মুশফিকের ব্যাটে দলের বিশ্বাস 

  • বার্মিংহাম থেকে আরিফুল ইসলাম রনি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-06-27 17:43:30 BdST

বিশ্বকাপে চলছে সাকিব আল হাসান শো। অনন্য অলরাউন্ড কীর্তিতে স্মরণীয় করে চলেছেন বিশ্ব আসর। তবে আরেকজন কিন্তু নিজের কাজ ঠিকই করে চলেছেন। তার ব্যাটের চমক হয়তো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে না, তবে দোলা দিচ্ছে হৃদয়ে। মুশফিকুর রহিম বিশ্বকাপেও পারফর্ম করে চলেছেন বরাবরের বিশ্বস্ততায়।

৬ ইনিংসে ৩২৭ রান, ১ সেঞ্চুরির পাশে ফিফটি ২টি। গড় ৬৫.৪০, স্ট্রাইক রেট ৯২.৩৭। যে কোনো মানদণ্ডেই এই পারফরম্যান্স দারুণ। সাকিবের মতো রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় মেতে ওঠেননি বটে। তবে দলে অবদানের পালায় যথারীতি সফল।
 
প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়ে তার ৮০ বলে ৭৮ রানের ইনিংস দলকে এগিয়ে নিয়েছে বড় স্কোরের পথে। সবশেষ ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয়ে তার ৮৭ বলে ৮৩ রানের ইনিংসটি ছিল মহামূল্যবান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ জিততে পারেনি, তবে মুশফিকের সেঞ্চুরি দলকে তুলে নিয়েছে নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের চূড়ায়।
 
এই তিন ম্যাচ দিয়েই মুশফিকের ব্যাটসম্যানশিপের গভীরতা বোঝা যায় অনেকটা। একেক দিন ম্যাচের পরিস্থিতি, উইকেটের চরিত্র, প্রতিপক্ষ ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা ছিল একেক রকম। কিন্তু মুশফিকের ব্যাটে জবাব ছিল সবকিছুর।
 
প্রথম ম্যাচে উইকেটে গিয়েছিলেন দল অল্প সময়ের ব্যবধানে জোড়া উইকেট হারানোর পর। সেখান থেকে সাকিবের সঙ্গে রেকর্ড জুটি গড়েছেন। রান তুলেছেন সাকিবের চেয়ে বেশি গতিতে। 
 
নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে কাটা পড়েছেন রান আউটে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ খেলতে খেলতেই আউট হয়েছেন ৫০ বলে ৪৪ করে। ভালো কাটেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচও। 
 

সবশেষ দুই ম্যাচে দেখা গেছে মুশফিকের সেরা চেহারা। অস্ট্রেলিয়ার মতো বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৩৩৩ পর্যন্ত যেতে পেরেছে মুশফিক শেষ পর্যন্ত দলকে আগলে রেখে ৯৭ বলে অপরাজিত ১০২ করেছেন বলে। 
 
সেরা ইনিংসটি খেলেছেন সম্ভবত আফগানিস্তানের বিপক্ষে। উইকেট ছিল ব্যাটসম্যানদের জন্য বেশ কঠিন। আফগানদের বোলিং আক্রমণে ছিল দারুণ সব স্পিনার। মুশফিক উইকেটের চ্যালেঞ্জ সামলে নিয়েছেন, প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন।

 

৮৭ বলে ৮৩ রানের ইনিংস হয়তো বিধ্বংসী নয়। তবে যেভাবে আফগান স্পিনারদের খেলেছেন, সিঙ্গেলস-ডাবলস নিয়ে এলোমেলো করে দিয়েছেন তাদের পরিকল্পনা, ব্যতিব্যস্ত রেখেছেন প্রতিপক্ষ অধিনায়ক ও ফিল্ডারদের, আফগানরা একরকম ধ্বংসই হয়েছে।
 
এমনিতে শট খেলতে পছন্দ করলেও এ দিনের ইনিংসে চার ছিল কেবল চারটি, ছক্কা একটি। স্ট্রাইক রেট এরপরও ৯৫.৪০। তার স্কিল, তার মানসিক শক্তি আর পরিস্থিতির দাবি মেটানোর আদর্শ উদাহরণ ছিল ইনিংসটি। 
 
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় মুশফিকের কাছ থেকে এমন পারফরম্যান্স প্রত্যাশিতই, বলছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বাংলাদেশ অধিনায়ক বললেন, মুশফিকের প্রয়োজনীয়তা দল বোঝে বলেই তাকে মূল্যায়ন করে সেই উচ্চতায়।
 
“এই বিশ্বকাপ বলে নয়, গত কয়েক বছর ধরেই তো মুশফিক দারুণ ধারাবাহিক। দলের প্রয়োজনের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে রান করে। সবচেয়ে বড় কথা, পরিস্থিতির বুঝে দলের যা প্রয়োজন, সব করতে পারে। প্রয়োজনে শট খেলে, প্রয়োজনে সিঙ্গেল নেয় বা উইকেট ধরে রাখে।”
 
“খেয়াল করে দেখবেন, উইকেট-পরিস্থিতি যেমনই থাকুক, মুশফিকের স্ট্রাইক রেট ভালো থাকে। উইকেট যতোই পড়ুক, মুশফিকের ব্যাটিংয়ে চাপের ছাপ থাকে না। খুব কঠিন পরিস্থিতিতেও স্ট্রাইক রেটের মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড ধরে রাখে। এটাই ওর ব্যাটসম্যানশিপের প্রমাণ যে সবকিছুর জন্যই সে প্রস্তুত। এ কারণেই গত কয়েক বছরে দলকে জেতানো অনেক ইনিংস এসেছে মুশফিকের ব্যাটে।”
 
রান সংখ্যার সঙ্গে যদি দলে প্রভাবকে বিবেচনায় নেওয়া হয়, মুশফিকের অনেক ইনিংসই অমূল্য। হয়তো কোনো ম্যাচে রান তার চেয়ে বেশি করেছে কেউ, কিন্তু মুশফিক নেমেই বদলে দিয়েছেন ম্যাচের মোড়। রানের গতি তিনি সব পরিস্থিতিতেই ধরে রাখতে পারেন বলে অন্যদের কাজও সহজ হয়ে যায় অনেকটা।
 

তার টেম্পারমেন্টের একটি বড় প্রমাণ, বড় মঞ্চের সাফল্য। গত বিশ্বকাপে তিনটি ম্যাচ জিতেছিল বাংলাদেশ। সেই তিন ম্যাচে মুশফিকের পারফরম্যান্স ছিল ৫৬ বলে ৭১, ৪২ বলে ৬০ ও ৭৭ বলে ৮৯। 
 
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তার ৬টি ফিফটিতেই জিতেছে দল। কেবল তার প্রথম সেঞ্চুরিটি পূর্ণতা পায়নি দলের জয়ে। 
  মাশরাফি অবশ্য শুধু বিশ্বকাপকে আলাদা করে দেখতে চান না মুশফিকের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণে।
 
“বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকভাবে ভালো করা অবশ্যই বিশেষ কিছু। কিন্তু বিশ্বকাপ বলেন বা যে কোনো টুর্নামেন্ট, মুশফিক সবসময়ই তো এভাবেই খেলে আসছে। চার নম্বর পজিশন খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কিন্তু মুশফিক আছে বলেই আমরা নিশ্চিন্ত থাকি। জানি, দলের যা প্রয়োজন, মাঠে গিয়ে সেটি মেটাবেন মুশফিক।”
 
বাংলাদেশর স্পিন কোচ সুনীল যোশিও মুগ্ধ মুশফিকের পারফরম্যান্সে। খেলোয়াড়ী জীবনে নিজে ছিলেন স্পিনার, তাই জানেন এমন ব্যাটসম্যানকে আটকে রাখা কতটা কঠিন। বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমের ভাবনাই উঠে এলো যেন সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটারের কণ্ঠে।
 
“মুশফিক আমাদের মিডল অর্ডারের মেরুদণ্ড। যে কোনো পরিস্থিতিতে আমরা ওর ওপর নির্ভর করতে পারি। ব্যাটিং দিয়েই সে দলের বিশ্বাস, আস্থা অর্জন করে নিয়েছে। ড্রেসিং রুমে সবাই জানে, মুশফিক থাকলে দলকে ভালো একটা জায়গায় নিয়ে যাবেই।”
 
বিশ্বকাপেও সামনে বাংলাদেশের লড়াইটা ভালো জায়গায় যাওয়ার। মুশফিক নিজের পথে থাকলে বাংলাদেশ দলও থাকবে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানার পথে।


ট্যাগ:  বাংলাদেশ  মুশফিক  ফিচার-বিশ্লেষণ  ক্রিকেট বিশ্বকাপ