গিলবার্ট জেসপ: শত বছর আগেই যিনি ছিলেন বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান

  • অনীক মিশকাত, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-19 08:38:35 BdST

bdnews24

তিনি উইকেটে যাওয়া মানেই ছিল ফিল্ডারদের ব্যস্ত সময়ের শুরু। মাঠের বাইরে থেকে বল কুড়িয়ে আনতেই থাকতে হতো তটস্থ! প্রায়ই বল উড়ে চলে যেত মাঠের বাইরে। কখনও গিয়ে পড়ত পাশের বাড়ির আঙিনায়, কখনও ভেঙে দিত বাইরের রাস্তায় থাকা গাড়ির কাঁচ। এখনকার এই টি-টোয়েন্টির যুগে বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানদের কতই না কদর। কিন্তু শত বছর আগেই এমন ব্যাটিংয়ে মাঠ মাতিয়েছেন গিলবার্ট জেসপ।

অথচ তিনি মূলত ছিলেন বোলার। বেশ গতিময় ফাস্ট বোলার। এতটাই ভালো বোলার যে বোলিং দিয়েই জায়গা করে নিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের টেস্ট দলে। দুর্দান্ত ছিলেন ফিল্ডিংয়েও। বুলেট গতিতে পৌঁছে যেতেন বলের কাছে, থ্রোয়ে ছিল প্রচণ্ড জোর। তবে ক্রিকেট ইতিহাস তাকে আলাদা করে মনে রেখেছে ব্যাটিংয়ের জন্যই। এখানেই তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে!

সময়ই আজ মনে করিয়ে দিচ্ছে জেসপকে। ১৯ মে যে তার জন্মদিন! ১৮৭৪ সালের এই দিনে গ্লস্টারশায়ারের চেল্টেনহামে তার জন্ম।

ব্যাটিংয়ে তার কাছে আক্রমণই ছিল শেষ কথা। বল ওড়াতেন এদিক-ওদিক। বল হাতে পেলে ঘায়েল করতে চাইতেন ব্যাটসম্যানকে। উইকেট শিকারেই ছিল চোখ। ফিল্ডিংয়ে কাজে লাগাতে চাইতেন প্রতিটি সুযোগ। প্রতিটি রান আটকাতে উজাড় করে দিতেন নিজেকে। এখনকার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট তো এরকম আকর্ষণীয় প্যাকেজই চায়!

গ্লস্টারশায়ারে তিনি কিংবদন্তি। ২০ বছরের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে ৪৯৩ ম্যাচে রান করেছেন ২৬ হাজার ৬৯৮। ৫৩ সেঞ্চুরির পাশে ফিফটি ১২৭টি। ২২.৭৯ গড়ে নিয়েছেন ৮৭৩ উইকেট।

ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট ক্যারিয়ার খুব সমৃদ্ধ নয়। ১৮ টেস্টে উইকেট মাত্র ১০টি। মোটে ৫৬৯ রান করতে পেরেছেন ২১.৮৮ গড়ে। সেঞ্চুরি কেবল ১টি।

তবে ওই সেঞ্চুরিই ফুটিয়ে তুলতে পারে জেসপের গোটা ক্যারিয়ারকে। ১০৪ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মাত্র ৭৭ মিনিটে!

এটিই জেসপ। ক্যারিয়ার রান, পরিসংখ্যান, এসবে তাকে বোঝা যায় সামান্যই। ক্রিকেটে তিনি আজও স্মরণীয় ব্যাটিংয়ের ধরনের কারণেই।

পরিস্থিতি যাই হোক, নিজের সহজাত ক্রিকেটই খেলতেন জেসপ। তার ক্রিজে যাওয়া মানেই দর্শকদের জন্য ছিল আনন্দের বান। সে সময়ে তার ব্যাটিংয়ের চেয়ে বিনোদনদায়ী কিছু কমই ছিল ক্রিকেটে।

ঘণ্টায় ৭৯ রান!

ব্যাটিং গ্রেট ফ্র্যাঙ্ক উলি, ভিক্টর ট্রাম্পার সেই যুগে ঘণ্টা প্রতি গড়ে করতেন ৫৫ রান। ডন ব্র্যাডম্যান, ডেনিস কম্পটনদের গড় রান ছিল ৪৫-এর আশেপাশে। জেসপ রান তুলেছেন ঘণ্টায় গড়ে ৭৯ করে!

ক্যারিয়ারে কেবল একবার তিন ঘণ্টার বেশি ব্যাট করেছেন, কিন্তু ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন পাঁচবার।

তার গড়ন ছিল ছোটখাটো। উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি, ওজন ৭০ কেজির কম। কিন্তু তার ব্যাটিং ছিল ওজনদার! খুনে ব্যাটিংয়ে মন রাঙাতেন দর্শকদের।

সে সময় মাঠের সীমানা দড়ি পার হলে মিলত ৫ রান। ছক্কার জন্য বল ফেলতে হতো স্টেডিয়ামের বাইরে। সেই যুগেও ছক্কা মেরেছেন তিনি হেসেখেলে। ম্যাচ পরিস্থিতি যেমনই হোক, সামনে যে বোলারই থাকুক, জেসপ পরোয়া করেছেন সামান্যই। বোলারদের জন্য তিনি ছিলেন বিভীষিকা। বল সীমানা ছাড়া করতেন অনায়াসে। দল চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে? জেসপ নেমে ৩০ মিনিটেই পাল্টে দিতেন চিত্র।

জেসপের ৫৩ সেঞ্চুরি ব্যবচ্ছেদ করে দেখা যায়, তিনি ক্রিজে যাওয়ার পর দলের ৭২ শতাংশ রান তার ব্যাট থেকেই এসেছে!  

১৭৯ টি পঞ্চাশ ছোঁয়া ইনিংসের কেবল ২৭টিতে রান করেছিলেন মিনিটের চেয়ে কম গতিতে। গড়ে একশ রানে পৌঁছাতে সময় নিতেন ৭২ মিনিট।

‘সর্বকালের সেরা ওয়ানডে ক্রিকেটার’

সাবেক অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার রিচি বেনো একবার বলেছিলেন, তার কাছে সর্বকালের সেরা ওয়ানডে খেলোয়াড় জেসপ। অথচ আন্তর্জাতিক ওয়ানডের আবির্ভাবের ১৬ বছর আগেই জেসপ বিদায় নিয়েছিলেন দুনিয়া থেকে!

অবিশ্বাস্য, কিন্তু এটিই সত্যি। জেসপের ব্যাটিংয়ের ধরণ এমন ছিল যে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তিনি কেমন করতেন, এ নিয়ে চর্চা হয়েছে অনেক।

নিজের ধরণটা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম বল থেকেই। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ১৮৯৪ সালে। অভিষেক ইনিংসে যখন উইকেটে গেলেন, বোলার তখন হ্যাটট্রিকের অপেক্ষায়। জেসপ গিয়ে প্রথম বলটিই পাঠালেন বাউন্ডারিতে!

অভিষেকের সেই সম্ভাবনার প্রতিফলন ছিল তার ক্যারিয়ার জুড়ে। দুই দশকের ক্যারিয়ারে সহজাত আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে অটল থেকেছেন জেসপ।

তার ব্যাটিং স্টান্সও ছিল কৌতূহল জাগানিয়া। নিচু হয়ে থাকতেন, বল ডেলিভারি দেওয়ার সময় আরও নিচু হয়ে যেতেন। এজন্য তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ক্রাউচার।’ মনে হতো, বল থেকে বাঁচার জন্য বুঝি অমনভাবে দাঁড়িয়েছেন। বল ডেলিভারির পর পাল্টে যেত চিত্র। পুরোটা সময় চোখ রাখতেন বলে। খুব দ্রুত পৌঁছে যেতে পারতেন পজিশনে। কব্জি যেন ছিল ইস্পাত দৃঢ়। সঙ্গে অসাধারণ ট্যাকটিক্যাল মস্তিষ্ক।

তার স্টান্স দেখে ফাস্ট বোলাররা প্রায়ই ঠুকে দিতেন বল। সেগুলো অনায়াসে হুক-পুল করতেন মনের আনন্দে। পায়ের কাজ এতটা দুর্দান্ত ছিল যে লেগ স্টাম্পের বলও কাট করতে পারতেন, বা অফ স্টাম্পের বাইরের বলে পুল! হাতে এতো শট ছিল যে তার সামনে ভালো লেংথ বলে কিছু ছিল না। তিনি সব সময় বলতেন, ভালো বোলারদের খেলতেই বেশি পছন্দ করেন।

সত্যিকারের অলরাউন্ডার

ব্যাটিংয়ের জন্যই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। তবে তার বোলিং আর ফিল্ডিংয়ের কথা তো বলা হয়েছে আগেই!  

১৮৯৯ থেকে ১৯১২ পর্যন্ত খেলেছেন টেস্ট। কারও কাছে তিনি ছিলেন অটোমেটিক চয়েজ, কারও কাছে জুয়া। সমুদ্র যাত্রায় অসুস্থ হয়ে পড়তেন বলে দেশের বাইরে খুব একটা খেলেননি। তিনবার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় খেলার প্রস্তাব। খেলেছিলেন স্রেফ একবার।

ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিলেন গতিময় প্রাণবন্ত এক পেসার। ১৯০০ সালে এক মৌসুমে দুই হাজার রান ও ১০০ উইকেটের ডাবল স্পর্শ করেন। এই ডাবল ছোঁয়া তৃতীয় ক্রিকেটার ছিলেন তিনি।

কাভারে অন্যদের চেয়ে একটু পিছিয়ে দাঁড়াতেন। তার কাছাকাছি গেলে রান নেওয়া ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। গতি ছিল অসাধারণ। থ্রো করলে স্টাম্প মিস করতেন কমই। এক মৌসুমে করেছিলেন ৩০ রান আউট।

বোলিংয়েও আছে অনেক অর্জন। অক্সফোর্ডের বিপক্ষে কেমব্রিজের হয়ে দুই ইনিংসেই নিয়েছিলেন ৬ উইকেট করে। ১৯০০ সালে এসেক্সের বিপক্ষে ২৯ রানে নিয়েছিলেন ৮ উইকেট। ১৮৯৫ সালে ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে ৫৪ রানে ৮ উইকেট, ১৯০২ সালে মিডলসেক্সের বিপক্ষে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন ৫৮ রানে। ওই বছরই সিডনিতে বোলিং ওপেন করে ফিরিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রথম চার ব্যাটসম্যানকে।

শুধু ক্রিকেটে পড়েনি জেসপের মেধার ছাপ। হকিতে ছিলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ব্লু। বিলিয়ার্ড, রাগবি, ফুটবলেও দেখিয়েছেন দক্ষতা। ১০ সেকেন্ডের একটু বেশি নিয়ে শেষ করতে পারতেন ১০০ মিটার দৌড়। গলফের হাতও ছিল পাকা।

কিছু মণি-মুক্তা

জেসপের ক্যারিয়ারের আগ্রাসী সব ইনিংসের রত্ন ভাণ্ডার থেকে কিছু মণি-মুক্তা তুলে আনলেই বোঝা যাবে তার বিশেষত্ব।

তার একমাত্র টেস্ট সেঞ্চুরির কথা বলা হয়েছে ওপরে। ৭৭ মিনিটে সেঞ্চুরি করেছিলেন সেই ১৯০২ সালে, ভাবা যায়!

সেটিও কোন পরিস্থিতিতে, ২৬৩ রান তাড়ায় যখন ৪৮ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে দল। উইকেট ভীষণরকম ব্যাটিং দুরূহ। সেখানেই নেমে পাল্টা আক্রমণে অস্ট্রেলিয়ান বোলিং গুঁড়িয়ে দেন জেসপ। ষষ্ঠ উইকেটে স্ট্যানলি জ্যাকসনের সঙ্গে গড়েন ১০৯ রানের জুটি, তাতে জ্যাকসনের অবদান ছিল কেবল ১৮! জেসপের দুর্দান্ত ইনিংসে ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি জিতেছিল ১ উইকেটে।

১৯০০ সালে ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে এক ম্যাচে দুই ইনিংসেই লাঞ্চের আগে করেন সেঞ্চুরি। সে সময়ে ইয়র্কশায়ারের বোলিং উদ্বোধন করতেন ইংল্যান্ডের মূল দুই পেসার জর্জ হার্স্ট ও উইলফ্রেড রোডস। ১৯০৩ সালে হোভে সাসেক্সের বিপক্ষে ১৭৫ মিনিটে করেছিলেন ২৮৬ রান।  

১৮৯৭ সালে ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে ৪০ মিনিটে করেছিলেন ১০১ রান, তার দ্রুততম সেঞ্চুরি। সেই সময়ে এটাই ছিল রেকর্ড। ১৯০৭ সালে ৪২ মিনিটে ছুঁয়েছিলেন সেঞ্চুরি। সব মিলিয়ে এক ঘণ্টার ভেতরে তার সেঞ্চুরি আছে ১২টি।

দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ডও একসময় ছিল জেসপের। ক্যারিয়ার সেরা ২৮৬ রান করার পথে দুইশ রান ছুঁয়েছিলেন কেবল দুই ঘণ্টায়। আরেকবার সমারসেটের বিপক্ষে ১৯০৫ সালে ২৩৪ রান করার পথে ডাবল সেঞ্চুরি ছুঁয়েছিলেন ১৩০ মিনিটে। ১৯০১ সালে লর্ডসে ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে ২৩৩ রান করার পথে ১৩৫ মিনিটে এসেছিল ডাবল।

১৯০১ সালে সাসেক্সের বিপক্ষে ৪ রানে প্রথম উইকেট পড়ার পর ক্রিজে গিয়েছিলেন। ৭০ রানে দলের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়ার সময় তার রান ছিল ৬৬!

এই ছিলেন জেসপ। ইংলিশ ক্রিকেটে তাকে নিয়ে গল্পগাঁথার শেষ নেই। ক্রিকেটের গল্পও দারুণ সমৃদ্ধ তার সৌজন্যে।


ট্যাগ:  ইংল্যান্ড  জেসপ