স্মরণীয় দ্বৈরথ: জহুরের ব্যাটে আহত হাসিবুল ও টিকোলোর উড়ন্ত স্টাম্প

  • আরিফুল ইসলাম রনি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-04-08 18:11:16 BdST

bdnews24

ব্যাটসম্যানকে আউট করে সহজাত উল্লাসে বোলারের ছুটে চলা, ক্ষিপ্ত ব্যাটসম্যানের আচমকা আঘাত বোলারের হাঁটুতে! বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুসারীদের অনেকেরই জানা সেই ঘটনা। পাকিস্তানী ব্যাটসম্যান জহুর এলাহির সেই হঠকারিতা বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের পেসার হাসিবুল হোসেন শান্তর ক্যারিয়ারের গতিপথ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ধারাবাহিক আয়োজন ‘স্মরণীয় দ্বৈরথ’-এ পালা যখন হাসিবুলের, অবধারিতভাবেই যেন উঠে এলো জহুর এলাহির সঙ্গে সেই ঘটনা। পাশাপাশি, স্টিভ টিকোলোর স্টাম্প উপড়ে দেওয়া একটি ডেলিভারির কথাও মনে পড়ল দেশের এক সময়ের সবচেয়ে গতিময় এই পেসারের।

জহুর এলাহির সঙ্গে হাসিবুলের সেই ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটে বহু চর্চিত। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ ছিল সেটি, ২০০০ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। আরও অনেকের মতো হাসিবুল নিজেও বিশ্বাস করেন, ওই চোট না পেলে তার ক্যারিয়ার হতে পারত আরও সমৃদ্ধ। তার স্মৃতিচারণায় উঠে এলো দুঃস্বপ্নের সেই অধ্যায়।

‘হৃদয়ে চোট নেই, পায়ে আছে’

“আমি সেবার আবাহনীতে খেলছিলাম, জহুর এলাহি কলাবাগানে। জহুর অবিশ্বাস্য ফর্মে ছিল। আমাদের বিপক্ষে ম্যাচের আগে চার ম্যাচে তিনটি সেঞ্চুরি করেছিল। আমিও সেবার দুর্দান্ত ফর্মে ছিলাম। সম্ভবত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জোরে বোলিং করছিলাম তখন, দারুণ ছন্দে ছিলাম।”

“কলাবাগানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে আমাদের আলোচনা ছিল, যত দ্রুত সম্ভব জহুরকে ফেরাতে হবে। আমি যেহেতু ছন্দে ছিলাম, আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে ওকে আউট করতে পারব। ওকে নিয়ে পরিকল্পনা কেমন ছিল, এই ২০ বছর পর আর মনে নেই। তবে মনে আছে, ওই ম্যাচেও খুব ভালো বোলিং করছিলাম। জহুরকে আউট করে দিলাম ১২ রানেই। গালিতে ক্যাচ নিয়েছিল অপি (মেহরাব হোসেন)।”

“অমন একটা উইকেটের পর উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া স্বাভাবিক। আমিও উদযাপন করছিলাম। ছুটে গিয়ে শুধু বলেছিলাম, ‘ইয়েস…আই গট ইউ।’ জহুর ২-১ হাত দূরে ছিল আমার। সেখান থেকেই ব্যাট ছুঁড়ে মারল, এসে লাগল আমার বাম হাঁটুতে।”

“আমি মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে ব্যথার চেয়ে বেশি ছিল রাগ। তবে আমার চেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত ছিল দলের অন্যরা। অপি, ইকবাল, আরও সবাই ছুটে এলো। পারলে জহুরকে তখনই মারে! সবাই ঘিরে ধরেছিল ওকে। আকরাম ভাই ছিলেন আমাদের অধিনায়ক। তিনি গিয়ে রক্ষা করলেন। জহুরকে মাঠের বাইরে নিয়ে গেলেন, নাহলে হয়তো সেদিন তাকে মাঠে মার খেতেই হতো।”

“আমি ততক্ষণে ব্যথায় মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছি। তারপর তো মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। শুরুতে বলা হয়েছিল, খুব বড় আঘাত নয়। দুই-তিন ম্যাচ পরই খেলতে পারব। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম গুরুতর চোট। হলো সেটিই। ভারতে গিয়ে আর্থ্রোস্কপি করানো হলো। ৬ মাস মাঠের বাইরে ছিলাম।”

“পরে জেনেছি, মাঠে তখন দর্শকরাও ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির মতো ঢিল ছুঁড়ছিল জহুরের দিকে। একজন গ্রাউন্ডসম্যান আহত হয়েছিল ঢিল লেগে। জহুর লিগ কমিটির কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছিল যে আউট হওয়ার তাৎক্ষণিক হতাশায় অমন করে ফেলেছে। সে পরে আরও অনেকবার ঢাকা লিগে খেলেছে।”

“জহুর পরে আমার কাছেও ক্ষমা চেয়েছিল। সেবার নয়, পরের কোনো এক বছর। সিলেটে একটি ম্যাচের সময়। আমাকেও বলেছিল হুট করে করে ফেলেছে। আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। ঢাকা লিগে পরে একই দলেও খেলেছি।”

“সেই ইনজুরি আমাকে অনেক ভুগিয়েছে। ওই গতি আর ছন্দ সেভাবে আর কখনও খুঁজে পাইনি। অনেক সময়ই এফোর্ট দিতে গেলে ব্যথাটা ভোগাত। যতদিন খেলেছি, ওই ব্যথা সঙ্গী করেই খেলতে হয়েছে। ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় ঘটনা সেটি। ওই ইনজুরি না হলে আমার ক্যারিয়ার অন্যরকম হতে পারত।”

“জহুরের ওপর আমার ক্ষোভ নেই। ক্ষোভ রেখে তো হারানো সময় ফিরে পাব না। তবে হাঁটুর ব্যথাটা আছেই, এখনও মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দেয় সেই ব্যথা।”

(জহুর এলাহিকে সেবার ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, জরিমানা করা হয়েছিল ১০ হাজার টাকা। ওই ঘটনার পর গন্ডগোলে জড়ানোয় আবাহনীর ব্যাটসম্যান মেহরাব হোসেন ও পেসার ইকবাল হোসেনকে জরিমানা করা হয়েছিল ৫ হাজার টাকা করে।)

‘বাতাসে ডিগবাজি টিকোলোর স্টাম্প’

“আরেকটি ডেলিভারি খুব চোখে ভাসে আমার। কেনিয়ায় ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টে (১৯৯৭ সালে)। ম্যাচটা খুব বাজে গিয়েছিল আমাদের, অলআউট হয়েছিলাম ১০০ রানে। এরপর বোলিংয়ে আমি শুরুতেই দুটি উইকেট নিয়েছিলাম। একটি ছিল টিকোলোর।”

“টিকোলোকে তখন মনে করা হতো টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলির বাইরের সেরা ব্যাটসম্যান। অনেকে মনে করতেন, টেস্ট খেলার যোগ্যতা তার আছে। আমাদের বিপক্ষে তো অনেক রান করেছে। ওকে বোল্ড করেছিলাম সেই ম্যাচে, গতিতে পরাস্ত হয়েছিল।”

“ব্যাটসম্যানের স্টাম্প বাতাসে উড়ছে, প্রতিটি ফাস্ট বোলারের জন্য তৃপ্তির দৃশ্য সেটি। প্রথমে ওদের এক ওপেনারকে আউট করলাম (দিপক চুড়াসামা), পরের বলেই টিকোলোর মিডল স্টাম্প উড়িয়ে দিয়েছিলাম, বাতাসে ডিগবাজি খেয়ে পড়েছিল স্টাম্প।”