পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

শতরানের নন্দন কাননে নতুন আশার আবাহন

  • চট্টগ্রাম থেকে ক্রীড়া প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-11-26 20:32:56 BdST

লিটন দাস তাহলে হাসতেও পারেন! যদিও এক চিলতে, কিছুক্ষণ তবু ঝুলে রইল তার মুখে। একটু আগেই একটা সিঙ্গেল নিতে শেষ মুহূর্তে এমনভাবে ঝাঁপালেন, যেন ওই এক রানেই বেঁচে থাকা, না পারলেই মরন। এরপর মাঠেই পড়ে রইলেন কিছুক্ষণ। ব্যথা পেলেন না তো? হয়তো সুখের মতো কোনো ব্যথা। উঠে দাঁড়াতেই দেখা গেল ঠোঁটের কোণে সেই হাসির ঝিলিক।

এমনিতে তাকে মাঠে হাসতে দেখার ঘটনা বিরল। তার ধরনই অমন। সাস্প্রতিক সময়ে তো হাসতে একদমই ভুলে গিয়েছিলেন। টি-টোয়েন্টিতে তার ব্যাট ছিল মলিন। সেই ছাপ মনে আর অবয়বে পড়ারই কথা। ঝাঁপিয়ে পড়া ওই এক রানে জীবন-মৃত্যু নির্ভর না করলেও তাই জরুরি ছিল ভীষণ। ওই হাসিটুকুর জন্য!

ওই সিঙ্গেলে পূর্ণ হলো লিটনের সেঞ্চুরি। দুঃসময়কে পাল্টা জবাব? সংস্করণ যেহেতু এক নয়, এই জবাবও হয়তো যথোপযুক্ত নয়। তবে মনের আঁধার দূর করা আলোর ফোয়ারা এটি নিশ্চিতভাবেই। সেঞ্চুরি, বহু কাঙ্ক্ষিত টেস্ট সেঞ্চুরি, পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত ইনিংস। নিজের জাত আরেকবার বুঝিয়ে দেওয়ার ইনিংস।

শুধু সাম্প্রতিক বৈরি হাওয়ার কারণেই অবশ্য নয়, তার বুক থেকে বড় পাথর নেমে যাওয়ার কথা ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপটেও। যে ঠিকানায় তিনি আশ্রয় পেলেন এই ম্যাচে, এতদিন ধরে তা ছিল তার অচেনা। সেখানে পৌঁছতে পথ হারিয়েছেন বারবার।

২৫টি টেস্ট খেলে সেঞ্চুরি ছিল না একটিও। সবশেষ টেস্টে কাটা পড়েন ৯৫ রানে। ২০১৮ সালে এই চট্টগ্রামেই আউট হন ৯৪ রানে। তার মতো একজনের জন্য বিব্রতকরই হওয়ার কথা। সেই কালি মুছে ফেলা প্রয়োজন ছিল। মানসিক বাধার খাঁচা ভাঙা দরকার ছিল। সেঞ্চুরির বাতাসে শ্বাস নেওয়ার বিশ্বাস জরুরি ছিল।

চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিনে ১১৩ রানের অপরাজিত ইনিংসটি আপাতত তার সব চাওয়ার এক পাওয়া।

টেস্টে তিনি এমনিতেও ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটাচ্ছেন। এই ম্যাচের আগেই ৫ টেস্ট খেলে তার গড় ছিল ৪৬.২৫। কিপার-ব্যাটসম্যানদের মধ্যে বিশ্বক্রিকেটেই এবছর সেরা গড়। কিন্তু সেসব কী আর লোকের মনে থাকে! সবশেষ টেস্ট খেলেছে তো বাংলাদেশ সেই চার মাস আগে।

সেঞ্চুরি ছোঁয়ার রানটি নিতে প্রাণপণ ঝাঁপিয়ে পড়ার পর! ছবি: সুমন বাবু

সেঞ্চুরি ছোঁয়ার রানটি নিতে প্রাণপণ ঝাঁপিয়ে পড়ার পর! ছবি: সুমন বাবু

এরপর টি-টোয়েন্টিতে বাজে সময়ের ছোবলে টেস্টের স্বস্তি বিলীন হয়ে গেছে। নিজের বাজে পারফরম্যান্স, সমালোচনা-ট্রল, দলের ব্যর্থতা, টি-টোয়েন্টি দল থেকে বাদ পড়া, সব মিলিয়ে সময়টা তার অসহনীয় হয়ে ওঠারই কথা।

দিনবদলের জন্য পারফরম্যান্সের চেয়ে বড় হাতিয়ার খেলোয়াড়দের আর কী হতে পারে। লিটন বেছে নিলেন সেই পথই। টেস্টে যদিও রানের মধ্যেই ছিলেন, কিন্তু মানুষ তো তিনি একজনই। টি-টোয়েন্টির বাজে ফর্মে মানসিকতা থাকার কথা বিধ্বস্ত। আত্মবিশ্বাস থাকার কথা তলানিতে।

দলেরও এ দিন একই অবস্থা। লিটন যখন উইকেটে গেলেন, টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা দল ৪৯ রানেই হারিয়ে ফেলেছে প্রথম চার ব্যাটসম্যানকে।

সেই ধ্বংসস্তুপ থেকেই লিটন আবার উঠে দাঁড়ালেন মাথা উঁচু করে। টেনে তুললেন দলকেও।

টি-টোয়েন্টির ব্যাটিংয়েই বৈরি হাওয়ার চক্রে থাকা আরেক ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে জুটি হলো ২০৪ রানের। প্রথম সেশনের বিপন্ন বাংলাদেশই দিনশেষে দারুণ ঝলমলে!

লিটনের ইনিংসে খুঁত একটিই। জীবন পান ৬৭ রানে। তবে দারুণ কোনো ডেলিভারি নয়, সেটি ছিল তার নিজেরই ভুলে। এই একটি মুহূর্ত ছাড়া বাকি সময়ে মনেই হয়নি, কোনো অস্বস্তি আছে তার ব্যাটিংয়ে।

ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা তো তার সহজাত। আপন ছন্দে থাকলে তাকে দেখে মনে হয়, ব্যাটিংয়ের চেয়ে সহজ কাজ আর নেই। বড় ইনিংস খেললে ক্রিকেটীয় সব শটের দারুণ পসরাও তিনি মেলে ধরেন। সবকিছু ছিল এই ইনিংসেও। তারপরও আলাদা করে চোখে পড়ার মতো ব্যাপার ছিল, এ দিন যতটা দেরিতে তিনি শট খেলেছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে, বলের ওপর চোখ রেখে শট খেলা। দারুণ কিছু কাট শট। ঝুঁকি না নিয়েই অনায়াসে রান বাড়ানো।

দিনের শেষ দিকে গিয়ে অবশ্য তার শরীরও একটু বিদ্রোহ করে। ক্র্যাম্প করে তার হাতে। তারপরও হাল না ছেড়ে সেঞ্চুরি পেরিয়ে অপরাজিত থাকেন শেষ পর্যন্ত।

দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ অ্যাশওয়েল প্রিন্স জানালেন, টেস্ট সিরিজের আগে প্রস্তুতিপর্বে টেকনিক্যাল কিছু কাজ করেছিলেন তিনি লিটনকে নিয়ে।

“টেস্টের প্রস্তুতির জন্য কয়েকজন আগেই চলে এসেছিল। সেও ছিল সেখানে। আমরা দু-একটি টেকনিক্যাল দিক নিয়ে কাজ করেছি। খুব বড় কিছু অবশ্য নয়। তার স্টান্সে একটু বদল এনে এমনভাবে দাঁড় করানো যেন বলের লাইনে ভালোভাবে যেতে পারেন। সঙ্গে তার ব্যালান্স একটু ভালো করা। আজকে তার ব্যালান্স ছিল ভালো।”

“ওকে ব্যাটিং করতে দেখা দারুণ আনন্দময়। সে যখন ভালো ছন্দে থাকে, ব্যাটিং করা খুব সহজ মনে হয় ওকে দেখে।”

সমস্যা হলো, এমন ভালো ছন্দে থাকার দিন তার খুব বেশি আসে না। আসেনি এখনও পর্যন্ত। তার প্রতিটি ভালো ইনিংস তাই তৃপ্তির পাশাপাশি হাহাকারও বয়ে আনে। ৬ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পর এখন তো তার থাকার কথা আরও উঁচুতে।

সেঞ্চুরি খরা কাটানোর দিনটিতে আরও একবার নতুন আশায় বুক বাঁধাই যায়। শতরানের বিশ্বাস নিয়ে লিটন হয়তো ছুটবেন নতুন গতিময়তায়। হয়তো পা রাখবেন নতুন উচ্চতায়। আক্ষেপের প্রহরগুলি তিনি ভুলিয়ে দেবেন নিত্য উৎসবের উপলক্ষ উপহার দিয়ে!