পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

করোনাভাইরাস: বিশ্বজুড়ে অচলাবস্থার ধাক্কা চিংড়ি বাজারেও

  • ফয়সাল আতিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-02 23:07:08 BdST

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বব্যাপী চলমান লকডাউন পরিস্থিতির খাড়া এসে পড়েছে দেশের বিকাশমান রপ্তানি খাত চিংড়ি তথা হিমায়িত মৎস্যের বাজারে।

আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ায় দেশের বাজারেও এই মাছের দাম পড়তে শুরু করেছে। ফলে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখন লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন চাষীরা।

বাংলাদেশে মোট উৎপাদিত চিংড়ির অধিকাংশই চাষ হয় দক্ষিণের জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায়। এর বাইরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় লোনাপানি ধরে রেখে স্বল্প পরিমাণে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ হয়ে থাকে।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে চিংড়ি উৎপাদনে ক্রমাগত প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে বাংলাদেশ। গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে প্রায় এক লাখ ২২ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন চিংড়ি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। বাকি চিংড়িতে মিটেছে অভ্যন্তরীণ চাহিদা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চিংড়ি ও হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। চলতি ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫২০ মিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সর্পোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি কাজী বেলায়েত হোসেন শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চিংড়ি দামি ও সৌখিন খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে যে মন্দা ও অবরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে এই পণ্যের চাহিদা গেছে কমে। ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারাও গত ফেব্রুয়ারি থেকে এই পর্যন্ত ২৯০টি ক্রয়াদেশ বাতিল করেছেন, যাতে ‘৪৬০ কোটি টাকা লোকসান হবে’ বলে ব্যবসায়ীরা হিসাব করে দেখেছেন।

“এখন এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এসে কিছু নতুন ক্রয়াদেশ আসছে। তবে এসব আদেশে দাম অনেক কম বলা হচ্ছে। প্রতি পাউন্ডে এক ডলার করে কম দিতে চাচ্ছেন ক্রেতারা। আগে ২০ গ্রেডের যে মাছ প্রতি পাউন্ড ছয় ডলার করে বিক্রির ক্রয়াদেশ আসছিল, সেগুলো বাতিল হয়ে গিয়ে এখন ৪ দশমিক ৮০ ডলার, ৪ দশমিক ৯০ ডলার করে দাম বলছেন কিছু কিছু ক্রেতা। এতে করে আমাদের যে বিনিয়োগ তা তুলে আনা কষ্টকর হবে। আর সাড়ে চার ডলার রপ্তানিমূল্য ধরে কৃষকের কাছ থেকে মাছ কিনলে তাতে কৃষকেরও পোষাবে না।”

বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষী সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন বলেন, বর্তমানে বাজারে ২০ গ্রেডের চিংড়ি প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকায় নেমেছে, যা আগে ৭০০ টাকা থেকে ৭৩০ টাকার মধ্যে ছিল। এসব চিংড়ি উৎপাদনে ৫০০ টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে জেলার ৬৯ হাজার চিংড়ি চাষী লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে চিংড়ির দেশীয় বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানিকারকরা যেন  সরাসরি চাষীর কাছ থেকে মাছ কেনেনতা  নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান সুমন।

বাগেরহাটের চিংড়ি চাষী সমিতি ও বাগেরহাট জেলা মৎস্য অফিসের হিসাবে,  কৃষক পর্যায়ে গলদা চিংড়ির উৎপাদন খরচ পড়ছে গড়ে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা । বাগদা চিংড়িতে সাড়ে ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা কেজি।

প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথম দিকে চাষীরা তাদের ঘের প্রস্তুত করে মাঘী পূর্ণিমা তিথি থেকে বাগদার রেণু পোনা ছাড়া শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে জেলার ঘের মালিকরা তাদের ঘেরে রেণু ছাড়তে থাকেন। আর ধরা শুরু হয় বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা খালেদ কনক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জেলায় ৪৯ হাজার ১৪৪ হেক্টর জমি জুড়ে ৭৮ হাজার ১০০টি বাগদা ও গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে।

“এবার মওসুমের শুরুতে চিংড়ির দামটা বেশ ভালো ছিল। করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার আগে গলদা প্রতি কেজি ১২০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা বিক্রি হয়েছিল। আর বাগদা বিক্রি হয়েছে ৭০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা কেজি। করোনাভাইরাসের প্রভাবে চিংড়ি মাছের দামটা পড়ে গেছে। বাগদা সাড়ে ৪০০ টাকা এবং গলদা ৫০০ টাকা থেকে সাড়ে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “করোনাভাইরাসের প্রভাবে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা বিবেচনায় কৃষকরা যদি বর্তমান মূল্যও পায় তাতেও টিকে থাকতে পারবে। এই মুহূর্তে কৃষকের চাওয়া হচ্ছে যা বিক্রি হবে তা যেন নগদ টাকার বিনিময়ে হয়।”

জেলা মৎস্য অফিসের হিসাবে গত অর্থবছরে এই জেলায় চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ৩৩ হাজার ৯৪৮ টন, দামেও ছিল বেশ। চলতি বছরের উৎপাদন এখনও হিসাব করা যায়নি।

বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা এলাকার চিংড়ি ঘের মালিক কবির হোসেন বলেন, এ বছর ৬৫ বিঘা জমিতে এক লাখ ৩০ হাজার বাগদা চিংড়ির পোনা চাষ করতে শ্রমিক মজুরিসহ খরচ হয়েছে নয় লাখ টাকার উপরে। তবে এখন বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে গিয়ে দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে মূলধন হারানোর শঙ্কার কথা জানান তিনি।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু ছাইদ বলেন, তার জেলায় ৬৬ হাজার চিংড়ির ঘের রয়েছে। এর মধ্যে গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে ৪১ হাজার, ২৫ হাজার রয়েছে বাগদা চিংড়ির ঘের। দুটি মিলিয়ে প্রায় ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলার মৎস্য কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, জেলায় চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ৭৫ হাজার চাষী। এ বছর ১১ হাজার ৬৬৬ হেক্টর জমিতে গলদা চিংড়ি এবং ৬৬ হাজার ৭৯৭ হেক্টর জমিতে বাগদা চাষ হয়েছে। জেলায় মোট ঘেরের সংখ্যা ৫৪ হাজার ২৭৯টি।

চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এফ এম শফিকুজ্জোহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববাজারের মূল্যের চেয়ে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ বেশ কম। আশির দশকে এই খরচ অনেক কম থাকলেও এখন বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি যোগ করার কারণে কিছুটা বেড়েছে। এক সময় চিংড়িকে কোনো খাবার দিতে হত না। এখন খাবার দেওয়া হয়। এখন যে উৎপাদন খরচ হয় তার ৬০ শতাংশই খাবারের পেছনে ব্যয় হয়।

“চিংড়ির বাজার মূল্য প্রতি কেজি ৬০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে উঠানামা করছে। এই মূল্য ধরে রাখতে পারলেও চাষী ২০ থেকে ৩০ শতাংশ লাভ করতে পারবেন।”

এই পরিস্থিতিতে ইলিশের মতো চিংড়িরও যদি দেশীয় বাজার সৃষ্টি হয় তাহলে এ ধরনের বৈশ্বিক সংকটেও এই খাতের কোনো ক্ষতি হবে না বলে মনে করেন তিনি।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত ঘের থেকে তুলে হিমায়িত করার পর ছয়মাস আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ি মাছের বিক্রয় যোগ্যতা থাকে। হিমায়িত করার পর এক বছর থেকে দুই বছর পর্যন্ত এই মাছ খাওয়া গেলেও রপ্তানি করা যায় না। বাংলাদেশের হিমায়িত খাদ্যের মূল বাজার (৭০ শতাংশ) হচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো। এর বাইরে ১০ শতাংশ যায় আমেরিকান দেশগুলোতে। জাপান, রাশিয়াতেও বাংলাদেশি চিংড়ি রপ্তানি হয়।

চিংড়ি চাষ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকে বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় চিংড়ি চাষ শুরু হয়। কালের পরিক্রমায় এখন দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে চিংড়ি চাষের সাথে জড়িত।

ভাবা হচ্ছে নানা বিকল্প

মৎস্য অধিদপ্তরের চিংড়ি শাখার উপ-পরিচালক শামীম হায়দার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চিংড়ি বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য হতে চলেছে। গত বছরের চেয়ে এবার বিশ্ববাজারে চিংড়ির দাম এবং চাহিদা দুটোই ভালো ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে একটা অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজার ও দেশীয় বাজারে পণ্যের দাম পড়ে যাচ্ছে।

চিংড়ি চাষাবাদ, চিংড়ির পোনা প্রস্তুত করা ও হিমায়িতকরণ কাজের সঙ্গে  আড়াই লাখ মানুষ জড়িত জানিয়ে তিনি বলেন, “সব কিছু বিবেচনা করে সরকার এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার কথা ভাবছে।

“প্রথমত আমরা জেলাভিত্তিক ও স্তরভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের কাজ শুরু করেছি। সরকার কৃষকদের জন্য যে প্রণোদনা স্কিম ঘোষণা করেছে তার সঙ্গে চিংড়ি চাষীদের যুক্ত করা হবে। সরাসরি চিংড়ি চাষীদের হাতে কোনো প্রণোদনা তুলে দেওয়া যায় কি না সেটা ভাবা হচ্ছে। রপ্তানিকারকরা যাতে ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে আপাতত হিমায়িত করে রাখেন সেজন্য তাদের বিভিন্ন উপায়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে।”

এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য ইউরোপের বিকল্প বাজার খোঁজার কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে রপ্তানিকারকদের সংগঠনের সভাপতি বেলায়েত হোসেন বলছেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য হ্রাসের সমস্যা ঠেকাতে সরকারের উচিত চিংড়ির রপ্তানি প্রণোদনা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা। এতে রপ্তানিকারকরা কৃষক পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে দিতে পারবেন।”

এর বাইরে কৃষকদের একর প্রতি এক লাখ টাকা করে স্বল্প সুদের ঋণ চালু করার আহ্বান জানান তিনি।

সাতক্ষীরা জেলার মৎস্য কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, রপ্তানি চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে খালবিলের হরিণা চিংড়ির চেয়েও দাম কমে গেছে চাষের চিংড়ির। লকডাউনের আগে যে চিংড়ি প্রতি কেজি এক হাজার টাকা থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল এখন সেটা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা থেকে সাড়ে ৬০০ টাকায়। দাম কমে যাওয়ার কারণে চাষীরা চিংড়ি বিক্রি করতে পারছে না। ঘের খালি না হওয়ায় নতুন পোনাও ছাড়তে পারছে না।

“এই পরিস্থিতিতে আমরা সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ পাঠিয়েছি। এর মধ্যে অন্যতম হল, আপাতত কৃষকদের তালিকা করে হিমাগার মালিকদের মাধ্যমে চিংড়ি কিনিয়ে তা হিমায়িত করা। এজন্য প্রয়োজন হলে হিমাগার মালিকদের অতি দ্রুত সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা।”

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বাগেরহাট প্রতিনিধি অলীপ ঘটক।]