পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

ঢাবি কলাভবনের সেই কৃষ্ণচূড়ার জন্য শোক

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-09-15 19:41:18 BdST

ডালপালা ছড়ানো পুরনো সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটি ভর দুপুরে আর ছায়া দেবে না, গ্রীষ্মের দিনগুলোতে ঝরে পড়া ফুলের লাল গালিচা বিছাবে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পথে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচনায় কৃষ্ণচূড়া গাছটি কেটে ফেলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে শিক্ষার্থীদের শোক আর ক্ষোভ। 

মহামারীর কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখনও বন্ধ। শিক্ষার্থীরা অনেকেই ফুলে ফুলে লাল হয়ে থাকা গাছটির পুরনো ছবি ফেইসবুকে শেয়ার করে নিজেদের কষ্টের কথা লিখছেন। অনেকে আবার কাটা গাছটির ছবি দিয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী বলছেন, গাছটির গোড়া ক্ষয়ে হেলে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরি কালচার সেন্টারের পরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি পর্যবেক্ষণ করে গাছটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে সিদ্ধান্ত দেওয়ায় সেটি কেটে ফেলা হয়েছে।

বুধবার কলাভবনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, গাছটির ডালপালা ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে। এখন চলছে শিকড়গুলো কাটার কাজ।

এতে কলা ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ এবং ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশের অংশ অনেকটাই ফাঁকা হয়েছে গেছে। কৃষ্ণচূড়া গাছটির সঙ্গে কলা ভবনের সামনে দুটি ইউক্যালিপটাস গাছও কাটা পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা জানালেন, গত কয়েক দিন ধরেই গাছগুলো কাটার কাজ চলছে; দুয়েক দিনের মধ্যে সেই গাছটি সেখান থেকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হবে।

তবে এর বাইরে আর কোনো গাছ আপাতত কাটা হবে না এবং খালি জায়গায় নতুন গাছ লাগানো হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এদিকে কৃষ্ণচূড়া গাছটি কেটে ফেলার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে কলাভবনের সেই গাছটি অভিমুখে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।

শিক্ষার্থীদের পক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের ( একাংশ) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রাগীব নাঈম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,“আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আগামীকাল বেলা ১১টায় গাছ কাটার প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করব। গাছটিকে আর কাটতে দেওয়া হবে না। যতটুকু কাটা হয়েছে, এ পর্যন্তই থাকবে।”

তিনি দাবি করেন,“গাছটি আসলে  ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না। দুয়েকটির ডালপালা হয়ত হেলে পড়েছিল। এখনো যে কেউ গাছের পাশে গিয়ে দেখতে পাবে, গাছের শেকড়গুলো ক্ষয়ে যায়নি এবং পুরো গাছটি হেলেও পড়েনি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী রাকিব হোসেন বলেন, “এটা তো নিছক একটি গাছ নয়, এর সাথে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। হুমায়ুন আজাদ স্যারের একটি কবিতায় এই গাছটির কথা পড়েছি আমরা। দশটি গাছ লাগালেও এর ক্ষতিপূরণ হবে না।”

মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজান মীম বলেন, “বন্ধ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ফাঁকি দিয়ে গাছটি কেটে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে এটি মোটেও কাম্য নয়।

“ক্যাম্পাস খুললে গাছটির শূন্যতা অনুভব করবে শিক্ষার্থীরা। গাছটির কারণে কলাভবনের ওই জায়গায় যে সৌন্দর্য ছিল, সেটা সবাই মিস করবে।”

পালি অ্যান্ড বুডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের  ছাত্রী প্রিয়ন্তী কর্মকার ফেইসবুকে লিখেছেন,“সুন্দরের প্রতি আক্রোশ মনে হয় সবসময়ই একটু বেশি। ফুলভর্তি এই কৃষ্ণচূড়া গাছের জন্য গ্রীষ্মে পুরা ক্যাম্পাসটা বেগুনি লাল হয়ে যেত। বৃষ্টির পর পুরো রাস্তাটা লাল ফুলের রাস্তা হয়ে যেত। দেখতে কী যে সুন্দর লাগত! কার কী ক্ষতি করছিল এই গাছ কে জানে। সব সুন্দর জিনিসগুলো কতগুলো মানুষ নামের প্রাণী উঠেপড়ে লাগে নষ্ট করার জন্য।”

আফরিদা তাসনিম নামে আরেক শিক্ষার্থী লিখেছেন, কোনো কোনো গাছ কেবলই গাছ না। এর সাথে যে

সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু আছে, সেটা পরিমাপের উর্ধ্বে থাকে। অনেক রকম কঠিন বিষাদের দিনে কলাভবনের পাঁচতলার করিডোরে কেবল এই গাছটার পুষ্পপল্লব দেখবার জন্য ঠায় দাঁড়িয়েছিলাম বহুদিন, বহুক্ষণ।

“কেবল বিষাদের দিনে নয়, বাধভাঙ্গা আনন্দের দিনেও। এখনও দাঁড়াই। কৃষ্ণচূড়া আমার সবচেয়ে পছন্দের ফুল। এই বিশেষ কৃষ্ণচূড়া গাছটি আমার সবচেয়ে পছন্দের গাছগুলোর একটি। বুকের মধ্যে কৃষ্ণচূড়ার পাতার দীর্ঘশ্বাস ।“

ক্যাম্পাসের  যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টিতে প্রাধান্য দেওয়া উচিত মন্তব্য করে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, “ক্যাম্পাসের বৃক্ষগুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য খুব সংবেদনশীল। এগুলো আমাদের ক্যাম্পাসের সোন্দর্যের পরিচায়ক। সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতিকাতরতা।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরি কালচার সেন্টারের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সব গাছপালার তত্ত্বাবধান করা হয়।

সেই সেন্টারের পরিচালক ও  জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মিহির লাল সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গাছটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং এমনভাবে হেলে গিয়েছিল, যে কোনো সময় পড়ে যেত। বড় কোনো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, তাই নিরাপত্তার স্বার্থে গাছটি কাটা হয়েছে। সেখানে নতুন গাছ লাগানো হবে। বড় হতে সময় লাগবে, তবে আমাদের কোনো ঝুঁকি নিতে হচ্ছে না।“