পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

জীবন দেবে অনেক, নেবেও: মাশরাফি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-11-29 20:56:04 BdST

ক্রিকেটার থেকে সংসদ সদস্য হয়ে রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে নতুন পরিচয়ে আগেই চিনিয়েছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা; এবার নতুন এক ভূমিকায় দেখা দিলেন তিনি।

সোমবার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সমাবর্তন বক্তা হয়ে কর্মজীবনের পথে পা রাখা শিক্ষার্থীদের সামনে নিজের জীবনবোধ নিয়ে অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খোলেন কৃতি এই খেলোয়াড়।

চোটে জর্জরিত হয়ে যিনি ক্যারিয়ারজুড়ে নিজের উঠানামা দেখে এসেছেন, সেই মাশরাফি তরুণদের শোনালেন পাঁয়ে পাঁয়ে হেঁটে আসা সময়ের পটে জীবন কীভাবে ধরা দেয়।

বেসরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক এই অধিনায়ক।

মাশরাফির অনুধাবন, জীবন অনেক কিছু যেমন দেয়, তেমনি নিয়েও নেয়। তাই সফল হতে সুযোগগুলো কাজে লাগানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

“মানুষ সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মানুষের জীবনে এমন কিছু হয় না যে চাইলেই সে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু মানুষ মেহনত করতে পারে, চেষ্টা করতে পারে।”

“আমি শিওর, আপনারা এই পর্যন্ত যেভাবে এসেছেন; আপনাদের সেই চেষ্টাটা অব্যাহত থাকবে এবং আপনার সফল হবেন,” সমাবর্তন গ্রহণকারীদের প্রতি বার্তা দেন তিনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মাশরাফি বলেন, “উনি দেশের জন্য পুরো জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। মানুষের এই যে চেষ্টা, শ্রম- এটা থাকলে অবশ্যই মানুষ সফল হবে।

কঠিন সময়ে ‘পজিটিভ’ চিন্তা করাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে মনে করেন তিনি। আর ‘বড়’ হওয়ার পেছনে না ছুটে জীবনকে উপভোগের মন্ত্র তরুণদের দেন তিনি।

“আমি এটা হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনিও শিওর না যে আপনি হতে পারবেন কি না? আপনাকে সেটা করেই যে সাকসেস হতে হবে এমন না। সাকসেসের মানদণ্ডটা আমি এভাবেই হিসাব করি যে আপনি জীবনকে উপভোগ করতে পারছেন কি না।”

ছোট্ট জেলা নড়াইল থেকে নিজের উঠে আসার গল্প শুনিয়ে মাশরাফি বলেন, “সেখানে ক্রিকেট খেলার সেই ফেসিলিটিজ ছিল না। আমি উপভোগ করেছি, অল্প বয়সে বুঝেছি- আমি ক্রিকেট পছন্দ করি এবং আমি এটা খেলতে চাই। এই কারণে এটা পসিবল হয়েছে।”

মাশরাফি বিন মুর্তজা। ফাইল ছবি

মাশরাফি বিন মুর্তজা। ফাইল ছবি

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা ছিল, আমি বাংলাদেশের জন্য খেলছি। আমি বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করছি, এর চেয়ে বড় কিছু আমার কাছে ছিল না। আমি জানি সে দিনগুলো কেমন গেছে। স্পোর্টসে যেটা হয়, সার্জারির পরে যে ছয়টা মাস- সেটা পার করে আসা খুব কঠিন।

“আমার চাওয়া এবং পাওয়া, আমার ডেডিকেশন, আমি যেটায় ফোকাস করেছিলাম, সেটা হচ্ছে অনলি স্পোর্টস। সেটার কারণে ২০১৫ সালে এসে আমি ক্যাপ্টেন হই, এর আগেও দুইবার ক্যাপ্টেন হয়েছিলাম।”

চোটাক্রান্ত হয়ে ক্যারিয়ারে অনেক সুযোগ হারালেও তা নিয়ে দুঃখ নেই মাশরাফির।

“আমার ২০ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে যদি বিভিন্ন অংশে ভাগ করি তখন আমি দেখি যে, আমি হয়ত আরও অনেক বেশি কিছু করতে পারতাম। সুস্থ থাকলে আরও ভালো কিছু করতে পারতাম। কিন্তু এটা নিয়ে আমার কোন দুঃখ নাই, কারণ আমি জানি যে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।

“আমার দুঃখ থাকত, যদি আমি চেষ্টা না করতাম। হয়তবা কোনো কোনো সময় আমি যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতাম তাহলে হয়ত বা এটা নাও হতে পারত। সেটার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।”

জীবনে কঠিন সময় এলে তাতে ভেঙে না পড়ার পরামর্শ দেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’।

“আমি মনে করি, স্রষ্টা সবাইকে জীবনে একটা সুযোগ দেয়। এই সুযোগগুলো নেওয়াটা খুবই জরুরি। আপনি যদি ডেডিকেটেড থাকেন, তাহলে সে সুযোগটা নিতে পারবেন। উপভোগ করুন এবং যেটা আছে সেটা নিয়ে খুশি থাকুন। এবং আপনি যেটা করতে চান তার জন্য যা যা করণীয় তাই করুন। তারপরও যদি সেটা না হয়, তাহলে অন্য কিছু করতে পারেন। তবে সঠিক পথে করাটা গুরুত্বপূর্ণ।”

সাফল্য ধরা দেওয়ার পর যেন স্থবিরতা না আসে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে বলেন তিনি।

“আপনার সাকসেসের মাপকাঠি কখনো করতে যাবেন না। আরেকটা জিনিস হচ্ছে যে, কখনো যদি টপকে যান; যেখানে যেতে চেয়েছিলেন তার থেকে উপরে চলে যান, আপনি সেখানে গিয়েও যেন রিল্যাক্সড না হন।”

মাশরাফি বিন মুর্তজা। ফাইল ছবি

মাশরাফি বিন মুর্তজা। ফাইল ছবি

এই জনপ্রতিনিধি গরিব এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে।

সমাবর্তনে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি গবেষণার উপর জোর দিয়ে বলেন, “মনে রাখতে হবে, অনুকরণ নয়, উদ্ভাবনই আমাদের শক্তি। উদ্ভাবনের জন্য শিশু অবস্থা থেকেই আমাদের জোর দিতে হবে গবেষণার উপরে।

“গবেষণা হঠাৎ করে শুরু করলেই হয় না, এর একটা সংস্কৃতি তৈরি করতে হয় চর্চার মধ্য দিয়ে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণার উপর বিশেষ ভাবে জোর দেবে, এটি আমি প্রত্যাশা করি।”

গবেষণায় জোর দেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহও।

তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো গবেষণা। এ জন্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার সুযোগ করে দিতে হবে, পেশাগত উৎকর্ষ বিধানেরও ব্যবস্থা করতে হবে।”

সমাবর্তনে ভ্যালেডিক্টরিয়ান হিসেবে বক্তব্য দেন ইংলিশ অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের স্নাতক শামায়েল মর্তূজা।

সমাবর্তনে চারজন শিক্ষার্থীকে স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। এবার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ৭৫৪ জন শিক্ষার্থী ডিগ্রি পান।

অনুষ্ঠানে ইউল্যাব বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, ইউল্যাবের উপাচার্য অধ্যাপক ইমরান রহমান, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সামসাদ মর্তুজা, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মিলন কুমার ভট্টাচার্য, রেজিস্ট্রার ফয়জুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।