রেস্তোরাঁ-ক্যাফে খুললেও সেই ব্যবসা ফিরছে না

  • সাজিদুল হক, নিজস্ব প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-07-06 10:21:35 BdST

রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকার সাত মসজিদ রোডের একটি ক্যাফেতে গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি পর্যন্তও বন্ধুদের নিয়ে প্রতি সপ্তাহে আড্ডা দিতেন অদিতি ইরা। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইরা গত প্রায় তিন মাস পছন্দের ওই ক্যাফেতে যেতে পারেননি।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে বন্ধ রয়েছে তার পছন্দের ক্যাফেটি। ফ্লেভারস মিউজিক ক্যাফে নামের ওই রেস্তোরাঁ সাত বছর আগে শুরু করেন এস এম রাজন।

মহামারীকালে সম্প্রতি এটি পুনরায় চালু করার চিন্তা-ভাবনা করলেও এখনও দ্বিধাগ্রস্ত রাজন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে সঙ্কটের সময় পার করছেন এখন। দক্ষ কর্মী সঙ্কট, দোকানের ভাড়া, আশানুরূপ গ্রাহক পাবেন কি না, এসবই এখন তার চিন্তার বিষয়।

রাজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অল্প কিছুদিনের মধ্যে আমরা পুনরায় চালু করার ভাবছি। ডাইন-ইন দিয়েই শুরু করতে চাই। সেটা করতে চাইলে বসার ক্যাপাসিটি কমে যাবে। অনলাইনেও চালু করব। সেখানেও প্রায় একই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

“আসলে শুধু অনলাইন অর্ডার নিয়ে টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে যাবে। এখন স্বাভাবিকভাবে কাস্টমারও কমে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা বাড়িওয়ালা তো ছাড় দিচ্ছে না।”

কবে নাগাদ চালু করতে পারবেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখনও ভাবছি। সবগুলো অবজেকটিভ কন্ডিশন মোটামুটি মিলে গেলে চালু করতে পারব।”

“সেক্ষেত্রে কাস্টমার পাওয়াটাও চ্যালেঞ্জ,” এই দুঃশ্চিন্তাটুকুও মাথা থেকে নামছে না তার।

রাজনের সেই দুঃশ্চিন্তার যে কারণ আছে, তা বোঝা যায় তার ক্যাফের নিয়মিত গ্রাহক অদিতির কথায়।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যদি স্বাস্থ্যবিধি ঠিক ঠিক মেনে তারা চালায়, তবে যাব।”

রাজনের ক্যাফে সাত মসজিদ রোডের যে ভবনে, সেখানে আরও বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকান রয়েছে। দুয়েকটি খুললেও আশানুরূপ গ্রাহক পাচ্ছে না।

বিদেশিদের যাতায়াত বেশি থাকে গুলশানের বিস্ত্রো ই-তে। ২৫ জুন থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টেকঅ্যাওয়ে সেবা চালু করেছে তারা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

বিদেশিদের যাতায়াত বেশি থাকে গুলশানের বিস্ত্রো ই-তে। ২৫ জুন থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টেকঅ্যাওয়ে সেবা চালু করেছে তারা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

 

নতুন করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে চলা টানা ৬৬ দিনের লকডাউন ওঠার পর গত ৩০ মে থেকে সীমিত পরিসরে অফিস খোলার পাশাপাশি দোকানপাটও দিনের বেলা খুলতে দেওয়া হয়। ১ জুলাই থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকানপাট ও শপিংমল খোলা রাখা যাচ্ছে।

গত শতকের ৯০ এর দশক থেকে রাজধানীর বনানী, ধানমণ্ডিসহ কয়েকটি এলাকায় জমজমাট হয়ে ওঠে ক্যাফে-রেস্তোরাঁর ব্যবসা। এসব খাবারের দোকান হয়ে ওঠে তরুণ-যুবাদের আড্ডাস্থলও।

২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলার পর বেশ কিছুদিন ওই এলাকার রেস্তোরাঁগুলোর ব্যবসায় খরায় পড়ে। তবে তার প্রভাব অন্য এলাকায় পড়েনি।    

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিক্রির এই খাতে করোনাভাইরাস মহামারীর যে প্রভাব পড়েছে, তাতে অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে সমিতির তালিকাভুক্ত প্রায় ৮ হাজার রেস্তোরাঁ রয়েছে। সমিতির বাইরে রয়েছে আরও ছোট-খাটো অনেক খাবারের দোকান।  

সমিতির হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ শ্রমিক সরাসরি যুক্ত এই খাতের সঙ্গে। আর ঢাকা শহরে লাখের ওপর।

দীর্ঘদিন বন্ধ এবং ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে যেসব রেস্তোরাঁ খোলা আছে, সেগুলোতেও গ্রাহক কম।

রেস্তোরাঁ মালিক এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, ‘লকডাউনে’ কর্মচারীদের ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়া, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পুঁজি হারানো, বাড়িভাড়ার সমস্যা এবং সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে তারা সঙ্কটে পড়েছেন।

তারা বলছেন, সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় দিলে এই ব্যবসা চালানো তাদের জন্য কঠিন হবে। তাদের যুক্তি, খাবার একটি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস। সাধারণ দোকানের সঙ্গে এটিকে গুলিয়ে ফেললে হবে না।

অনলাইনে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছেন, ফেব্রুয়ারি-মার্চের তুলনায় তাদের অর্ডার বেড়েছে। অংশীদার রেস্তোঁরার সঙ্গে আলাপ করে খেলার ব্যবস্থাও করছেন তারা।

ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের প্রেজি কফি শপ কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে ৩১ মে থেকে ব্যবসা পুনরায় চালু করে। শুরুতে শুধু পার্সেল সার্ভিস রাখলেও গত দুই সপ্তাহ ধরে ‘ডাইন-ইন’ চালু করেছে তারা।

তবে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে গ্রাহক বসানোর বাধ্যবাধকতার জন্য কমে গেছে আসন সংখ্যা। আগে যেখানে ৯৫ জন বসতে পারত, এখন সেখানে সর্বোচ্চ ৩৫ জন বসতে পারছে। ৫-৭ জন কর্মী মিলে রোস্টার করে দোকানটি চালাচ্ছেন। আগে কর্মী সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ।

প্রেজির সহকারী ব্যবস্থাপক শাহরিয়ার শিহাব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে তাদের বিক্রি কমে গেছে ৬০ শতাংশ।

তিনি বলেন, “স্বাভাবিকভাবেই বিক্রি কমেছে। আসন সংখ্যা ৩৫ এ নামিয়ে আনা হয়েছে। সেটাও পূরণ হচ্ছে না।”

প্রেজি কফি শপেই বসে কথা হয় এর নিয়মিত গ্রাহক ফাহাদ বিন শাখাওয়াতের সঙ্গে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই ক্যাফেতে মূলত সপ্তাহে এক-দুইবার আসাই হত। দীর্ঘদিন পর আবার এলাম। ছুটির দিনে বন্ধুদের নিয়ে কিছু সময় কাটানোর যে জায়গা সেটা এই মহামারীর কারণে পাল্টে গেল। এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে বলেই দুই দিন হল আসছি।“

রাজধানীর গুলশান ও বনানীতে দুটো শাখা রয়েছে ‘টাইম আউটের’। প্রায় ২০ বছর ধরে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ব্যবসা করছে এ প্রতিষ্ঠানটি। মহামারীতে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে কত দিন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবেন, তা নিয়ে এখন সন্দিহান প্রতিষ্ঠানটির মালিক সংগীতা আহমেদ।

এই রেস্তোরাঁটিরও ৬০ শতাংশ আসন কমিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রথমে হোম ডেলিভারি ও পার্সেল সার্ভিস চালু করলেও গত ২ জুলাই থেকে ডাইন-ইন চালু হয়েছে।

সংগীতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের বসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে ৬০ ভাগ জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে। আগে যদি ১০০ জন বসতে পারতেন এখন পারবেন ৪০ জন।

“এমন অবস্থায় আসলে কিছু করার নেই। এরকম পরিস্থিতিতে কতদিন চালাতে পারব, জানি না।”

রেস্তোরাঁ কারি একসেন্টের পরিচালক (অপারেশন) অভিষেক সিনহা বলেন, “পয়লা রমজান থেকে আমরা হোম ডেলিভারি চালু করেছি। ৮০ জন কর্মী ছিল, এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ এ। ঢাকা থেকে অনেকে চলে গিয়েছিল। যারা ঢাকায় ছিল তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ব্যবসা চালু রেখেছি।”

রেস্তোরাঁ খোলার সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে অভিষেক বলেন, “অন্তত রাত ১০টা পর্যন্ত চালু রাখতে না পারলে টিকে থাকা মুশকিল। শুধু হোম ডেলিভারি দিয়ে টিকে থাকা যাবে না।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে রেস্তোরাঁ ব্যবসার বিভিন্ন সঙ্কটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যারা অনেক বেশি বিনিয়োগ করে ব্যবসা করছে, তাদের অবস্থাও সুবিধার নয়। যারা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তাদের যে কী অবস্থা!”

গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁ বিস্ত্রো ই’র ব্যবস্থাপক শামীম শরীফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডাইন-ইন কবে চালু করা হবে, সেটা এখনও কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়নি।”

বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিদের আনাগোণা বেশি থাকা এই রেস্তোরাঁটি ২৫ জুন থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টেকঅ্যাওয়ে সেবা চালু করেছে।

ভরপুর ব্যবসার রেস্তোরাঁ স্টার কাবাব বন্ধ রয়েছে এখনও। ছবি: হাসান বিপুল

ভরপুর ব্যবসার রেস্তোরাঁ স্টার কাবাব বন্ধ রয়েছে এখনও। ছবি: হাসান বিপুল

 

শঙ্কায় কর্মচারীরাও

মোহাম্মদপুরের ফাস্ট ফুড শপ ঢাকা ফ্রায়েড চিকেনের এক কর্মচারী তার প্রতিষ্ঠান চালু থাকার পরও চাকরি নিয়ে শঙ্কায় আছেন।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে রংপুর থেকে ঢাকায় কাজ করতে আসা ওই কর্মচারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দোকান চালু আছে, বেতনও পাচ্ছি।

“কিন্তু যেভাবে কাস্টমার কমেছে, তাতে মালিক ক‘দিন দোকান চালু রাখবে, বুঝতে পারছি না। আর দোকান বন্ধ থাকলে তো বসিয়ে বসিয়ে কেউ বেতন দেবে না।“ 

প্রায় একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানালেন একই এলাকার রেইনবো ক্যাফের কর্মচারী মোহাম্মদ রাসেল। তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে তিন মাস।

ক্যাফে বন্ধ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন নরসিংদীতে বাড়িতে ফিরে বেকার ছিলেন। রোজার ঈদের পর কখনও মৌসুমী ফল, কখনও রাস্তার পাশে মাস্ক, স্যানিটাইজার এসব বিক্রি করেছেন। কিন্তু রাস্তার পাশে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জিনিস বিক্রি কম হয় বলে রাসেলের অভিমত।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ক্যাফে খুলবে শুনছি। আর কিছুদিন দেখব। যদি না খুলে তবে বাড়ি চলে যাব। টুকটাক মাস্ক-স্যানিটাইজার বিক্রি করে কোনো রকমে চলছি। আর ক্যাফে খুলবেই বা কেমন করে? মানুষ যাবে?”

রাজধানীর বনানীতে জনপ্রিয় একটি বার্গার শপের এক কর্মচারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা শুধু অনলাইন ডেলিভারি চালু রেখেছি। সাধারণভাবেই বোঝা যায় এখন অর্ডার কম আসছে। মানুষ বসে খেতে চায়, আড্ডা দিতে চায়। সেটা তো এখন সম্ভব হচ্ছে না।”

রাজধানীর কয়েকটি চেইন ফাস্টফুড শপও টেকঅ্যাওয়ে চালু রেখেছে। বন্ধ রয়েছে বসে খাওয়ার ব্যবস্থ। বন্ধ রয়েছে স্টার কাবাব। নবাবী ভোজ দিচ্ছে পার্সেল সার্ভিস।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার রুহুল আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের সমিতিভুক্ত ৩০ শতাংশ রেস্তোরাঁ খুলতে পেরেছে। বাকি ৭০ ভাগ আমরা চালু করতে পারিনি।

“প্রকৃতপক্ষে রেস্তোরাঁয় সন্ধ্যার পরে বিক্রি বেশি হয়। কিন্তু ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখতে বলাটা একটু অমানবিক। মন্ত্রণালয় যে প্রজ্ঞাপন দিয়েছিল সেখানে বলা ছিল ১০টা থেকে ৪টা খোলা রাখা যাবে। সেখানে কৃষি পণ্য, ওষুধ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, খাবার জাতীয়… ওই সময়ের আওতার মধ্যে পড়বে না এমন বলা ছিল। রেস্তোরাঁ লেখা ছিল না বলে পুলিশ রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিয়েছিল।”

বিষয়টি বিবেচনার জন্য সরকারকে লিখিতভাবে অনুরোধ করা হয়েছে জানিয়ে রুহুল আমিন বলেন, “৭টা পর্যন্ত করলে হবে না। এটা ১২টা পর্যন্ত না করলে আমরা পারব না। দোকান বন্ধ রেখে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিতে পারব না।”

আয় কম হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “খাবার নিত্য প্রয়োজন। মানুষের কিছু ভয় আছে। তবে আস্তে আস্তে তারা রেস্তোরাঁয় আসছে।”

সরকার ঘোষিত ঋণ পেতে অসুবিধার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন রানিং ক্যাপিটাল হিসেবে আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে ৪.৫% সুদে ঋণ দেবেন। কিন্তু ব্যাংক বলছে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো সার্কুলার পায়নি। সারাদেশে ৩০ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে। আমাদের জন্য সার্কুলার দিক না একটা! এটা তো ঋণ। রানিং ক্যাপিটাল ছাড়া এত দিন পর কীভাবে ব্যবসা করব।”

করোনাভাইরাস সঙ্কটে ঘর থেকে বের হতে না পারার কারণে বেড়েছে অনলাইনে খাবার কেনা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

করোনাভাইরাস সঙ্কটে ঘর থেকে বের হতে না পারার কারণে বেড়েছে অনলাইনে খাবার কেনা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

 

বেড়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অর্ডার

এদিকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খাবার ডেলিভারি দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্চ-এপ্রিল মাসের তুলনায় তাদের এখন অর্ডার বেড়েছে। অংশীদার রেস্তোরাঁগুলোর সঙ্গে ব্যবসা চালু করার বিষয়ে আলোচনাও চালাচ্ছে তারা।

 দেশীয় প্রতিষ্ঠান হাংরিনাকি ডটকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম বিন মহিউদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগে আমাদের যে অর্ডার হত সেটা মার্চ এপ্রিলে ১৫-২০ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। এখন যদি তুলনা করি সেটা ৪০ শতাংশ।”

প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি সিইও ইব্রাহিম বলেন, “এই সময়টাতে ব্যক্তিগত অর্ডারের চেয়ে পারিবারিক অর্ডার বেশি আসছে।”

মহামারীকালের আগে সপ্তাহে ২-৩ দিন বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খাবার অর্ডার করতেন ব্যাংক কর্মকর্তা জয়া তাসনিম রহমান। কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে সম্প্রতি পছন্দের একটি রেস্তোরাঁ অনলাইন ডেলিভারি চালু করায় আবারও টুকটাক অর্ডার করছেন তিনি।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জিজ্ঞাসায় বলেন, “মাত্র দু‘দিন আগেই অনলাইনে কাচ্চি বিরিয়ানি অর্ডার করেছি। সুলতানস ডাইনের কাচ্চি পছন্দ করি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে বলেই অর্ডার করেছি।”

ফুডপ্যান্ডা বাংলাদেশের সিইও আম্বরিন রেজা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যখন বাংলাদেশে প্রথম মহামারী আঘাত হানে, সেসময় প্রথম কয়েক সপ্তাহ রেস্টুরেন্টে স্বাভাবিকভাবেই কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সরকার যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে তখন রেস্টুরেন্ট শিল্পের কর্মীদের একটি বড় অংশ ঢাকা ছেড়ে বাড়ি চলে যায়। এসময় রেস্টুরেন্টগুলো কর্মচারী সংকটের কারণে তাদের স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতে পারেনি। কয়েক সপ্তাহ এমন অস্থিরতার পর বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট তাদের রান্নার কার্যক্রম শুরু করে।

“আমরা রমজানের পর থেকেই দেখতে পাচ্ছি রেস্টুরেন্টগুলো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করে, তবে এসব রেস্টুরেন্টগুলোকে কেবল ডেলিভারি অনুমোদন দেওয়া হলেও খাবার পরিবেশন বন্ধ রাখা হয়। এ অবস্থা আমরা এসব রেস্টুরেন্টগুলো চালু রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।”

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের সকল রেস্টুরেন্ট পার্টনারদের সাথে খুব নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। যাতে আমরা আমাদের গ্রাহকদের পুনরায় খাবার সরবারহ বা পরিবেশন করার সময় সকল ধরনের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পারি।”

সামজিক দূরত্বের বালাই নেই পুরান ঢাকার বেচরাম দেউড়ির হাজি নান্না বিরিয়ানিতে। ছবি: হাসান বিপুল

সামজিক দূরত্বের বালাই নেই পুরান ঢাকার বেচরাম দেউড়ির হাজি নান্না বিরিয়ানিতে। ছবি: হাসান বিপুল

 

সামজিক দূরত্বের বালাই নেই অনেক রেস্তোরাঁয়

পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ রেস্তোরাঁগুলোর মধ্যে যারা ব্যবসা চালু করেছে তাদের মধ্যে গ্রাহকদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কোনো ব্যবস্থাই নেই। অভিজাত এলাকার রেস্তোরাঁগুলো সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে।

পুরান ঢাকা বেচারাম দেউড়ীর ঐতিহ্যবাহী হাজি নান্না বিরিয়ানির দোকানে কর্মরত মোহাম্মদ কবীর জানান, রোজার সময় তারা পার্সেল বিক্রি করেছে। এরপর ১৪ জুন থেকে দোকান খুলেছে।

ওই দোকানে গিয়ে দেখা যায়, সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। একসাথে চারজন পাশাপাশি বসে খাওয়া-দাওয়া করছে। দোকানের ক্যাশকাউন্টার এবং ঢোকার মুখেও দূরত্ব বজায় রেখে চলার কোনো ব্যবস্থা নেই।

বিষয়টি কথা বলতে চাইলে দোকানে কর্মরত কেউই মুখ খুলতে চাননি।

পুরান ঢাকার নাজিরা বাজার এলাকার বিরিয়ানি ও সাধারণ রেস্তেরাঁগুলোতেও একই অবস্থা। একমাত্র বিখ্যাত হাজির বিরিয়ানি পার্সেল বিক্রি করছে। তারা রশি টাঙিয়ে দূরত্ব নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করেছে।

মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকার আল্লার দান রেস্তোরাঁর ম্যানেজারকে সামাজিক দূরত্ব না মেনে বসতে দেওয়ার ব্যবস্থা না করার কারণ জিজ্ঞেস করলে নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, “এথন কাস্টমারই তো কম আসে। যার যেখানে খুশি বসতে পারে।”

 দোকানে পাশাপাশি বা দু’জনকে দেখিয়ে দিলে তিনি বলেন, “একলগে আইসা আলাদা বয় ক্যামনে। এইডা কাস্টমারের ব্যাপার। সাবান তো আছেই। সবাই হাত ধুইতাছে। খুব কষ্ট কইরা দোকান খুলছি, ল্যখালেখি কইরা বন্ধ করাইয়েন না।”

 ধানমণ্ডির প্রেজি কফি শপের সহকারী ব্যবস্থাপক শাহরিয়ার শিহাব নিজের প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা তুলে ধরে তিনি, “আমাদের এখানে যেই আসছেন তাকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হচ্ছে। মাস্ক না থাকলে আমরা মাস্ক সরবরাহ করছি। সামাজিক দূরত্ব মেনে গেস্টদের বসাচ্ছি। আমাদের কর্মীদের ব্যাপারেও আমরা সচেতন।”

স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলা হচ্ছে জানিয়ে টাইম আউটের সংগীতা বলেন, “মাস্ক ছাড়া আমরা কাউকেই ঢুকতে দিচ্ছি না। জুতা স্যানিটাইজ করা হচ্ছে। এরপর হাত স্যানিটাইজ করে আমরা গেস্টদের বসতে দিচ্ছি। কাটলারিগুলোও আমরা গেস্টের সামনে জীবাণুমুক্ত করছি। যাতে তারা আশ্বস্ত হতে পারেন।”

শিফট করে কর্মীদের কাজ করানো হচ্ছে এবং তাদের জন্য নির্দিষ্ট থাকার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা কর্মীদের ক্ষেত্রেও একটা ব্যবস্থা নিয়েছি। ৮ জন করে কাজ করছে। তাদের রাখছিও আমাদের ব্যবস্থপনায় যাতে তারা বাইরে যেতে না পারে। এক সপ্তাহ কাজ করছে। তারপর নতুন আরেক দল আসছে।”

বিষয়টি নিয়ে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি রুহুল আমিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “অনেক খাবারের দোকানে নিয়ম মানা হচ্ছে। সাধারণ শ্রেণীর দোকানগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। তারা অনেকে আমাদের সদস্যও নয়। এখানে সিটি কর্পোরেশন যদি একটু দেখভাল করে, ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া দোকানগুলো তুলে দিত তাহলে ভালো হতো।”

নিজের রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালানো হচ্ছে জানিয়ে রুহুল আমিন বলেন, “সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়টা চেষ্টা করছি। ক্রেতাদের এখানে দায়িত্ব আছে। তারা একসাথে বসতে চাচ্ছে। তবে অনেকেই অভ্যস্ত হচ্ছেন। গত প্রায় চার মাস ধরো মাস্ক-স্যানিটাইজার, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এগুলো অভ্যাস করছে।”