায়ে পেঁয়াজ ছাড়া কাচাবাজারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনেই বাড়ি ফেরেন এসব ক্রেতা।

এর মধ্যে এই দোকান থেকে মাত্র একজনকে আধা কেজি পেঁয়াজ কিনতে দেখা যায়।

মুদি দোকানি মুরাদ হোসেন বলেন, মঙ্গলবার মিরপুর-১ নম্বরের পাইকারি বাজার থেকে প্রতি কেজি ১৫৫ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনে এনেছেন তিনি। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যোগ করে এখন তিনি প্রতি কেজি ১৭০ টাকায় বিক্রি করছেন।

“গতকালের পেঁয়াজ অর্ধেকও বিক্রি করতে পারিনি। তাই আজকে আর নতুন করে পেঁয়াজ কিনি নাই। কারণ কাস্টমাররা দাম শুনে যা তা মন্তব্য করছে। বিক্রিও কমে গেছে। তার চেয়ে ভালো যে আপাতত পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ রাখি।”

এই বাজারে কেনাকাটা করতে আসা পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী বলেন, “দুইশ টাকা যদি পেঁয়াজ কিনতেই খরচ করতে হয় তাহলে অন্যান্য সদাই করব কীভাবে? পেঁয়াজের এত দাম আমার জীবনে দেখি নাই। স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে আর পেঁয়াজ খাওয়া সম্ভব না।”

দুপুরে মগবাজারের পেয়ারাবাগের সবজির দোকানে পেঁয়াজের দাম জিজ্ঞেস করে জবাব শুনে বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখা যায় কয়েকজনকে।

সেখানকার এক দোকানে কেজি চাওয়া হচ্ছিল ১৮০ টাকা, অপরটিতে ১৭০ টাকা।

রনি নামের সেখানকার এক দোকানি বলেন, সকালে কারওয়ানবাজারে গিয়ে দেখেন পেঁয়াজের দাম আগের দিনের চেয়ে পাল্লায় (৫ কেজি) প্রায় ১০০ টাকার মতো বেশি।

১৭০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করা এই তরুণ বলেন, তার পেঁয়াজটা তুলনামূলক কম দামের। মঙ্গলবার ৬৮০ টাকায় এক পাল্লা পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে এদিন লেগেছে ৭৫০ টাকা। আর ভালো মানের পেঁয়াজের পাল্লা ৭২০ টাকা থেকে ৮০০ টাকায় উঠেছে।

১৮০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করা সেখানকার দোকানি হানিফ মিয়া বলেন, “কী করব দামই বেশি পড়েছে। এখন পেঁয়াজ বিক্রিও কমে গেছে। আগে দিনে ২০ কেজির মতো বিক্রি হত। আজকে ১০ কেজি এনেছি, এখনও তো প্রায় পুরোটাই রয়ে গেছে।” 

পীরের বাগে একটি দোকানে গিয়েই দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতে চার এক নারী ক্রেতা। তখনও পেঁয়াজের দাম ভালো করে বুঝে উঠতে পারেননি তিনি।

বিক্রেতা যখন জানালেন দুই কেজির দাম ৩৪০ টাকা, তখনই হতবিহ্বল হয়ে পেঁয়াজ রেখে চলে যান তিনি।

পারে দোকানি বলেন, “আমি বলেছিলাম, দেশি পেঁয়াজ কেজি ১৭০ টাকা আর আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ১৪০ টাকা। ওই মহিলা ভেবেছেন দেশি পেঁয়াজ কেবল ৭০ টাকা। তাই তিনি দুই কেজি মাপতে বলেছিলেন। পরে মাপা পেঁয়াজ না নিয়েই চলে যান তিনি। বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে।”

মিরপুরে বড়বাগ কাচাবাজারের মুদি দোকান মীম অ্যান্ড প্রান্তিকা স্টোরের বিক্রেতা নাজমুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দামের কারণে পেঁয়াজের বাজারের খুব শোচনীয় অবস্থা। মানুষ ১০ টাকার পেঁয়াজ কিনতে চায়। অথচ একশ গ্রাম পেঁয়াজের দাম আছে ১৭ টাকা। সবাই গালি দেয়। কিন্তু আমাদের কী করার আছে?”

মিরপুর -১ নম্বরে পাইকারি আড়তে পেঁয়াজের দাম নিয়ে কথা হয় আড়তদার মোস্তফা কামালের সঙ্গে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সত্যিকার অর্থেই বাজারে পেঁয়াজের প্রচুর সঙ্কট রয়েছে। সেই কারণে সরকার নানা অভিযান চালানোর পরেও, অনেক জেল-জরিমানা করার পরেও দাম কমাতে পারেনি। কয়েক দিন আগে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আমদানি করা পেঁয়াজ সরবরাহে সমস্যা হয়েছে। আর সেই কারণেই এখন বাজারের এই পরিস্থিতি।”

পেঁয়াজের কেজি দেড়শ, মন্ত্রী বললেন ‘নিয়ন্ত্রণে’  

সঙ্কটের সুযোগে অনেক পেঁয়াজ ব্যবসার বিভিন্ন ধাপে অতি মুনাফা হচ্ছে বলেও স্বীকার করেন এই ব্যবসায়ী। তবে বেচা-বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে নিজের আড়ৎ লোকসানে পড়েছে বলে জানান তিনি।

“এখন পেঁয়াজের পাইকারি মূল্য আছে প্রতি কেজি ১৫৫ টাকা থেকে ১৬০ টাকা। তাহলে খুচরায় সেই পেঁয়াজ বিক্রি হতে পারে সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা। এর চেয়ে বেশি দাম যারা রাখছে তারা অবশ্যই অন্যায় করবে,” বলেন ওই মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল।

পেঁয়াজের বিক্রি কমার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “এই দোকানে আমি সাধারণ সময়ে ১০০ থেকে দেড়শ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি করতাম। এখন সারা দিনে ২০ বস্তা পেঁয়াজও বিক্রি করতে পারছি না। তাহলে আনুষাঙ্গিক খরচ পোষাতে প্রতি বস্তায় কত টাকা লাভ করতে হবে? দামই যেখানে আকাশচুম্বি সেখানে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ কোথায়?”

অন্যান্য পাইকার ও মুদি দোকানিরাও বলছেন, গত এক সপ্তাহে পেঁয়াজের বিক্রি বেশ কয়েক গুণ কমে গেছে।

এতে পাইকারি বিক্রির আড়ৎগুলো ‘লোকসানের মুখে পড়ছে’ বলেও দাবি করেন অনেকে। 

সর্বশেষ পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলকে ঘিরে। গত শনিবার বুলবুল আঘাত হানার একদিন আগে থেকে নতুন করে বাড়তে থাকে দাম। তার আগে খুচরায় পেঁয়াজের দাম ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে ছিল।

ঢাকায় পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার শ্যামবাজারেও পেঁয়াজের সরবরাহে টান পড়েছে বলে সেখানকার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

আলহাজ বাণিজ্য বিতানের পরিচালক অমিতাভ কুন্ডু বুধবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাজারে মালের সাপ্লাই নাই বললেই চলে। পেঁয়াজ নাই, ক্রেতাও নাই। বুধবার সারা দিন এভাবেই পার করেছি।

“পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজ কেজি দেড়শ টাকা এবং মিশরের পেঁয়াজ ১১৫ টাকা থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।” 

থমকে গেছে টিসিবির বিক্রি

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার পর খোলা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবি। সর্বশেষ প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ৩৫টি ট্রাক বসিয়ে প্রতি কেজি ৪৫ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছিল তারা।

একজন ক্রেতা এক কেজি করে পেঁয়াজ কিনতে পারছিলেন। আর ট্রাক সেলের ডিলার পাচ্ছিলেন প্রতি দিন এক টন করে পেঁয়াজ। অর্থাৎ দিনে একটি ট্রাক থেকে প্রায় এক হাজার পরিবারের পেঁয়াজের চাহিদা পূরণ হচ্ছিল।

তবে চলতি সপ্তাহে মাত্র একদিন খোলা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পেরেছে টিসিবি।

সংস্থার মুখপাত্র হুমায়ুন করিব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার সপ্তাহিক ছুটির কারণে বিক্রি বন্ধ ছিল। রোববার ছিল সরকারি ছুটি। এর মধ্যে কেবল সোমবার পেঁয়াজের ট্রাক সেল দেওয়া হয়েছে।

“সরবরাহ ঘাটতির কারণে মঙ্গলবার পেঁয়াজ বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। টেকনাফ থেকে পেঁয়াজের ট্রাক ঢাকার পথে রয়েছে। বুধবার রাতের মধ্যে সেগুলো ঢাকায় পৌঁছালে বৃহস্পতিবার পেঁয়াজ বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।