পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

নাটকীয় নিলাম যুদ্ধে শীর্ষস্থান ধরে রাখল গ্রামীণফোন

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-03-08 22:32:18 BdST

তরঙ্গ নিলামে ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের শেষ একটি ব্লক নিয়ে সাড়ে ৭ ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে রবিকে হারিয়ে জয়ী হয়েছে গ্রামীণফোন।

৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গের ওই ব্লকের প্রতি মেগাহার্টজের ভিত্তিমূল্য ঠিক হয়েছিল ২৭ মিলিয়ন ডলার। নিলামে ৭৩ শতাংশ বেশি দাম দিয়ে গ্রামীণফোন তা কিনেছে ৪৬ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার দরে।

দেশের শীর্ষ দুই অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি ওই ব্লকের জন্য নিলামের ডাক চালিয়ে যায় দীর্ঘ সময়। ৮০তম রাউন্ডে গিয়ে রবি সরে দাঁড়ায়। এরপর ৮১তম রাউন্ডে ৪৭ মিলিয়ন ডলার দর উঠলে দুই অপারেটরই না বলে দেয়। তখন নিয়ম অনুযায়ী আগের দরে গ্রামীণফোন এ ব্লক জিতে নেয়।

সোমবার বেলা দেড়টার দিকে এই ব্লকের নিলাম প্রক্রিয়ার শুরুতেই ডাক থেকে সরে যায় বাংলালিংক, আড়াই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটকও বিকাল ৪টার দিকে হাল ছেড়ে দেয়।

তবে রবি ও জিপি লেগে থাকায় দর বাড়তেই থাকে। শেষ পর্যন্ত রাত ৮টা ৪০ এ শেষ হাসি হাসে গ্রাহক সংখ্যায় দেশের সবচেয়ে বড় অপারেটর গ্রামীণফোন।

শেষ ব্লকের নিলামে জয়ের মধ্য দিয়ে গ্রামীণফোন মোট তরঙ্গের পরিমাণেও চার অপারেটরের মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রাখল।  

শেষ নিলামে রবি জিতে গেলে তারাই হত সবচেয়ে বেশি তরঙ্গের মালিক। মূলত এ কারণেই শেষের ওই ৫ মেগাহার্টজের ব্লকটি বড় দুই অপারেটরের কছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিটিআরসির হিসাবে, গ্রামীণফোনের হাতে সব মিলিয়ে মোট ৩৭ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ছিল এতদিন। সোমবারের নিলামে দুই ব্যান্ডের ১০ দশমিক ৪৪ মেগাহার্টজ কেনায় গ্রামীণফোনের হাতে মোট ৪৭ দশমিক ৪৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ হচ্ছে।  

এয়ারটেলের সাথে একীভূত হওয়ার পর রবির মোট তরঙ্গের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৩৬ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ। সোমবার আরও ৭ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ কিনে তাদের হাতে মোট তরঙ্গ দাঁড়াল ৪৪ মেগাহার্টজ।

বাংলালিংকের হাতে ছিল ৩০ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ, এখন তা বেড়ে ৪০ মেগাহার্টজ হল। আর রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক সোমবারের নিলাম থেকে খালি হাতে ফেরায় আগের মতই ২৫ দশমিক ২০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ থাকল তাদের।

৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিয়ে জিপি-রবি নিলাম যুদ্ধ

দুটি ব্যান্ডে তরঙ্গ নিলাম শুরু

অব্যবহৃত তরঙ্গ নিলাম ৮ মার্চ  

শেষ ব্লকের নাটকীয়তা

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির হাতে থাকা দুটি ব্যান্ডের ২৭ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ অব্যবহৃত তরঙ্গ বিক্রি করতে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সোমবার এই নিলামের আয়োজন করা হয়।   

ডাক ও টেলিযোগাযাগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদারসহ অপারেটরদের নির্বাহী কর্মকর্তারা নিলামে উপস্থিত ছিলেন।

নিলামে চারটি টেবিলের মধ্যে ১ নম্বর টেবিলে রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটক, ২ নম্বর টেবিলে বাংলালিংক, ৩ নম্বরে গ্রামীণফোন এবং ৪ নম্বর টেবিলে অপারেটর রবির প্রতিনিধিদের বসার ব্যবস্থা হয়।

নিলাম পরিচালনা করেন বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদুল আলম।

বেলা ১১টায় নিলামের শুরুতে ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ৭ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ মোট পাঁচটি ব্লকে নিলাম শুরু হয়।

এর মধ্যে দুটি ব্লক দশমিক ৪৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গের এবং দুটি ব্লক ২ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের। প্রতিটি ব্লকের ভিত্তিমূল্য ছিল ৩১ মিলিয়ন ডলার।

এ নিলামে ২ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের দুটি ব্লক নিয়ে মোট ৪ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ কিনে নেয় বাংলালিংক।

রবি ২ দশমিক ২ মেগাহার্টজের একটি এবং দশমিক ৪৪ মেগাহার্টজ এর একটি নিয়ে মোট ২ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নেয়।

আর গ্রামীণফোন নেয় একটি ব্লকে দশমিক ৪৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ।

নিলামে ভিত্তিমূল্যর উপর কোনো দাম না ওঠায় সেই দামেই অপারেটররা ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ পেয়ে যায়। মোটামুটি এক ঘণ্টার মধ্যে প্রথম ধাপের নিলাম শেষ হয়।

তাতে ৭ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বিক্রি করে সরকারের আয় হয় ২২৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার।

এরপর ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ২০ মেগাহার্টজ ব্যবহারযোগ্য তরঙ্গ ৫ মেগাহার্টজ করে মোট চারটি ব্লকে বিক্রির জন্য নিলাম শুরু হয় বেলা সাড়ে ১২টার দিকে। প্রতিটি ব্লকের ভিত্তিমূল্য ছিল ২৭ মিলিয়ন ডলার।

বেলা দেড়টার দিকে প্রথম ব্লকে টেলিটক বাদে বাকি তিন অপারেটর ২৭ মিলিয়ন ডলার থেকে ডাক শুরু করে।

টেলিটক সরে যাওয়ার পর ২৯ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দরে থাকে তিন কোম্পানি। এরপর কেউ আর ডাক না বাড়ালে নিয়ম অনুসারে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক ৫ মেগাগার্টজ করে তরঙ্গ পায়। ১৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ সেখানে বিক্রি হয়ে যায়।

৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গের শেষ ব্লকটির নিলাম শুরু হলে শুরু হয় নাটকীয়তা। ২৭ মিলিয়ন ডলার থেকে ডাক শুরু হলে প্রথমেই বাংলালিংক নিলাম থেকে সরে আসে। এরপর প্রতি ডাকে দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার করে দর বাড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে ৩০ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে থামার পর পৌনে ৩টায় দুপুরের খাবারের বিরতি দেওয়া হয়।

পৌনে ৪টার দিকে আবার নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হলে ৩০ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে দাম হাঁকা শুরু হয়। ৩০ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলারে দাম উঠলে ১৬তম রাউন্ডে সরে দাঁড়ায় টেলিটক।

এরপর নিলামে থাকে শুধু গ্রামীণফোন ও রবি। দুই অপারেটর ডাক টেনে নেয় ৮০ রাউন্ড পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত রবি হাল ছেড়ে দিলে রাত ৮টা ৪০ এ চূড়ান্ত ফয়সালা হয়।

সরকারের আয় ৩ হাজার কোটি টাকা

নিলাম শেষে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিলামে সর্বমোট ২৭ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিষ্পত্তিতে সরকারের আয় হবে ভ্যাটসহ প্রায় ৩ হাজার ৯৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

মোট তরঙ্গ ১৫ বছরের জন্য ৭ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকায় নিলাম করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

১৫ বছরের জন্য এ নিলাম হলেও ৫ বছর ৭ মাসের জন্য এ তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আগামী ২০২৬ সালে টু জি লাইসেন্সের মেয়াদ পর্যন্ত এ তরঙ্গ বরাদ্দ বাবদ অপারেটরদের এ টাকা দিতে হবে। পরবর্তীতে টু জি লাইসেন্স নবায়নের পর তারা একই হারে টাকা দিয়ে তরঙ্গ বরাদ্দ পাবে।

“নিলামে প্রাপ্ত তরঙ্গ বরাদ্দের তারিখ থেকে ৫ বছর ৭ মাস মেয়াদকালের জন্য প্রযোজ্য চার্জের সাথে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট যোগ করে প্রাপ্ত সর্বমোট চার্জের ২৫% অগ্রিম আগামী ২২ মার্চের মধ্যে পরিশোধ সাপেক্ষে সাময়িক তরঙ্গ বরাদ্দ পত্র জারি করা হবে।”

তরঙ্গ বরাদ্দপত্র জারির তারিখ থেকে প্রতি এক বছর অন্তর বাৎসরিক ১৫ শতাংশ হারে বাকি ৭৫ শতাংশ চার্জ পাঁচটি কিস্তিতে অপারেটরদের পাঁচ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে বলে জানান মোস্তাফা জব্বার।

নিলামে অপারেটররা তরঙ্গ নিলেও অপারেটরদের ‘চ্যালেঞ্জ’ এখনও থেকে যাচ্ছে বলে মনে করেন মোস্তফা জব্বার।

“দুই বড় অপারেটরের যে তরঙ্গ রয়েছে তা যথেষ্ট নয়, তবে অন্যান্য ব্যান্ডে তারা তরঙ্গ চাইলে দিতে পারব।”

২১০০ ব্যান্ডে সর্বশেষ নিলামে ৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ না পাওয়ায় রবির সেবায় সমস্যা হবে কি না- সেই প্রশ্ন সাংবাদিকরা করেছিল এই অপারেটরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাহতাব উদ্দিন আহমেদকে।

জবাবে তিনি বলেন, “অপারেটদের জন্য তরঙ্গ যে পরিমাণ রয়েছে, তা এ খাতের জন্য সাফিসিয়েন্ট নয়, তবে এজন্য তেমন প্রভাব পড়বে না।”

তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়ে গ্রামীণফোনের ভারপ্রাপ্ত সিইও এবং সিএফও ইয়েন্স বেকার এক বার্তায়  বলেন,“বাংলাদেশের জাতীয় ডিজিটালকরণ উদ্যোগে আরও সহায়তা প্রদান করতে এবং দেশব্যাপী মানুষকে ফোরজি সুবিধার মাধ্যমে ক্ষমতায়নের জন্য এই তরঙ্গ গ্রামীণফোনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অতিরিক্ত তরঙ্গের মাধ্যমে আমরা মানুষের বাড়ন্ত ইন্টারনেট চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হব এবং শহরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ডিজিটাল সেবার ধারণা পৌঁছে দিতে পারব।”