পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

ই-কমার্স: তখন কান দেয়নি কেউ

  • ফয়সাল আতিক, নিজস্ব প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-09-28 23:52:27 BdST

ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক প্রতারণার বিষয়টি নিয়ে বারবার কথা উঠলেও শুরুতে সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষই সাড়া দেয়নি।

গ্রাহকের হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাওয়ার পর এখন সবাই নড়েচড়ে বসেছে, নীতিমালা হয়েছে, ই-কমার্স রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রতারিত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের সমাধান মিলছে না।

সরকারি দায়িত্বশীলরা এই পরিস্থিতির জন্য গ্রাহকের ‘অতিলোভ’কে দায়ী করলেও ব্যবসায়ীদের সমিতি ই-ক্যাব বলছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘সমন্বয়হীনতার’ কারণেই পরিস্থিতি এতটা নাজুক হয়েছে।

গত বছর করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর পর ফুলেফেঁপে উঠলেও বাংলাদেশে অনলাইনে কেনাকাটার শুরু দশককাল আগে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ (এনএসপিবি) চালু করলে ব্যাংকের মাধ্যমে অন-লাইনে মূল্য পরিশোধের পদ্ধতিটি চালু হয়।

শুরুর পর থেকে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সক্রিয় থাকলেও গত কয়েক বছরে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গজিয়ে ওঠে।

অনলাইন কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসার আগেই এখানে জালিয়াতির অনেক পথ তৈরি হওয়ার আভাস দিয়ে ২০১৯ সালের জুন মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

‘অনলাইনে কেনাকাটা: কোন পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, “এই মুহূর্তে তেমন তো রেগুলেটারি অথরিটি আমাদের নেই। তবে আমারা এ ব্যাপারে কথাবার্তা বলছি। খুব তাড়াতাড়ি আমরা কিছু একটা করব। আমাদের চিন্তা-ভাবনায় আছে।”

এরই মধ্যে ‘ইভ্যালি মডেল’ আলোচনায় এলে তিন মাসের মাথায় আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

তখনও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও ই-ক্যাবের সভাপতি শমী কায়সার বিষয়টি দেখছেন বলেছিলেন।

ই-ক্যাবের সভাপতি শমী কায়সার বলেছিলেন, লেনদেনের এই বিষয়গুলো নিয়ে অচিরেই তারা কার্যকরী কমিটির সদস্যদের নিয়ে আলোচনায় বসবেন। লেনদেনের ঝুঁকি এড়িয়ে কীভাবে অনলাইন বেচাকেনাকে নিরাপদ করা যায়, তা ঠিক করবেন।

তাদের দেখতে দেখতে তিন বছর চলে যাওয়ার পর এখন হাজার হাজার গ্রাহকের পথে বসার উপক্রম, অভিযোগের পাহাড় জমেছে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরে।

প্রতারণার অভিযোগে মামলার পর ইভ্যালির এমডি মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

প্রতারণার অভিযোগে মামলার পর ইভ্যালির এমডি মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদ রাসেল ইভ্যালি নামের একটি অনলাইন ঠিকানা চালু করেন। অর্ধেক দামে পণ্য দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সাড়া ফেলে দেন তিনি।

রাসেল তখন বলেছিলেন, নীতিমালা না থাকার সুযোগে তিনি ই-কমার্সের বাজার ধরার জন্য আপাতত দৃষ্টিতে ‘অস্বাভাবিক’ কিছু বেচাকেনা করছেন।

কর্তৃপক্ষের নজরদারি অভাবে সেই ‘অস্বাভাবিক’ বেচাকেনা আরও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, যার ফলে প্রতারণার মামলায় আজ রাসেল ৫৪৩ কোটি টাকা দেনা নিয়ে কারাগারে।

ইভ্যালির ব্যবসার ধরণ অনুসরণ করে ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, কিউকম, দালাল, সিরাজগঞ্জশপ, আলাদিনেরপ্রদীপ, বুম বুম, আদিয়ান মার্ট, নিড ডটকম ডটবিডি ও আলেশা মার্টের মতো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠে।

এসবে মানুষের হুমড়ি খেয়ে পড়ার পর গত ৪ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করে ই-কমার্স নির্দেশিকা জারি করে, ততক্ষণে গ্রাহকের টাকা নিয়ে একে একে অন্তরালে চলে যেতে থাকেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা। ই-অরেঞ্জ সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা পালিয়ে ভারতে গিয়ে ধরাও পড়েছেন।

সম্প্রতি উচ্চ আদালতও প্রশ্ন তোলে যে ই-কমার্স কিংবা মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়া ঠেকাতে সরকার ঠিকমতো কাজ করে কি না?

একটি মামলার শুনানিতে বিচারক বলেন, “সরকার তো ব্যবস্থা নিচ্ছে, কখন? যখন আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম, তখন। আমার প্রতিকারটা কোথায়?

“আমার টাকাটা নিয়ে গেল। আর আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরব? এই তো তারা থানায় যাবে, জেলে যাবে, রাত্রে ঘুমাবে। কিন্তু আমার টাকাটা যে নিয়ে গেল সেটার কী হবে?”

বিতর্কিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কোনোটির বিরুদ্ধে শত কোটি আবার কোনোটির বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এলেও সরকারিভাবে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

ই-ক্যাব বলছে, গত মার্চ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত আলোচিত ই-কমার্সগুলোতে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এরপরের কয়েক মাসে লেনদেন হয়েছে ৪৯০ কোটি টাকা। আর ‘পঞ্জি (কম বিনিয়োগে বেশি মুনাফার প্রতিশ্রুতি)’ মডেলের মাধ্যমে যে ব্যবসাগুলো হচ্ছিল, সেগুলো থেমে গেছে।

ই-কমার্স কোম্পানি ই-অরেঞ্জ থেকে পণ্য বা অগ্রিম দেওয়া টাকা ফেরত না পাওয়া গ্রাহকরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভে

ই-কমার্স কোম্পানি ই-অরেঞ্জ থেকে পণ্য বা অগ্রিম দেওয়া টাকা ফেরত না পাওয়া গ্রাহকরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভে

সমন্বয়হীনতা?

ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালে ই-কমার্স নীতিমালা হয়। সেখানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেওয়া ছিল। সেন্ট্রাল কো অর্ডিনেশন সেল গঠন, টেকনিক্যাল কমিটি, রিস্ক ম্যানেজম্যান কমিটি করার কথা বলা ছিল। কিন্তু সেগুলো এখনও হয়নি।

তিনি বলেন, “২০১৮ সালেই আমরা আশঙ্কা করতে পেরেছিলাম যে বাংলাদেশে এ ধরনের একটা সমস্যা আসতে পারে। ওখানে একটা এসক্রো সার্ভিস চালুর ব্যাপারে তখনই আমরা কথা বলেছি। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লম্বা আলোচনার পর সেখান থেকে একটা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকে।”

ইভ্যালি বিতর্ক শুরুর পর ২০২০ সালে ই-ক্যাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষক ও দুইজন আইনজীবীর সমন্বয়ে একটা টেকনিক্যাল টিম তৈরি করেছিল বলে জানান তিনি।

“তারা ইভ্যালি বিজনেস মডেল পর্যালোচনা করে লুপহোলগুলো চিহ্নিত করেন। তারা একটা গাইডলাইন তৈরির পরামর্শ দেন। অনেকগুলো সমস্যা আমরা চিহ্নিত করে সেটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি ডিভিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে শেয়ার করেছি। ভোক্তা অধিকার, কম্পিটিশন কমিশনের সঙ্গে এই ব্যাবসার ঝুঁকির দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। এসব কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে। তত দিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে।”

তবে জল অনেকদূর গড়িয়ে যাওয়ার পর ই-ক্যাব অগাস্ট মাসের শেষ দিকে এসে ই-অরেঞ্জসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত করে। তার আগে দৃশ্যমাণ কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

অনিয়ম ঠেকাতে ই-ক্যাবের ভূমিকা কী ছিল- জানতে চাইলে তমাল বলেন, “ই-ক্যাব সরাসরি কারও ব্যবসা পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে না। গ্রাহকরা প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে এলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে তা জানতে চায় ই-ক্যাব। পাশাপাশি এসব অভিযোগ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়, মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাকে এসব বিষয় অভিহিত করা হয়।

“এই কাজগুলো আমরা করে এসেছি। আমরা বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকটি ই-কমার্সকে চিঠি দিয়েছি। মূলত আমরা শুরু থেকেই এসক্রো সার্ভিস চালুসহ অন্যান্য নীতিগত সংস্কারের জন্য কাজ করেছি।”

সম্প্রতি সিপিডির এক আলোচনায় তমাল বলেন, “আমরা একটা সমন্বয়ের অভাব বোধ করেছি এতদিন। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকারের মধ্যে একটা সমন্বয়ের বড় অভাব আমরা লক্ষ্য করেছি।”

ই-কমার্সে কেনাকাটার জন্য এসক্রো সার্ভিস চালুর কথা অনেক আগেই বলা হয়েছিল  বলে জানান তমাল। যার অর্থ ক্রেতা ও বিক্রেতার লেনদেন সম্পন্ন না হওয়া অবধি অর্থ তদারককারী তৃতীয় কোনো কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা থাকবে।

“দুই বছর আগে এসক্রো সার্ভিসটা চালু করা গেলে এই পরিস্থিতি হত না,” তমালের এই কথায় সায় দেন ই-ক্যাবের সাবেক সহ সভাপতি রেজওয়ানুল হক জামি।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি স্পষ্ট করে বলতে পারি, ইক্যাব থেকে যখন এসক্রো সার্ভিস চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বিষয়টি যদি তখনই কার্যকর করা হত, তাহলে আজকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের কথা শুনতে হত না।”

গত জুলাই থেকে এসক্রো সার্ভিস চালুর পর ই-কমার্সে গ্রাহকের প্রতারিত হওয়ার পথ বন্ধ হয়।

ই-ক্যাবের এক হিসাবে বলা হয়, গত মার্চ থেকে জুলাইয়ে এসক্রো চালুর আগ পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা লেনদেন হলেও জুলাইয়ের পর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৪০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

তাৎক্ষণিক খাওয়ার উপযোগী খাদ্যদ্রব্য (চালডাল, আজকের ডিল, ফুডপান্ডা, পাঠাওফুড, হাংরিনাকি ইত্যাদি) কোম্পানিগুলোর নিজস্ব পণ্য বিক্রি অবশ্য এই হিসাবের বাইরে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে মেঝেতে-সিঁড়িতে বসে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ লিখছিলেন অনেকে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে মেঝেতে-সিঁড়িতে বসে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ লিখছিলেন অনেকে।

প্রতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা?

সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় ই-কমার্সে অর্থ লোপাটের ঘটনাটিকে প্রতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেন সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। একই কথা বলেন আইনজীবী তানজিব উল আলমও।

রেহমান সোবহান বলেন, “দিস ইজ এ স্ক্যাম। এটা রেগুলেটরি ফেইলিউরও বটে। এটা দীর্ঘদিন ধরে চলতে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে (প্রতারক) গুড বুকে রাখা হয়েছে। এধরনের দুর্নীতি রাতারাতি হয়নি।”

একই অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার তানজিব সরকারি সংস্থাগুলোর কয়েকটি ধারাবাহিক ব্যর্থতা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, সরকারি সংস্থাগুলো যারা আইন বাস্তবায়ন করার কথা তারা পদে পদে অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

তার ভাষায়, প্রতিযোগিতা আইনে কোন কোন পরিস্থিতিতে পদক্ষেপ নেওয়া যাবে, সেটা বলা আছে। সেই আইন অনুযায়ী বার বারই তাদের তৎপর হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তারা বসে ছিল, পদক্ষেপ নেয়নি।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ১৭ হাজার অভিযোগ পড়ার তথ্য জানিয়ে তানজিব বলেন, বর্তমান জনবল কাঠামোতে অভিযোগের ভারে তাদের ‘ভেসে যাওয়ার’ অবস্থা। সামগ্রিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেটা নিতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় উদহারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এর অধীন বিএফআইইউকে তুলে ধরেন এই আইনজীবী।

“আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলো ধরা তাদের একক দায়িত্ব ছিল, তারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। গত বছর অগাস্টে একটি জাতীয় দৈনিকে ইভ্যালি নিয়ে খবর প্রকাশ হওয়ার পর ইভ্যালি অ্যাকাউন্ট এক মাসের জন্য স্থগিত করে আবার চালু করে দিয়েছে বিএফআইইউ। এটা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করলো যে আইনগতভাবে ইভ্যালি ঠিক আছে। সুতরাং তারা আরও নিশ্চিন্তে পণ্যের অর্ডার দেওয়া শুরু করল।”

ইভ্যালির অর্থ যে বিভিন্ন ভাবে সরকারি সংস্থার কাছেও গেছে, সেটাও দেখিয়ে দেন ব্যারিস্টার তানজিব।

“আমরা ভাসুরের নাম মুখে নিতে ভয় পাচ্ছি। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে সে (ইভ্যালির রাসেল) অনুদান দিয়েছে। তারা এই প্রশ্নটুকু করে নাই যে, সে কার টাকা কার কাছে বিলি করছে?”

ইভ্যালির কাছে থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের স্পন্সরশিপ গ্রহণ, র‌্যাবের সিনেমায় ইভ্যালির বিনিয়োগ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠানে ইভ্যালির পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলেন তিনি।

“যেমন ধরুন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। আমাদের সব থেকে হিরো ১১ জন ক্রিকেটার। প্রত্যেকের বুকে ইভ্যালি সাইনবোর্ড দিয়ে আমরা জার্সি পরিয়ে দিয়েছি। আমরা কি ইনডাইরেক্টলি ভ্যালিডেশন দেই নাই? র‌্যাব তাদের সিনেমার জন্য অনুদান নেয় নাই? গত বছর ই-ক্যাব রাসেলের ইভ্যালিকে মুভার্স অ্যাওয়ার্ড দেয় নাই? আমরা সবাই মিলে তো তাকে প্রমোট করেছি।”

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। ফাইল ছবি

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। ফাইল ছবি

কী বলছেন বাণিজ্যমন্ত্রী

২০১৯ সাল থেকে ই-কমার্সকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ চলছে বলে জানাতে থাকা বাণিজ্যমন্ত্রী দুই বছর পর ব্যর্থতার কিছুটা দায় চাপিয়েছেন মহামারী পরিস্থিতির ওপর।

বার বার সতর্ক করা হলেও কেন পদক্ষেপ নেওয়া হল না- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলছেন, “গত একটা বছর দেশের অবস্থা স্বাভাবিক ছিল না। পুরোপুরি কাজ করা যায়নি। মহামারীর কারণে সব ব্যবসা বন্ধ ছিল, ছোট আকারের ই-কমার্স খাত অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।

“আমরাও কাজ করতে গেছি, কোথাও কোথাও ত্রুটি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এসক্রো সার্ভিসের কথা আমরা পরামর্শ দিয়েছি, তারা করেছে। সমস্যাগুলো আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি।”

বাণিজ্যমন্ত্রী একথা বলার পর মঙ্গলবারই অনলাইন মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য দেখভালের জন্য একটি ই-কমার্স রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার।

এর অংশ হিসেবে ১৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমান।

কমিটি প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে ই-কমার্স উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে মতামত দেবে।

হাফিজুর বলেন, “এছাড়া আগামী দুই মাসের মধ্যে এ কমিটিকে ই কমার্স নিয়ে একটা আইনের খসড়া তৈরি করতে হবে। এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি ই কমার্স কর্তৃপক্ষ গঠনের কাঠামো তৈরি করতে হবে।”

আরও পড়ুন

অনলাইনে কেনাকাটা: কোন পথে বাংলাদেশ  

ই-কমার্সের ভাউচার, প্রি-পেমেন্ট নিয়ে উদ্বেগ  

ই-কমার্সে অগ্রিম টাকা নেওয়া ‘বন্ধ’: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়  

‘টাকাটা যে নিয়ে গেল সেটার কী হবে?’  

ইভ্যালি: চমক জাগানো উত্থান, পতন গ্রাহক ডুবিয়ে  

‘দেউলিয়া ঘোষণার’ পরিকল্পনাও ছিল ইভ্যালির রাসেলের: র‌্যাব  

ইভ্যালি অবসায়ন করে দেনা পরিশোধের প্রস্তাব

ই কমার্স কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু