বই লেখা, অনলাইন পরামর্শ, ভিডিও দেখায় সময় কাটছে ক্রিকেট কোচদের

  • ক্রীড়া প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-04-01 16:37:17 BdST

‘এই জীবন যে কবে শেষ হবে, আর ভালো লাগছে না’, ক্রিকেটবিহীন সময়ে এভাবেই হাঁপিয়ে উঠেছেন মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। বাস্তবতার কাছে তবু অসহায় সবাই। করোনাভাইরাসের প্রকোপের এই অস্থির সময়ে নিজের ভেতরের অস্থিরতা দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন দেশের অন্যতম সফল এই কোচ। এগিয়ে রাখছেন কোচিং নিয়ে নিজের লেখা বই শেষ করার কাজ।

আরেক ক্রিকেট কোচ মিজানুর রহমান বাবুল ভিডিওতে পরামর্শ দিচ্ছেন ক্রিকেটারদের অনেককে। কোচ সোহেল ইসলাম পড়ছেন কোচিং সম্পর্কিত বিভিন্ন জার্নাল ও লেখা। দেশের অভিজ্ঞ ক্রিকেট কোচ সরওয়ার ইমরান এই সময় থাকতে চাইছেন ফুরফুরে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে টিভিতে খুঁজছেন বিনোদনের নানা উপকরণ।

করোনাভাইরাসের ছোবল না থাকলে এখন তারা ব্যস্ত থাকতেন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে সবাই পেয়ে গেছেন লম্বা অবসর। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় দেশের শীর্ষ কোচরা জানালেন, কীভাবে কাটছে তাদের সময়।

কোচ সালাউদ্দিন পুরোপুরি ঘরবন্দি নন। তিনি থাকেন বিকেএসপিতে। প্রতিষ্ঠানের মূল ফটক বন্ধ। লোকজনের-যাওয়া আসা নেই। নির্জন মাঠগুলিতে খানিকটা হাঁটাহাঁটির সুযোগ তাই নিচ্ছেন তিনি। এমনিতে বাড়ির কাজ করার সুযোগ হয় না খুব একটা। এখন টুকটাক করছেন। সময় দিচ্ছেন স্ত্রী ও দুই ছেলেকে। তবে তার পারিবারিক সময় কাটানোতেও থাকছে ক্রিকেট!

সালাউদ্দিনের ১৩ বছর বয়সী ছেলে নুহায়েল সানদিদ এবার সুযোগ পেয়েছেন বিকেএসপিতে। সেভাবে ছেলের ক্রিকেট দেখভালের সুযোগ হয় না তার। দেশের অন্যতম সেরা কোচ এই সুযোগে আপাতত নিজের ছেলের কোচ।

“কোচিংয়ের ব্যস্ততায় নিজের ছেলের খেলা নিয়ে সেভাবে কাজ করতে পারিনি। এখন বাসার পাশের মাঠে ওকে একটু সময় দিচ্ছি। ও ডানহাতি ব্যাটসম্যান আর চায়নাম্যান বোলার। এই সুযোগে কিছু জিনিস দেখিয়ে দিচ্ছি। দেখলাম, ও বেশ দ্রুত শিখতে পারে। দোয়া করবেন যেন ওর ইচ্ছে টিকে থাকে আর ভালো করতে পারে।”

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সের কোচ তিনি। এছাড়াও দেশের শীর্ষ অনেক ক্রিকেটারের তিনি ‘মেন্টর।’ জানালেন, টুকটাক কথা হচ্ছে সবার সঙ্গে। ঘরে বসে কাজ যতটুকু করা যায়, তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজও এই সুযোগে করতে পারছেন সালাউদ্দিন। ব্যস্ততায় ভাটা পড়ে যাওয়া একটি উদ্যোগ এগিয়ে রাখছেন এই অবসরে।

“৫-৬ বছর ধরেই আমি চেষ্টা করছি একটি বই লেখার। নিজের জানাশোনা, প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা, সবকিছু থেকে কোচিংয়ে টেকনিক্যাল-ট্যাকটিক্যাল ও মানসিক দিকগুলো নিয়ে বই। অনেকটাই গুছিয়ে এনেছিলাম। এখন পড়তে গিয়ে দেখছি, অনেক কিছুই বাদ পড়ে গেছে। এই সুযোগে বইটি শেষ করার চেষ্টা করছি।”

অখন্ড এই অবসরে বইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন সোহেল ইসলামও। নানা সময়ে জাতীয় দলের সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করা বিসিবির এই কোচ নানা লেখা পড়ছেন কোচিং নিয়ে। দেখছেন ভিডিও।

“এমনিতে পড়াশোনার সময় খুব একটা হয় না। এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছি। বিভিন্ন জার্নাল ও আর্টিকেল পড়ছি। বিশেষ করে স্পিন বোলিং আর ফিল্ডিং নিয়ে। স্কিলের ব্যাপারগুলি মোটামুটি আমাদের জানাই আছে। মানসিক প্রস্তুতির ব্যাপারগুলি নিয়েই পড়ছি। কোচিং সম্পর্কিত ভিডিও দেখছি।”

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে এবার তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ। জানালেন, লিগের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা হচ্ছে অনলাইনে।

“মোহামেডানের আমাদের সবাইকে নিয়ে গ্রুপ আছে একটি। সেখানেই টুকটাক পরামর্শ দিচ্ছি। ক্রিকেটারদের যার যেটা জানার থাকে, গ্রুপে বললেই সমাধানের চেষ্টা করছি।”

অনলাইন গ্রুপে সক্রিয় মিজানুর রহমান বাবুলও। ২০১৬ সালে তার কোচিংয়েই দেশের মাটিতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়েছিল বাংলাদেশ, এবারের আগ পর্যন্ত যুব বিশ্বকাপে যা ছিল দেশের সেরা সাফল্য। ঘরোয়া ক্রিকেটে এবার নিয়ে টানা সাত মৌসুম তিনি প্রাইম দোলেশ্বর স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ। জাতীয় দলের সাবেক এই পেসার জানালেন, অনলাইনেই চলছে কোচিং।

“আমাদের দলের একটা অনলাইন গ্রুপ আছে। দলের ট্রেনার তুষার সেখানেই সবাইকে নিয়মিত ফিটনেস নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। আমি কোচিংয়ের পরামর্শ দিচ্ছি। ঘরে বসে যেসব ড্রিল করা যায়, করতে বলছি। অনেকে ভিডিও করে পাঠাচ্ছে। সেসব দেখে কোনো কিছু ঠিক করতে হলে বলে দিচ্ছি। ওরা শুধরে আবার ভিডিও পাঠাচ্ছে। এভাবেই চেষ্টা করছি।”

খেলোয়াড়ি জীবন থেকে শুরু করে কোচিংয়ে আসা, ব্যস্ততায় ভরা জীবনে এত লম্বা অবসর কখনোই পাননি মিজানুর। জানালেন সময় খারাপ কাটছে না।

“মাঠের বাইরে থাকতে খারাপ তো লাগছেই। তবে পরিবারকে সময় দিচ্ছি, এমনিতে এতটা সুযোগ হয় না। টিভি-সিনেমা দেখছি, আমার পছন্দ অ্যাকশন সিনেমা। আর চেষ্টা করছি, আশপাশের অসহায় মানুষদের সাধ্যমতো সহায়তা করার।”

জাতীয় দলের সাবেক কোচ সরওয়ার ইমরানও চেষ্টা করছেন, নিজের জন্য বিনোদনের খোরাক জোগানোর।

“এমনিতে আমি সারা বছরই কোচিং নিয়ে পড়াশোনা করি। এর বাইরেও প্রচুর বই-টই পড়ি। এই অবসরে বরং চেষ্টা করছি কম পড়তে। টিভি দেখছি, ফেইসবুক দেখছি, সারা দুনিয়ার খোঁজ রাখছি। চেষ্টা করছি, অবসর সময়ে নানাভাবে বিনোদন নেওয়ার।”

তবে কোচিং থেকে তো চাইলেও দূরে থাকা যায় না! দেশে নামী এই কোচ এবারের লিগে আছেন প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেটার্সের দায়িত্বে। তবে শুধু এই দলের নয়, দেশের অনেক ক্রিকেটারই নানা প্রয়োজনে শরণাপন্ন হন তার।

“লিগ কবে হবে কিংবা হবে কিনা এবার, ঠিক নেই। ছেলেদের কিছু প্রাথমিক নির্দেশনা দেওয়া আছে। আর শুধু আমার দলের নয়, আরও অনেকেই অনেক কিছু জানতে চায়। চেষ্টা করে প্রয়োজন মেটানোর। ভিডিও করে পাঠায় অনেকে। নানা ড্রিল বলে দেই। এভাবেই কাটছে সময়।”


ট্যাগ:  বাংলাদেশ  ইমরান তাহির  সালাউদ্দিন  মিজানুর  সোহেল খান