পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

ওমিক্রনের দাপট ভারতে ফিরিয়ে আনছে ডেল্টার স্মৃতি

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2022-01-06 23:59:43 BdST

bdnews24
নয়া দিল্লির একটি শ্মশানে কোভিডে মৃতদের শবদেহ পোড়ানো হচ্ছে। গত বছর ২৪ এপ্রিল তোলা ছবি। নিউ ইয়র্ক টাইমস

ডিসেম্বরের শেষ দিকে ভারতে যখন করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ধরনটি ছড়াতে শুরু করল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতিকে আরও বেশি সতর্ক থাকার, কোভিড বিধি মেনে চলার আহ্বান জানালেন।

রাজধানী দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দ্রুত নৈশ কারফিউ জারি করলেন। সিনেমা হল বন্ধ করে দিয়ে রেস্তোরাঁ ও গণপরিবহনে ধারণক্ষমতার অর্ধেক খালি রাখার নির্দেশ জারি হল।

এরপর দুই নেতাই নেমে পড়লেন রাজনৈতিক প্রচারের ময়দানে। প্রায়ই মুখে মাস্ক না পরে হাজারো সমর্থকের উপস্থিতিতে হাজির হয়ে তারা বক্তৃতা দিতে লাগলেন।

রাজনীতিবিদদের এই দ্বিচারিতায় ক্ষুব্ধ নয়া দিল্লির ট্যাক্সি চালক অজয় তিওয়ারি বললেন, “যখন আমাদের পেট চালানোই দায়, তখন তারা বিধিনিষেধ আর লকডাউন দেয়। অথচ রাজনৈতিক সমাবেশে অনেক বেশি ভিড় হয়, সেখানে তো লকডাউন দেয় না। এটা খুব কষ্ট দেয়।”

ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ওমিক্রনের সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। মহামারীতে ক্লান্ত হয়ে ওঠা ভারতবাসীর মনে ফিরে আসছে গতবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা; তাতে মিশছে একেক ক্ষেত্রে একেক নিয়ম দেখার হতাশা।    

করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরনের সংক্রমণের ভয়াবহ ঢেউ ভারতের জনজীবনকে তছনছ করে দিয়েছিল একবছরও হয়নি। তখনও রাজনৈতিক নেতারা ঝুঁকির বিষয়টি শুরুতে আমলে নেননি, জনগণকে যেসব পরামর্শ তারা দিয়েছিলেন, নিজেরাই তা মানেননি। ওই সময়ের হাসপাতাল আর শ্মশানে উপচে পড়া ভিড়ের স্মৃতি এখনও টাটকা।

মুম্বাই মহানগরে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, মহামারী শুরুর পর যা সর্বোচ্চ। এর আগে একদিনে সবচেয়ে বেশি ১১ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল গত বসন্তে মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়। নয়া দিল্লিতে এক রাতের ব্যবধানে নতুন রোগীর সংখ্যা শতভাগ বেড়েছে।

১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারতে করোনাভাইরাসের নতুন একটি ধরন ছড়াতে শুরু করলে কতটা বিপদ হতে পারে, সেই শঙ্কা সবসময়ই বিশেষজ্ঞদের ত্রস্ত করে রাখছে। ডেল্টার কারণে বিশ্বের খুব কম এলাকাতেই ভারতের মত এত প্রাণহানি হয়েছে। সরকারি হিসাবে এ মহামারীতে ভারতে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ লাখের মত বলা হলেও, বিশেষজ্ঞদের ধারণা প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।

ওমিক্রনের সংক্রমণ ক্ষমতা এতই বেশি যে সংক্রমিতের সংখ্যা বিপদজনক গতিতে বেড়ে চলেছে এবং দেখা যাচ্ছে এটা ভারতের কোভিড প্রতিরক্ষা ব্যুহের প্রধান কৌশল টিকাদান কর্মসূচিকেও টেক্কা দিচ্ছে।

প্রাথমিক সমীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কোভিশিল্ড (অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা) টিকা ভারতের টিকাদান কর্মসূচির ৯০ শতাংশ চাহিদা মেটালেও ওমিক্রনের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে না। তবে অসুস্থতার মাত্রা কমাতে এ টিকা সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

চেন্নাইয়ের ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেসের পদার্থ ও কম্পিউটেশনাল জীববিদ্যার অধ্যাপক সীতাভ্র সিনহা বলেন, ভাইরাসের সংখ্যাবৃদ্ধির হার নিয়ে তিনি যে গবেষণা করেছেন, তার ফল বলছে, দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মত বড় শহরগুলোতে সংক্রমণের হার ‘অতিমাত্রায় উচ্চ’, যেখানে জনগণের মধ্যে একটি পরিমিত মাত্রার প্রতিরক্ষা গড়ে উঠেছিল। দুই শহরেই বসন্তে একটি বড় সংখ্যক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়েছে, অথচ শহরগুলোর প্রাপ্তবয়স্কদের বেশিরভাগই টিকা পেয়েছেন।

তবে ভারতের কর্মকর্তারা এ পরিস্থিতি নিয়ে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের শিক্ষা থেকে শঙ্কিত না হয়ে বরং আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মত দেশের চিত্র দেখে, যেখানে করোনাভাইরাসের এ ধরনটি দ্রুত ছড়িয়ে ছিল, কিন্তু খুব বেশি ক্ষতি করতে পারেনি।

নয়া দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের মহামারীবিদ্যার অধ্যাপক ড. আনন্দ কৃষ্ণান বলেন, ‘একটি হালকা অসুখ’ হিসেবে নুতন ধরনটিকে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা ভারতীয়দেরকে আত্মতুষ্টির দিকে নিয়ে গেছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওমিক্রন নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সময় এখনও আসেনি, কারণ এই ধরনটি বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সংক্রমিত করছে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সীতাভ্র সিনহা বলেন, “এমনকি যদি মোট জনসংখ্যার একটি নগন্য সংখ্যক মানুষকেও যদি হাসপাতালে নিতে হয়, সেটা অনেক বড় হবে।”

ভারতের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহর- মুম্বাই, নয়া দিল্লি ও কলকাতার তথ্য বলছে, কোভিডের জন্য নির্ধারিত শয্যার একটি ছোট অংশ এখন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দিল্লিতে মোট শনাক্তের ৩ শতাংশ এবং মুম্বাইয়ে ১২ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ড. জে এ জয়ালাল জানান, নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়ায় তার কাছে উদ্বেগের বিষয় হাসপাতালের শয্যা বা অক্সিজেনের সরবরাহ নয়, বরং স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট। সংক্রমণ বেড়ে গেলে স্বাস্থ্যখাতে হঠাৎ করেই স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

জয়ালাল জানান, মহামারী শুরুর পর এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৮০০ জন চিকিৎসক কোভিডে মারা গেছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা মহামারী সামাল দিতে দিতে অবসাদের শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি হাজার হাজার চিকিৎসক ধর্মঘট করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন কাজের অতিরিক্ত চাপ ও নতুন চিকিৎসক নিয়োগে দেরির জন্য। স্থানীয় গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা গেছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কয়েক হাজার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর কোভিড শনাক্ত হয়েছে।

ডেল্টার ঢেউয়ের মতই, ওমিক্রনও ভারতে এমন একটি সময়ে ছড়াতে শুরু করেছে, যখন সেখানে উচ্চমাত্রায় জনসমাগমের কর্মসূচি চলছে - ছুটির ভ্রমণের ভিড় এবং বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনী সমাবেশ।

মোদী ও তার অনুসারীরা উত্তর প্রদেশে বিশাল সমাবেশ করেছেন। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালও বিশাল জনসমাবেশে বক্তৃতা করেছেন। দিল্লিতে তিনি বিধিনিষেধ জারি রাখলেও নিজে অন্য রাজ্যে গিয়ে সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন।