যে ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ভিত

  • স্পোর্টস ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-03-24 17:04:12 BdST

বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি। মহাপরাক্রমশালী দল। দারুণ সব সাফল্য আর ক্রিকেটীয় রূপকথার গল্পে টইটম্বুর যাদের ভাণ্ডার। সমৃদ্ধ ক্রিকেটীয় সংস্কৃতি আর পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত উদাহরণ। সেই অস্ট্রেলিয়ার গায়েই লেগেছিল বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারির দাগ। ক্রিকেট বিশ্ব নাড়িয়ে দেওয়া সেই কাণ্ডের দুই বছর পূর্ণ হলো মঙ্গলবার।

২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপ টাউন টেস্টে বল টেম্পারিং কাণ্ডের পর নিষিদ্ধ হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার তিন ক্রিকেটার স্টিভেন স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার, ক্যামেরন ব্যানক্রফট। ওই ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ভিত।

ঘটনাটা টেস্টের তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশনে। টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে, পকেট থেকে হলুদ এক টুকরো কাপড়ের মতো কিছু (পরে জানা যায় সেটি ছিল শিরীষ কাগজ) বের করে বলে ঘষতে চেয়েছিলেন ব্যানক্রফট। পরে সেটি লুকিয়ে রাখেন ট্রাউজারের ভেতর।

মাঠের দুই আম্পায়ার নাইজেল লং ও রিচার্ড ইলিংওর্থ এরপর ডেকে কথা বলেন ব্যানক্রফটের সঙ্গে। যদিও বল পরিবর্তন করেননি তারা। ৫ রানের পেনাল্টিও গুনতে হয়নি অস্ট্রেলিয়াকে।

আম্পায়ারদের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন ব্যানক্রফট, নিজের পকেট থেকে হলুদের বদলে কালো রঙের এক টুকরো কাপড় বের করে দেখান তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়ার সব ধারাভাষ্যকার বলছিলেন, ব্যানক্রফটের আচরণ সন্দেহজনক।

“এটি যে খুবই সন্দেহজনক, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। ভুল কিছু করতে গিয়ে ধরা পড়লে শাস্তি পেতেই হবে”-বলেছিলেন সাবেক অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডার। তার সঙ্গে তখন সুর মিলিয়েছিলেন গ্রায়েম স্মিথ আর শেন ওয়ার্নও।

তাদের সন্দেহই পরে সত্যি প্রমাণিত হয়। দিনের খেলা শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বল টেম্পারিংয়ের চেষ্টার কথা স্বীকার করেন স্মিথ ও ব্যানক্রফট। স্মিথের দাবি, দলের লিডারশিপ গ্রুপ লাঞ্চ বিরতির সময় টেম্পারিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূলত রিভার্স-সুইং পাওয়ার আশায় এটা করা হয়েছিল বলেও জানান অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক।

তখনই আঁচ করা গিয়েছিল, বড় শাস্তি অপেক্ষা করছে স্মিথদের জন্য। এর কয়েক ঘন্টা পরই তখনকার অস্ট্রেলিয়া প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে বলেন, নেতৃত্ব থেকে স্মিথকে সরিয়ে দিতে।

চতুর্থ দিনের খেলা শুরুর আগেই জানানো হয়, টেস্টের বাকিটায় অধিনায়কত্ব ও সহ-অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন স্মিথ ও ওয়ার্নার। ম্যাচের বাকি দুই দিনের জন্য অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় টিম পেইনকে।

সেদিনই এক টেস্টের জন্য স্মিথকে নিষিদ্ধ করে আইসিসি। জরিমানা করা হয় ব্যানক্রফটকে। পরে এই দুজনের পাশাপাশি ওয়ার্নারকে জোহানেসবার্গে শেষ টেস্টে নিষিদ্ধ করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানায় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।

বল টেম্পারিং এমনিতে খুব গুরুতর অপরাধ ছিল না আইসিসির আচরণবিধিতে। বরং আধুনিক ক্রিকেটে যেভাবে বোলারদের হাত-পা বেঁধে রাখার সব নিয়ম চালু হয়েছে, তাতে একটা মাত্রা পর্যন্ত বল টেম্পারিং বৈধ করে দেওয়ার দাবি অনেক সময়ই তুলেছেন ক্রিকেটের গ্রেটদের অনেকে।

তবে অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপারটি ছাড়িয়ে গিয়েছিল আইসিসির আচরণবিধির সীমানা। দেশটির দৈনন্দিন জীবন-যাপন তথা সংস্কৃতির অংশ মনে করা হয় ক্রীড়াকে। খেলাধুলায় প্রতারণামূলক যে কোনো কিছু তাদের কাছে গণ্য হয় অনেক বড় অপরাধ হিসেবে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ্যে, সব মহলেই তুমুল আলোচিত-সমালোচিত হয় বল টেম্পারিং কাণ্ড।

স্মিথদের অপেক্ষায় ছিল তাই আরও বড় শাস্তি। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্তে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটে স্মিথ ও ওয়ার্নারকে নিষিদ্ধ করা হয় এক বছর। ব্যানক্রফট নিষিদ্ধ হন ৯ মাসের জন্য।

একই সঙ্গে স্মিথকে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কত্ব করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয় আরও এক বছর। তার ডেপুটি ওয়ার্নারকে ভবিষ্যতে কখনোই আর অধিনায়কের কোনো পদে বিবেচনা করা হবে না বলে জানানো হয় বোর্ডের পক্ষ থেকে।

দেশে ফিরে আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দেন স্মিথ। সিডনিতে সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ে ক্ষমা চান কৃতকর্মের জন্য। সেই অশ্রু ছুঁয়ে যায় ডারেন লেম্যানকে। পদত্যাগের ঘোষণা দেন অস্ট্রেলিয়া কোচ। তদন্তে যদিও তার কোনো দোষ পাওয়া যায়নি।

বল টেম্পারিং কাণ্ডে এলোমেলো অস্ট্রেলিয়া স্বাভাবিকভাবেই মনোযোগ দিতে পারেনি মাঠের ক্রিকেটে। কেপ টাউনের পর জোহানেসবার্গ, দুই টেস্টেই সফরকারীরা হেরেছে খুব বাজেভাবে।

ওই ঘটনায় বদলে যায় অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের গতিপথ। সময়ের সেরা দুই ক্রিকেটারকে হারিয়ে দেশটি পার করেছে কঠিন সময়। পেইনকে পরে অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় পাকাপাকিভাবে। কোচের আসনে বসানো হয় সাবেক ব্যাটসম্যান জাস্টিন ল্যাঙ্গারকে।

ঘড়ির কাঁটা ঘুরে কেটে যায় বছর। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে স্মিথ-ওয়ার্নার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরেন ২০১৯ বিশ্বকাপ দিয়ে। বিশ্বকাপ ওয়ার্নারের জন্য কেটেছে দুর্দান্ত। তিন সেঞ্চুরিতে ৬৪৭ রান করে তিনি ছিলেন টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। বিশ্বকাপের পর অ্যাশেজে রানের বন্যা বইয়ে দেন স্মিথ। ৭ ইনিংসে একশর বেশি গড়ে করেন ৭৭৪ রান। তার অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে ২০০১ সালের পর প্রথমবার ইংল্যান্ড থেকে অ্যাশেজ ধরে রেখে ফেরে অস্ট্রেলিয়া।

অ্যাশেজে নিজের ছায়া হয়ে থাকা ওয়ার্নার দেশে ফিরে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেন টানা দুই টেস্টে। যার একটি আবার ট্রিপল। অপরাজিত ৩৩৫ রান করে হয়ে যান দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংসের মালিক।

সফল প্রত্যাবর্তনে স্মিথ-ওয়ার্নার পুনরুদ্ধার করেছেন অস্ট্রেলিয়া দলে তাদের হারানো জায়গা। তবে বল টেম্পারিংয়ের সেই ঘটনা হয়তো সারাজীবনই তাড়িয়ে বেড়াবে তাদের। অস্ট্রেলিয়ার গায়ে সেঁটে যাওয়া কালিমা হয়তো মুছবে না কখনোই।