পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

কোভিড-১৯: আক্রান্ত বেশি যুবকরা, মৃত্যু বেশি বয়স্কদের

  • ওবায়দুর মাসুম ও কাজী নাফিয়া রহমান, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-04-15 23:54:35 BdST

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৭ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় চার লাখই যুবক, যাদের বয়স ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।

আর এ পর্যন্ত যে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কোভিড-১৯ রোগে মারা গেছেন, তাদের ৮ হাজারের বেশির বয়স পঞ্চাশের বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুবকরা বাইরে বের হচ্ছে বেশি, তাই সংক্রমিতও বেশি হচ্ছে। আর নানা শারীরিক জটিলতার কারণে বয়স্কদের মৃত্যুর হার বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে গত বছরের মার্চে প্রাদুর্ভাবের পর বুধবার পর্যন্ত ৭ লাখ ৭ হাজার ৩৬২ জনের দেহে নতুন করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন ১০ হাজার ৮১ জন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের সবচেয়ে বেশি ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ২১ থেকে ৪০ বছর। সংখ্যার হিসাবে তা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩৪ জন।  

এদের মধ্যে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশের (১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৫) বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ২৭ দশমিক ১ শতাংশ বা ১ লাখ ৯০ হাজার ৫৫৯ জন।

শনাক্ত রোগীদের ২ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১০ বছরের কম। ১১ থেকে ২০ বছর বয়সের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সের ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সের ১১ দশমিক ২ শতাংশ এবং ষাটোর্ধ্ব  ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে যে ১০ হাজার ৮১ জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ্ব  মানুষই ৮০ দশমিক ৮৯ শতাংশ অর্থাৎ, ৮ হাজার ১৫৫ জন। মোট মৃত্যুর ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ অর্থাৎ ৫ হাজার ৬৭৫ জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,

বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, সারাবিশ্বেই বয়স্কদের মৃত্যুর হার বেশি।

তিনি বলেন, “যাদের কোমর্বিডিটি থাকে, তারা করোনাভাইরাসে বেশি সাফার করে এবং তাদের মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি।

“বাংলাদেশে বয়স্কদের অনেকেই জানেই না তার ডায়াবেটিস আছে, হাইপারটেনশন আছে। এ কারণে আক্রান্ত হওয়ার পর বাসায়ই জটিলতা তৈরি হয়ে যায়। হাসপাতালে নিয়ে আসার পর আসলে কিছু করার থাকে না।”

হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের এই পরিচালক ডা. লেলিন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশের বয়স যেমন ৬০ এর বেশি, ঠিক তেমনি অধিকাংশের কিন্তু একাধিক রোগ রয়েছে।

বয়সীদের মৃত্যুর বিষয়টি তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে- “৬০ বছরের বেশি বয়সীদের কথা না বলে আমরা যদি বলতাম, যেসব মানুষের শরীরে প্রতিরোধী ব্যবস্থা কমে গেছে এবং অন্যান্য রোগ যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার, ব্রঙ্কিওল অ্যাজমা রয়েছে এবং একইসাথে শরীরের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে, সেই মানুষগুলোই বেশি মারা যাচ্ছে।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা ডা. বে-নজির আহমেদ মনে করেন, কম বয়সে শরীর চর্চার মতো অভ্যাসগুলো না থাকায় বয়স্করা বেশি মারা যাচ্ছেন করোনাভাইরাসে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেক দেশ আছে যেখানে ৬০ বা তার বেশি বয়সে জটিল রোগ হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায়, ৩০ বছরের পরেই বহু মানুষই উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে ভুগছে। অনেকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম বয়সে।

“আমরা শরীর চর্চা করি না। শরীরচর্চা করলে শক্তিমত্তা বেড়ে যায়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ভালো থাকে। সেটা আমাদের দেশে খুব কম হয়। আমাদের দেশে বয়স্ক মানুষেরা হয়ত হাঁটাহাঁটি করে বা ডায়াবেটিস যাদের রয়েছে, তারা হাঁটাহাঁটি করে, কিন্তু আমাদের কালচারে নিয়মিত ব্যায়াম করার বিষয়টি নেই।”

(ঢাকার মুগদা হাসপাতালে সম্প্রতি করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার লাইনে দাঁড়ানো অধিকাংশই ছিলেন কম বয়সী। ফাইল ছবি)

(ঢাকার মুগদা হাসপাতালে সম্প্রতি করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার লাইনে দাঁড়ানো অধিকাংশই ছিলেন কম বয়সী। ফাইল ছবি)

তবে দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণরা যে বেশি সংক্রমিত হচ্ছে, সেটাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এই পরিচালক।

“তরুণদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেশি। তার মানে তারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে তাদের মৃত্যুহার কম।”

ডা. মুশতাক বলেন, যুবকরা নানা কাজে বাসার বাইরে বের হয়। তারা সচল জনগোষ্ঠী, তাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

যুবকদের মাধ্যমে বাড়ির বয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

“বাসার বয়স্করা যারা একদিনও বাইরে বের হয় না, তারাও আক্রান্ত হচ্ছে যুবকদের মাধ্যমে। যুবকরা জানেও না তাদের দ্বারা বয়স্করা আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে যুবসমাজের চলাফেরায় সাবধানতা অবলম্বন করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় আরও জোর দিতে হবে।”

মৃতদের ৭৪ ভাগই পুরুষ

দেশে করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত মারা যাওয়াদের অধিকাংশই পুরুষ।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট মৃত ১০ হাজার ৮১ জনের মধ্যে ৭ হাজার ৪৯৯ জনই পুরুষ এবং ২ হাজার ৫৮২ জন নারী। অর্থাৎ মৃতদের শতকরা ৭৪ ভাগ পুরুষ এবং ২৬ ভাগ নারী।

পুরুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “পুরুষ বাসার বাইরে বেশি বের হন, এটাই পুরুষ মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ নয়, এর পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। সেটা হচ্ছে হরমোন।

“যে হরমোন নারীদের আছে, কিন্তু পুরুষের নাই। এই হরমোনগুলো ভাইরাসটাকে সংক্রমণে বাধা দেয়। এই হরমোন থাকার ফলে এক ধরনের ইমিউনিটি তৈরি হয় এবং ভাইরাসকে প্রতিরোধ করে। সেকারণেই বিশ্বজুড়েই পুরুষের তুলনায় নারীর সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই তাৎপর্যপূর্ণভাবে কম।”

আক্রান্ত-মৃত্যু বেশি ঢাকায়

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে ঢাকা।

আইইডিসিআর গত ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ৫১ হাজার ১০৩টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখিয়েছে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে শনাক্তের হার ৩৬ শতাংশ। উত্তর সিটি করপোরেশনে শনাক্তের হার ২৯ শতাংশ। যেখানে সারাদেশের শনাক্তের হার এখনও ১৫ শতাংশের নিচে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত ১ লাখ ৫০ হাজার ৬২৯ জন আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা জেলায়, যা অন্য যে কোনো জেলার চেয়ে বেশি।

আক্রান্তের সংখ্যায় এরপরই আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ২৮ হাজার ১১২ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে।

এছাড়া সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি এমন জেলাগুলোর মধ্যে বগুড়ায় ৯ হাজার ২৪০ জন, সিলেটে ৮ হাজার ৮৩৭ জন, কুমিল্লায় ৮ হাজার ৮০৩ জন, নারায়ণগঞ্জে ৮ হাজার ২৯০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সব এখানে। সব মিলিয়েই ঢাকায় ঝুঁকি বেশি। এ কারণই ঢাকায় আক্রান্ত মানুষ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুয়ায়ী, মোট মৃতের ৫ হাজার ৮৫৪ জন ঢাকা বিভাগের এবং ১ হাজার ৮০৮ জন চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা। অর্থাৎ মোট মৃতের ৫৮ দশমিক ০৭ শতাংশ ঢাকা বিভাগের এবং ১৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

এছাড়াও মৃত্যুহার খুলনা বিভাগে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ ও রাজশাহী বিভাগের ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। রংপুর, সিলেট, বরিশাল এবং ময়মনসিংহ বিভাগে মৃত্যুহার ৪ শতাংশের নিচে ছিল।

ঢাকায় মৃতের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “যেখানে সংক্রমণ বেশি হবে, সেখানে আনুপাতিক হারে মৃত্যু বেশি হবে। সে অনুযায়ীই মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়।

তবে ঢাকার আশেপাশের জেলার লোকজন চিকিৎসার জন্য ঢাকায় চলে আসেন বলে তাদের ঢাকার ধরে গণনা হওয়াও ঢাকায় মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ বলে মনে করেন তিনি।

ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, ঢাকা জনবহুল এবং এখানে বসবাসকারীরা স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন না করায় ঢাকায় মৃতের সংখ্যা বেশি।

“ঢাকা ও চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে মৃত্যুহার বেশি। এছাড়াও এগুলো জনবহুল হওয়ায় অনেক রোগী শনাক্ত করার আগেই তার কাছ থেকে অন্যরাও সংক্রমিত হচ্ছে।”