ভারত সফর বুঝিয়ে দিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের বাস্তবতা

  • কলকাতা থেকে অনীক মিশকাত, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-11-25 22:06:23 BdST

বলা হয়, শেষ ভালো যার সব ভালো তার। কিন্তু বাংলাদেশের ভারত সফরে ভালো খুঁজতে যেতে হচ্ছে সেই শুরুতে! সময় যত গড়িয়েছে, ততই খারাপ হয়েছে পারফরম্যান্স। বিশেষ করে টেস্ট সিরিজ এতটাই বাজে কেটেছে যে সফরের শুরুতে টি-টোয়েন্টির সাফল্য মনে হচ্ছে যেন সেই কবেকার ঘটনা! বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন কোথায় দাঁড়িয়ে, সেই চিত্রই যেন ফুটিয়ে তুলেছে এবারের ভারত সফর।  

ভারতে এবারই প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ সফরে যায় বাংলাদেশ দল। তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হারের পর দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে হতে হয়েছে হোয়াইটওয়াশড। দুই টেস্টেই তিন দিনের মধ্যে হারতে হয়েছে ইনিংস ব্যবধানে।  

সিরিজ শুরুর আগের অস্থিরতা

কলকাতা টেস্ট শেষে বিরাট কোহলি শোনাচ্ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের এগিয়ে চলার পেছনের গল্প। আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কিভাবে বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের আগ্রহ ফেরানো হয়েছে। জানিয়েছেন, ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো কত শক্তিশালী ও সেখানে বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটকে দেওয়া হচ্ছে কতটা গুরুত্ব।  

সেখানে ভারত সফরের আগে যৌক্তিক সব দাবি নিয়ে ধর্মঘটের মতো কঠোর অবস্থানে যেতে হয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। কয়েক দিনের টানাপোড়েনের পর মিলেছে সমাধান। কিছু দাবির বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে।

ধর্মঘটের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতে বাংলাদেশের ক্রিকেট খায় আরও অনেক বড় ধাক্কা। বাজিকরদের যোগাযোগের তথ্য না জানানোয় নিষিদ্ধ হয়ে যান সাকিব আল হাসান। আচমকাই টেস্ট দলের নেতৃত্ব পান মুমিনুল হক, টি-টোয়েন্টিতে মাহমুদউল্লাহ।

শুরুর আগের এই সব ঘটনা বেশ প্রভাব ফেলেছে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে। ভারত সফরে দিতে হয়েছে এসবের মাশুল।

সাকিব-তামিম-সাইফের ছিটকে যাওয়া

নিজেদের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় সাকিব না থাকলে কঠিন হয়ে যায় বাংলাদেশের একাদশ সাজানো। ভারত সফরেও এটা বেশ ভুগিয়েছে রাসেল ডমিঙ্গোর দলকে। পারিবারিক কারণে সফরে ছিলেন না বাংলাদেশের সফলতম ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল। টেস্ট সিরিজ শেষে মুমিনুলের স্বীকারোক্তি, গোটা সফরে এই দুই জনকে দারুণভাবে মিস করেছেন তারা।

ভারতে যে ধরনের উইকেট মিলেছে, তাতে পেস বোলিং অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনের অভাবও প্রচণ্ডভাবে অনুভব করেছে বাংলাদেশ। প্রথম টেস্টের এক পর্যায়ে প্রধান কোচ বলেছিলেন, একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডার খুব প্রয়োজন ছিল। চোটের জন্য সফর শুরুর আগেই ছিটকে গিয়েছিলেন সাইফ।   

সাইফ থাকলে হয়তো ইন্দোর টেস্টে তিন পেসার নিয়ে খেলতে পারত বাংলাদেশ, কলকাতায় চার পেসার। টি-টোয়েন্টিতে হাপিত্যেশ করতে হতো না পঞ্চম বোলারের জন্য। সাইফের জায়গায় কাজে লাগতে পারেন, উপযুক্ত এমন আর একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডারও নেই দেশে।

অসাধারণ জয়, নাঈম-আমিনুলের চমক

সাকিবকে হারানোর ধাক্কার রেশ নিয়েই ভারত পা রাখে সফরের প্রথম ভেন্যু দিল্লিতে। শুরু হয় দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতিও।

ম্যাচের দিন সকালে দিল্লিতে বায়ু দূষণের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। বিকালে অবস্থার উন্নতি হয় নাটকীয়ভাবে। তার চেয়েও বেশি নাটকীয়তা দেখিয়ে ম্যাচে দারুণ এক জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।

অসাধারণ এক ইনিংস খেলে জয়ের নায়ক ছিলেন মুশিফক। পরের দুই ম্যাচে অবশ্য ব্যর্থ ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। জিততে পারেনি দলও।

ওই সিরিজে নিজেদের পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসেন মোহাম্মদ নাঈম শেখ ও আমিনুল ইসলাম। দুই তরুণ দেখান নিজেদের সামর্থ্য। নিজের অভিষেক সিরিজে ২৬, ৩৬ ও ৮১ রানের তিনটি ইনিংস খেলেন নাঈম। তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে তিনিই দলকে রেখেছিলেন জয়ের পথে। কিন্তু ৮ উইকেট হাতে রেখেও ৪৩ বলে ৬৫ রানের সমীকরণ মেলাতে পারেনি দল।

তরুণ লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলাম প্রথম ম্যাচে ২২ রানে নিয়েছিলেন ২ উইকেট। পরেরটিতে ২৯ রানে ২টি। তৃতীয় ম্যাচটি ভালো কাটেনি। তবে তার ওপর বিনিয়োগ করা যায়, এই বার্তা দিতে পেরেছেন।

ইন্দোর টেস্ট, ভুল পরিকল্পনার মাশুল

দারুণ সব স্পিনারে ঠাসা আফগানিস্তানের বিপক্ষে দেশের মাটিতে স্পিন সহায়ক উইকেট বানিয়ে বড় ঝুঁকি নিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটির খেসারতও দিতে হয়েছিল ম্যাচ হেরে। ভারত এই ঝুঁকির পথে হাঁটেনি, উপমহাদেশের দলের বিপক্ষে স্পিন সহায়ক উইকেট করেনি। উইকেটে রাখে সবুজ ঘাসের ছোঁয়া।

ইন্দোর টেস্টের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতির কেন্দ্রে ছিল স্পিন সামলানো। কিভাবে রবীন্দ্র জাদেজা, রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও কুলদীপ যাদবের স্পিন সামলানোর নানা দিক নিয়ে কাজ করেন ব্যাটিং পরামর্শক নিল ম্যাকেঞ্জি।

ম্যাচ শুরু হতে না হতে পরিষ্কার হয়ে যায় পরিকল্পনায় কতটা ভুল ছিল। উইকেটে ছিল পেসারদের জন্য দারুণ সুবিধা। সেটা কাজে লাগিয়ে সফরকারীদের গুঁড়িয়ে দেন মোহাম্মদ শামি, ইশান্ত শর্মা ও উমেশ যাদব।

তাদের সামলানোর পথ জানা ছিল না বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। ম্যাচ হারে ইনিংস ও ১৩০ রানে। ম্যাচ শেষ হয় তৃতীয় দিনেই।  

একাদশ নির্বাচনও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। পরিস্থিতির দাবি ছিল তিন পেসার, বাংলাদেশের একাদশে ছিল দুজন। মায়াঙ্ক আগারওয়ালের ডাবল সেঞ্চুরিতে রানের পাহাড় গড়ে ভারত জিতে ইনিংস ও ১৩০ রানে।

গোলাপি বলে ধূসর বাংলাদেশ

দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলতে অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাবে কেন রাজি হননি, এই প্রশ্নে বিরাট কোহলি বলেছিলেন, “বিমানে ওঠার দুই দিন আগে দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলতে বললে তো আমি খেলব না।” অথচ এবার বাংলাদেশ দল বিমানে ওঠার আগের দিন বিসিবি জানায়, ভারতে একটি দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ!

ভারতও আগে দিবা-রাত্রির কোনো ম্যাচ খেলেনি, এই যুক্তি তুলে ধরে মেকি সমতার বাস্তবতার কথা বলছিল বাংলাদেশ। অথচ ভারত দলের পাঁচ ক্রিকেটার ছাড়া বাকি সবার ছিল গোলাপি বলে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা। তাতে যা হওয়ার, হয়েছেও তাই। কলকাতায় লড়াই-ই করতে পারেনি মুমিনুলের দল।

কোহলির মতে, দিবা-রাত্রির টেস্টের আগে প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় থাকা উচিত, প্রস্তুতি ম্যাচ অবশ্যই থাকতে হবে। বাংলাদেশ পায়নি কোনোটিই।

দূষণের জন্য দিল্লি থেকে প্রথম টি-টোয়েন্টি সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিল বিসিবি। তাতে সাড়া দেয়নি বিসিসিআই। পরে গোলাপি বলে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধও উড়িয়ে দেয় তারা। টেবিলের খেলায় ব্যর্থ ছিল বিসিবি, মাঠের খেলায় ব্যর্থ ছিল দল।

প্রাপ্তি পেসারদের বোলিং

আফগানিস্তান টেস্টে তখনকার অধিনায়ক সাকিব পেসারদের কয়েকবার বলেছিলেন, টেস্ট খেলার উপযুক্ত পেসার নেই দলে। ভারতে দারুণ বোলিং করে পেসাররা জানান দিলেন, যথেষ্ট সহায়তা পেলে তারাও পারেন। ইন্দোরে চার উইকেট নেন আবু জায়েদ চৌধুরি। কলকাতায়ও আল আমিন হোসেন, ইবাদত হোসেন ও আবু জায়েদ নজর কেড়েছেন যথেষ্ট। বিশেষ করে, দ্বিতীয় নতুন বলে ছিলেন তারা দুর্দান্ত। কৃত্রিম আলোয় তারা নাড়িয়ে দিয়েছিলেন ভারতীয়দের।

তবে ব্যাটিং ছিল ভীষণ হতাশার। শামি-ইশান্ত-উমেশদের বোলিংয়ের সামনে ফুটে ওঠে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের টেকনিকের দৈন্য। সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেওয়ার মতো প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা দেখাতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা।  

চার ইনিংসের একটিও দুই অঙ্কে নিতে পারেননি ইমরুল। সাদমান, মিঠুন ছিলেন সাদামাটা। ৪ ইনিংস মিলিয়ে স্রেফ ৪৪ রান করেন মুমিনুল। শেষ ইনিংস ছাড়া বাকিগুলোতে ধুঁকেছেন মাহমুদউল্লাহ। লিটন ভালো শুরু করলেও খেলতে পারেননি বড় ইনিংস।

খানিকটা ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল মুশফিক। সিরিজে বাংলাদেশের দুটি ফিফটিই এসেছে তার ব্যাট থেকে। ‘লেটার মার্কস’ না হলেও অন্তত পাশ নম্বর তাকে দেওয়া যায়। বাকি সবাই চূড়ান্ত ব্যর্থ।

তবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল মুশফিকের ব্যাটিং পজিশন। এই সিরিজে কিপিং না করলেও চারে ব্যাটিং করেননি দলের সেরা ব্যাটসম্যান। প্রথম টেস্টে চারে খেলেন মিঠুন। পরের টেস্টে লিটনের জায়গায় প্রায় ৯০ ওভার কিপিং করলেও তিনিই খেলেন চারে। অথচ চ্যালেঞ্জিং কন্ডিশনে, স্কিলফুল বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে দায়িত্ব নিয়ে মুশফিক চারে খেলে পখ দেখাতে পারতেন বাকিদের। ড্রেসিং রুমে জোগাতে পারতেন সাহস।

অধিনায়ক মুমিনুল প্রথম সিরিজের পরীক্ষায় নেতৃত্বের ছাপ রাখতে পারেননি একটুও। এত বড় দায়িত্বের জন্য এখনও প্রস্তুত নয় বলেই মনে হয়েছে তাকে। তার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও প্রথম সিরিজে তার কাছ থেকে কিছু আশা করাও কঠিন। তবে অধিনায়কের ব্যর্থতা আরও বেশি চোখে পড়েছে ব্যাট হাতেও বাজে করায়। কলকাতা টেস্টে মুমিনুল পেয়েছেন ‘পেয়ার।’

বাস্তবতা অনুধাবন করেই হয়তো, ইন্দোর টেস্টের সময় কোচ রাসেল ডমিঙ্গো বলেছিলেন, টেস্ট ক্রিকেটে এগোতে দলের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশে ফিরে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করবেন। তার এই প্রস্তাবে সায় আছে মুমিনুলের।

টেস্ট খেলতে চায় না এমন কাউকে টেস্টে খেলাতে রাজি নন ডমিঙ্গো। কে কোন ফরম্যাটে খেলতে চায়, কোন ফরম্যাটে পারফরম্যান্স ভালো সেগুলো বিবেচনা নিয়ে আলাদা আলাদা পুল বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ডমিঙ্গো। 

গাভাস্কারের চোখে ‘অর্ডিনারি’ বাংলাদেশ

কোড অব কন্ডাক্টের ঘেরাটোপে বন্দি টিভি ভাষ্যকাররা সাধারণত দলগুলো সম্পর্কে খুব নেতিবাচক কিছু বলেন না। অনেক সময়ই সমালোচনা করেন হালকাভাবে। তবে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের দীনতা দেখে কোনো রাখঢাক রাখেননি সুনীল গাভাস্কার। সরাসরিই বলেন ‘অর্ডিনারি টেকনিক ও অর্ডিনারি নিবেদন, অর্ডিনারি দল বাংলাদেশ।’

বাংলাদেশের পারফরম্যান্সও এমন ছিল, গাভাস্কারের কথার সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ সামান্যই!

টেস্ট শেষে গাভাস্কারের সমালোচনা যেন মেনে নেন মুমিনুল। শোনান সেই পুরানো পাঠ, ভুল থেকে শিখবে দল! সমর্থকদের বলেন ধৈর্য ধরতে। কিন্তু শিক্ষার পালা কবে শেষ হবে, আবারও উঠছে প্রশ্ন। তেমনি বিসিবি কবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে টেস্ট ক্রিকেটকে, প্রশ্ন সেটিও।

অনেক বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার সফরটি আসলে প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সামনেই।


ট্যাগ:  বাংলাদেশ  মুমিনুল  বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ