পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

বিপিএলে ছাপ রাখতে চান ক্রিকেটের ‘প্রথম পাওয়ার হিটিং কোচ’

  • আরিফুল ইসলাম রনি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2022-01-20 10:49:32 BdST

ক্রিকেটে ‘পাওয়ার হিটিং কোচ’ ধারণাটির অগ্রদূত জুলিয়ান রস উড। হ্যাম্পশায়ারের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ক্যারিয়ারে সফল হতে পারেননি। পরে কোচিংয়ে নেমে জন্ম দিয়েছেন নতুন এক ধারার। নিজস্ব ঘরানার সেই কোচিং দিয়ে তিনি বিগ ব্যাশ, পিএসএলে কাজ করে আসছেন, ইংল্যান্ডে তার একাডেমি বেশ বিখ্যাত, বিশ্বজুড়ে অনেক ক্রিকেটারও ব্যক্তিগতভাবে কাজ করেন তার সঙ্গে। ৫৩ বছর বয়সী সাবেক এই ব্যাটসম্যান এবার বিপিএলে এসেছেন সিলেট সানরাইজার্সের ব্যাটিং কোচ হয়ে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি শোনালেন তার শুরুর গল্প, তুলে ধরলেন কাজের ধরন ও বিপিএলে সম্ভাব্য প্রভাবসহ পাওয়ার হিটিংয়ের বিস্তারিত আরও অনেক কিছু।

প্রথমবার সম্ভবত কোনো ফ্রাঞ্চাইজি লিগে বড় কোনো দায়িত্ব পেলেন?

জুলিয়ান উড: পুরো টুর্নামেন্টের জন্য বললে, হ্যাঁ, প্রথমবার। বিগ ব্যাশে সিডনি থান্ডার, পিএসএলে মুলতান সুলতানস দলে কাজ করেছি। আরও নানা জায়গায় কাজ করেছি। তবে পুরো আসরে নয়, কিছু সময়ের জন্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে নেওয়া হয়েছে আমাকে। পুরো টুর্নামেন্টের জন্য সুনির্দিষ্ট বড় দায়িত্বে এটিই প্রথম।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে আপনার নাম খুব পরিচিত নাম নয়। দায়িত্বটি কিভাবে পেলেন?

উড: হ্যাঁ, এই অঞ্চলে হয়তো সেভাবে লোকে চেনে না আমাকে। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় আমি অনেক পরিচিত। ভারতেও, সেখানে আমি অনেকবারই গিয়েছি এবং বেশ কজন ক্রিকেটারের সঙ্গে কাজ করেছি। সবশেষ পৃথ্বী শ নিবিড়ভাবে কাজ করেছে আমার সঙ্গে।

বাংলাদেশের দায়িত্বটি পেলাম মূলত আমার এজেন্টের মাধ্যমে। ওরা খুবই আগ্রহী ছিল, আমিও দেখলাম ভালো সুযোগ। আসতে পেরে আমি খুবই খুশি।

‘পাওয়ার হিটিং কোচ’, এই টার্ম ক্রিকেটে আপনিই সম্ভবত প্রথম ব্যবহার করেছেন বা এই ব্যাপারটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন!

উড: দেখুন, ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি ‘পাওয়ার হিটিং।’ পাশাপাশি স্ট্রাইক রেট, ব্যাট স্পিড, হ্যান্ড স্পিড, এই ব্যাপারগুলি। সবকিছুই পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এবং এসব নিয়েই কাজ করি আমি। নিঃসন্দেহে ক্রিকেটের প্রথম পাওয়ার হিটিং কোচ আমি। এরপর অনেকেই আমাকে নকল করার চেষ্টা করছে। লোকের স্বভাব এটি। তবে আমিই প্রথম।

মূলত আমি ব্যাটিং কোচই, তবে ভিন্ন মাত্রা যোগ করার চেষ্টা করেছি। আমি ব্যাটিং কোচ ও হিটিং কোচ। মৌলিক জায়গাটা তো একই, ক্রিকেট। নিজে ক্রিকেট খেলেছি, তার পর কোচিংয়ে এসেছি। তবে প্রথাগত ধারণার সঙ্গে আমি নতুন মাত্রা যোগ করেছি, ব্যাটিং ও হিটিং কোচ।

২০১১ বিশ্বকাপের সময় গ্রাহাম গুচের একটি সাক্ষাৎকার করার সৌভাগ্য হয়েছিল, তিনি তখন ইংল্যান্ডের ব্যাটিং কোচ। কিন্তু তিনি নিজেকে বলতেন, ‘রান মেকিং কোচ।’ আপনার ব্যাপারটিও চমকপ্রদ। হিটিং কোচ বা পাওয়ার হিটিং কোচও হওয়া যায়, এই ধারণা আপনার মাথায় কিভাবে এলো?

ক্রিকেটে কোচিংয়ের নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেছেন জুলিয়ান উড। ছবি: সৌজন্য।

ক্রিকেটে কোচিংয়ের নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেছেন জুলিয়ান উড। ছবি: সৌজন্য।

উড: ২০০৮ সালের দিকে আমি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি বেসবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে প্রথম এই ভাবনাটি আসে আমার। ওখানে দেখলাম, বেসবল খেলোয়াড়রা কত জোরে হিট করে। তাদের একেজনের পেশি দেখার মতো, পোক্ত শরীর। টেক্সাস রেঞ্জার্স মেজর লিগ বেসবল দলের ট্রেনিংও দেখার সুযোগ হলো। ওদের গায়ের জোর দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট তখন কেবল ডানা মেলতে শুরু করেছে। আমার দূরদৃষ্টি ছিল, ক্রিকেট খেলাটা কোন দিকে গড়াচ্ছে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট কোন পথে এগোচ্ছে, আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম।

বেসবল দেখে আমার মনে হয়েছিল, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এরকম কিছু নিশ্চিতভাবে দেখা যাবে সামনে। আমার বিশ্বাস ছিল, ট্রেনিংয়ের প্রথাগত ধরন বদলাতে পারলেই হবে। অন্য অনেকে হয়তো তখনও ধরতে পারেনি, আমি পেরেছিলাম। ইংল্যান্ডে ফিরে আমি নিজের ভাবনা লিখলাম। বইপত্র পড়লাম। অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। বেসবলের সেই ব্যাপারটিকে ক্রিকেটে নিয়ে আসার চেষ্টা করলাম। যদিও ক্রিকেটের ব্যাপার আলাদা। তবে জোরে মারতে হবে, এটা তো একই!

আমি বৈজ্ঞানিক ও পদ্ধতিগতভাবেই ক্রিকেটে পাওয়ার হিটিং নিয়ে কাজ শুরু করলাম। ব্যস, এরপর চলতে থাকল। নিজেও নতুন নতুন অনেক কিছু বের করলাম, সমৃদ্ধ হলাম এবং চেষ্টা করলাম খেলাটাকে সমৃদ্ধ করতে।

ব্রাইসন ডেশাম্বোর (যুক্তরাষ্ট্রের গলফার) ট্রেনিং পদ্ধতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম আমি। সেখান থেকেও কিছু ব্যাপার ক্রিকেটে নিয়ে এলাম।

মূল ব্যাপারটি হলো, যত জোরে সম্ভব বলে হিট করা। আগে জোরে মারা শিখতে হবে, বল যেখানেই যাক। সেটা পেশির জোরে হতে পারে বা অন্যভাবে। জোরে মারতে পারলে দূরে পাঠানোও রপ্ত করা যায়।

ব্যাটিং এখন এতটাই বদলে গেছে, খেলাটা এখন আগের চেয়ে এত আলাদা, শুধু টি-টোয়েন্টি বা টি-টেন নয়, টেস্ট ক্রিকেটও বদলে গেছে। ব্যাটিংয়ের ভাষা, পরিভাষাই বদলে গেছে পুরোপুরি। ১০ বছর আগেও সব সংস্করণে ব্যাটিংয়ের মৌলিক ভাষা ছিল একই। স্রেফ একটু-আধটু বদল ছিল সংস্করণ ভেদে। এখন হিটিংয়ের ব্যাপার এমনভাবে ঢুকে গেছে, ব্যাটিং ব্যাপারটিই বদলে গেছে।

সবই ঠিক আছে। কিন্তু একজন ‘সাধারণ’ ব্যাটসম্যানকে আপনি কিভাবে ‘পাওয়ার হিটার’-এ রূপান্তর করবেন?

সিলেটের অনুশীলনে কেসরিক উইলিয়ামসের বোলিং দেখছেন জুলিয়ান উড। ছবি: বিসিবি।

সিলেটের অনুশীলনে কেসরিক উইলিয়ামসের বোলিং দেখছেন জুলিয়ান উড। ছবি: বিসিবি।

উড: অনেক পথ আছে। একেক জনের ক্ষেত্রে বা একেক ঘরানার ক্ষেত্রে পদ্ধতি একেকরকম।

বাংলাদেশে যেমন, এই ছেলেরা কেউ বিশালদেহী নয়। পেশিবহুল নয়। বড়সড় যারা, তাদের জন্য বা তাদের ক্ষেত্রে কাজটা সহজ। তারা ক্রিজে দাঁড়ায়, ব্যালান্স ঠিক রেখে বল মেরে দেয় জোরে। ছোটখাটো ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে স্কিলই গুরুত্বপূর্ণ। স্কিল গেম ও টাচ গেম দিয়ে জোরের ঘাটতি পুষিয়ে দিতে হবে তাদের।

তবে সমস্যা হলো, ছোটখোটো গড়নের যারা, তারা যখন দেখে পেশিশক্তির ব্যাটসম্যানরা সব উড়িয়ে দিচ্ছে গায়ের জোরে, তারাও তখন একই চেষ্টা করতে যায়। তারাও পেশির জোর দেখাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। অনেকেই আমার কাছে এসে বলে, “আমিও ওদের মতো জোরে মারতে চাই।”

গতকালকেই যেমন, সিলেট দলের দু-একজন এসে বলল, “আমি পাওয়ার হিট করতে চাই, শিখিয়ে দাও।” আমি বললাম, ‘শেখাব, কিন্তু আগে তো নিজের সাইজের দিকে তাকাও! নিজের অবস্থানটা বুঝতে শেখো। তোমার পাওয়ার কোত্থেকে আসবে? তোমার পাওয়ার আসবে রিদম, টাইমিং ও মুভমেন্ট থেকে। তুমি স্রেফ দাঁড়িয়ে ছক্কা সবসময় মারতে পারবে না, তোমার শরীর ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি নয়, তুমি আন্দ্রে রাসেল, কাইরন পোলার্ড নও। তোমার নিজেকে বুঝতে হবে।”

পাওয়ার হিটার বানানোর আগে তাই তাদেরকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাদের স্কিল আছ, টাচ আছে এবং কিছু পাওয়ার তো আছেই। সবকিছু মিলিয়েই তাদের কাজ করতে হবে। কারও ক্ষেত্রে গায়ের জোরই মুখ্য, কারও ক্ষেত্রে নয়। সবারই ভিন্ন ধরন।

গায়ের জোরে পিছিয়ে থাকার কারণে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা প্রায়ই বলেন স্কিল হিটিংয়ের কথা। আপনি কি তাহলে সেখানেই জোর দেওয়ার কথা বলছেন? শতভাগ পাওয়ার হিটার কি এখান থেকে পাওয়া সম্ভব নয়?

উড: এভাবে সরাসরি বলা কঠিন। দেখুন, আমি সবসময়ই একটা কথা ব্যাটসম্যানদের বলি, “তোমার মূল শক্তির জায়গা থেকে সরা যাবে না।” তার পর সেখানে নানা কিছু যোগ করা যায়। অনেককেই আমি দেখি, এমনিতে বেশ ক্লিন হিটার। কিন্তু পাওয়ার হিটিং করতে গিয়ে গড়বড় করে। এত টেনশনে থাকে তারা, আসল কাজে ভুল করে।

রিদম, টাইমিংয়ের সঙ্গে টেনশন লেভেলের সংযোগও একটা ব্যাপার। লো টেনশন লেভেল গিয়ে আপনি শুরু করলেন, শট খেলতে চাওয়ার সময় টেনশন লেভেল বেড়ে যায়। তাতেই সমস্যা হয়ে যায়।

এখানেই আমি ব্যাটসম্যানদের শিক্ষিত করার চেষ্টা করি। কারণ, পাওয়ার হিটিং সবাই করতে চায়। কিন্তু সবাইকে এটা নিজের পথে করতে হবে।

পোক্ত শরীর, পেশিবহুল হলে অবশ্যই বাড়তি সুবিধা। এটা মানতেই হবে। ধরুন, একজন ৯০ কেজি ওজনের ব্যাটসম্যান, একজন ৭০ কেজির, দুজনই ফিট। কিন্তু ৯০ কেজির ব্যাটসম্যান স্বাভাবিকভাবেই শটে জোর পাবে বেশি। গায়ের জোরেই অনেক কিছু করে ফেলবে সে। ৭০ কেজির ব্যাটসম্যানকে তাই অনেক বেশি স্কিলফুল হতে হবে। তার পাওয়ার জেনারেট করতে হবে ভিন্ন পথে।

কোন পথে? আপনি সেটা কিভাবে করেন?

উড: অনেকভাবেই করি। ধরুন, আমি ১০ মিনিটে কোনো ব্যাটসম্যানের হ্যান্ড স্পিড বাড়িয়ে দিতে পারি। সেই টেকনিক আমার জানা আছে। অবশ্যই সেটা সবার ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নয়, ব্যাটসম্যানকে আমার পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়েও নিতে হবে। তবে যারা রপ্ত করতে পারে, উন্নতি দ্রুতই টের পায়।

যেমন, কোনো ব্যাটসম্যান যখন তার শরীর থেকে হাত ছুঁড়ছে বলের দিকে, হাত যতটা দূরে যাবে, তত দ্রুত করতে হবে। যত দ্রুত হাত যাবে, মারে জোর তত বেশি হবে।

আমি আগে কোনো ব্যাটসম্যানকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করি। তার পর তার স্বাভাবিক খেলার সঙ্গে পাওয়ার যোগ করার পথ বের করি। তার পর সেটা ধরে এগিয়ে যাই।

বড়সড় শারীরিক আকৃতির ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তাদের ‘বেইজ।’ ধরুন আন্দ্রে রাসেল, ওর বেইজ সলিড। সেই বেইজ এবং ব্যাক হিভ ও ব্যাক লিফটের ওপর নির্ভর করে চালিয়ে দেয় সে। এখানকার ছেলেরা সেটি পারবে না। ওদের নির্ভর করতে হবে মুভমেন্টের ওপর, রিদম, টাইমিংয়ের ওপর। হ্যান্ড-আই কো অর্ডিনেশন কাজে লাগাতে হবে ওদের।

ব্যালান্স তো এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ?

উড: খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি। এখানকার ছেলেরা অনেক সময় জোরে মারতে গিয়ে ব্যালান্স হারায়, পজিশন ঠিক থাকে না। কিন্তু এই ছেলেদের পাওয়ার জেনারেট করতে হবে শরীর ও হাতের সমন্বয়ে।

যদিও সবার ক্ষেত্রে পথ ভিন্ন বলছেন, কমন কোনো ড্রিল নিশ্চয়ই আপনি করান?

উড: অবশ্যই। ওভারলোড-আন্ডারলোড ড্রিল করাই, ভারী বল, ভারী ব্যাট ব্যবহার করি। অনেক সময় ব্যাটের সমান ভারী বল দিয়ে ব্যাটিং করাই খুবই পাতলা ব্যাট দিয়ে। এভাবে নানা পথে ব্যাট-বলের সংযোগ দেখে ফিডব্যাক নেই এবং সেভাবেই তার ক্ষেত্রে কাজ করার চেষ্টা করি।

ব্যাট-বলের সংযোগের ব্যাপারটি ব্যাটসম্যানদের অনুভব করতে হবে। যখন তারা সেটি অনুভব করতে পারে, তখনই বুঝতে পারে যে কোথায় কাজ করতে হবে। আমি তাদের সেই উপলব্ধি আনায় সহায়তা করি।

সাধারণ ব্যাটের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভারী কয়েকটি ওজনের ব্যাট দিয়ে ড্রিল করাই আমি। এতে ব্যাট সুইং ভালো হয়, দ্রুত হয় এবং হাতের জোরও বাড়ে।

আর বিশেষ কোনো সরঞ্জাম কি আপনি ব্যবহার করেন?

উড: অবশ্যই, বেশ কিছুই আছে। এখানে সব আনতে পারিনি, কারণ ফ্লাইটে ওজনের সীমাবদ্ধতা আছে। শরীরের দুই পাশে বানজি ব্যবহার করাই, হাত ওভারলোড করি, ব্যাট ওভারলোড করি, ব্যাক হিপের জন্য বানজি ব্যবহার করি, নানা কিছু আছে। হার্লিং স্টিকস, ফ্লিকিং বল, নানা কিছু আছে।

আগে কিন্তু টেকনিকটা থাকতে হবে। সেখানে ঘাটতি থাকলে আগে তা নিয়ে কাজ করতে হয়। এরপর ওভারলোড দেওয়ার ব্যাপার আসে। এমনিতে জিমে ওরা ফিটনেস ট্রেনিং যা করে, সেটা তো করেই। আমি যোগ করি কার্যকারিতা, শটে পেশির ব্যবহার আরও বেশি করা যায় কীভাবে।

এখনকার ক্রিকেটাররা এমনিতেই জিম বা ফিটনেস ট্রেনিং অনেক করে। কিন্তু আপনার ধরনের জন্য তো আলাদা ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন পড়ার কথা?

উড: কিছু কিছু ড্রিল আমি যেগুলো করাই, সেসবে এমনিতেই ওয়ার্কআউট হয়ে যায়। এছাড়াও আলাদা কিছু তো লাগেই। আজকেই যেমন সিলেটের ছেলেদের জিম সেশনে আমি কয়েকটি জিনিস দেখিয়ে দিলাম যে কোন ধরনের কাজ করলে বাহু শক্ত হবে, হ্যান্ড স্পিড বাড়তে পারে। তবে ভারী ব্যাট, ভারী বলের ট্রেনিং করলে এমনিতেই অনেক কিছু হয়ে যায়।

কিন্তু এই ধরনের ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে, যেখানে দু-একদিন পরপরই ম্যাচ, প্র্যাকটিস সেশন খুব কম, সেখানে আপনি এসব নিয়ে কতটা কাজ করতে পারবেন?

উড: এটা বড় প্রশ্ন বটে। যেটুকু সময় মেলে, সেটুকুর মধ্যেই কাজ করতে হবে। এজন্যই অনেক বেশি কিছু নিয়ে নাড়াচাড়া করা যাবে না। আমাকে দ্রুত বুঝে উঠতে হবে, ওদের শক্তির জায়গা কোথায়। এরপর সেই শক্তির জায়গা আরও শাণিত করে তোলার চেষ্টা করতে হবে।

সমস্যা হলো, আগে যেটা বললাম, এই ছেলেরা সবাই জানে আমি পাওয়ার হিটিং কোচ এবং সবাই পাওয়ার হিটার হতে চায়। আমি ওদেরকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, “তোমরা নিজের মৌলিকত্বে থাকো, বাকিটা আমি দেখছি।”

যদি ওরা স্রেফ পাওয়ার হিটিং নিয়ে বিভোর থাকে, আসল কাজই তাহলে ভুলে যাবে। খোলা মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামতে হবে। ২০ বল খেললে সবগুলিই তো ছক্কা মারা সম্ভব নয়!

‘মাইন্ডসেট’ তাহলে এখানে বড় ভূমিকা রাখে?

উড: অনেক বড় ভূমিকা রাখে। অনেক ব্যাটসম্যানই যেমন, আগে থেকেই শট ঠিক করে রাখে। পূর্বকল্পিত শট খেলে। আমার কাছে এটা করা মানে, ওই ব্যাটসম্যানের হাতে বিকল্প কম। আপনি একজন টপক্লাস আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার, এটা কেন করতে হবে! আগে থেকেই ঠিক করে রাখলেন যে, অমুক জায়গা দিয়ে তমুক শট খেলবেন, বোলার বল করল অন্য জায়গায়, তার পরও কেন খেলতে হবে ওই শট! খোলা মন নিয়ে ব্যাটিং করুন।

আপনি স্যাম বিলিংস, কার্লোস ব্র্যাথওয়েট, লিয়াম লিভিংস্টোনের সঙ্গে কাজ করেছেন। লিভিংস্টোন তো এখন বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পাওয়ার হিটারদের একজন। তার এই পরিবর্তন সম্ভব হলো কিভাবে?

উড: আমি যখন ইংল্যান্ড লায়ন্সে (ইংল্যান্ড ‘এ’) কাজ করেছি, দুটি সিরিজে ওকে পেয়েছি। তখনও মেরে খেলত, তবে এলোমেলো ছিল। সব বলই উড়িয়ে মারতে চাইত। এখনও মারে, তবে এখন একটা মেথড আছে ওর। সেটি গড়ে তোলা নিয়েই আমরা কাজ করেছি। তার ক্ষেত্রেও রাসেলদের মতো ‘বেইজ’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেও পোক্ত শরীরের শক্তিশালী ছেলে।

লিয়ামের সহজাত প্রবৃত্তি দারুণ। মাইন্ডসেট ভালো। আমি এসবের ওপর কাজ করেছি। ওর সঙ্গে যেভাবে কাজ করেছি, এখানকার ছেলেদের সঙ্গে তা সম্ভব নয়।

সিলেট দলে দিন দুয়েকের অনুশীলন যা দেখলেন, স্থানীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সম্ভাব্য কাউকে চোখে পড়ল, যে পাওয়ার হিটার হয়ে উঠতে পারে?

উড: (একটু ভেবে) দারুণ কিছু ক্রিকেটার আমাদের আছে। তবে পাওয়ার হিটিংয়ের ক্ষেত্রে ওদেরকে স্মার্ট হতে হবে। গতকাল আমি স্রেফ ওদেরকে দেখলাম, আজকে কিছু কিছু পরামর্শ দেওয়া শুরু করলাম। ওদের ক্ষেত্রে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি রাখা যাবে না। নিজের সম্পর্কে জানতে হবে। অযথা গায়ের জোরে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে লাভ নেই। স্মার্ট হতে হবে।

এই দলেই বিদেশি যারা আছে, কলিন ইনগ্রাম যেমন, রবি বোপারা ওদের খেলাটা অনুসরণ করা যেতে পারে। ওরা স্মার্ট ব্যাটিং করে।

বিশাল শারীরিক আকৃতির না হয়েও কি পাওয়ার হিটিং করা যায় না? বিরাট কোহলি যেমন পারে কিংবা আরও অনেকে। নিজের খেলাকে সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত করতে হবে। এখানকার ছেলেরা বিপিএল খেলছে। অন্যান্য লিগ খেলতে হলে কি করতে হবে? নিজেদের বিকশিত করতে হবে। এখানেই নিজেদের এমনভাবে মেলে ধরতে হবে যেন অন্য লিগের দলগুলির নজর কাড়ে। খেলায় প্রভাব বিস্তারের পথ বের করতে হবে, দলের জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে হবে। স্কিল বাড়াতে হবে। আমি ওদের সহায়তা করতে পারি, যদি ওরা নিতে পারে।

এবি ডি ভিলিয়ার্স বা জস বাটলার কি বিশাল শরীরের? আপনি বলতে পারেন, ওরা জিনিয়াস। হ্যাঁ, তা বটে। কিন্তু ওরা তো নিজেদের খেলা বিকশিত করেছে বলেই এমন হয়ে উঠেছে! রাসেল-পোলার্ডরা গায়ের জোরে সব করছে, আপনি স্কিল-রিদম-পাওয়ার মিলিয়ে করুন! নিজেকে সেই জায়গায় নিয়ে যান।

আপনার কি মনে হয়, সিলেটের এই দলে বা বাংলাদেশ ক্রিকেটে কতটা পার্থক্য আপনি গড়তে পারবেন আপনার কোচিং দিয়ে?

উড: বিশ্বজুড়েই বেশির ভাগ ক্রিকেটার কমফোর্ট জোনের মধ্যে থাকতে পছন্দ করে। আমার কাজ, ওদেরকে সেখান থেকে বের করে আনা এবং ওদের সীমাকে চ্যালেঞ্জ করা। ওরা নিজেরাও জানে না যে, কতটা ভালো ওরা হতে পারে। আমার কাজ, ওদেরকে সেই সীমা ছাড়াতে সহায়তা করা। আমি যদি শতকরা ৩ ভাগ, ৫ ভাগ পার্থক্যও গড়তে পারি, তার মানে সেটা বিশাল কিছু।

দেখুন, একটা কথা বলতে পারি জোর দিয়ে, আমি যে কাজটা করি, বিশ্বক্রিকেটে আর কেউ করে না। আর কেউ না। লোকে আমারটা দেখে, নকল করে। আমার আপত্তি নেই, কিন্তু কাজটা বিপজ্জনক। কারণ পুরোপুরি না বুঝে নকল করা এবং অন্যকে সেটা বোঝাতে যাওয়া সবার জন্যই ক্ষতিকর। ওরা আমার ড্রিল দেখে, সেটাই নকল করে। কিন্তু তারা ড্রিলের গভীরে যেতে পারে না, এটার মূল ব্যাপার ধরতে পারে না।

এটা অনেকটা গণিতের মতো। না বুঝলে করার মানে নেই। আমার ড্রিলগুলিও একই, বুঝতে না পারলে এসব কোচিং করানো বিপজ্জনক।

আমার চেষ্টা থাকবে, এখানকার ছেলেদের ট্রেনিংয়ের ভিন্ন কিছু পথ শেখানো। এরপর আশা করি, ওরা এটা ধরে রাখবে এবং সামনে এগিয়ে যাবে। পারলে, তাদেরই লাভ হবে। যদি ভবিষ্যতে আমি আবার আসি, তাহলে আবার কাজ হবে!

আপনার ভবিষ্যৎ যদি বাংলাদেশ দলের সঙ্গে থাকে? টি-টোয়েন্টিতে ব্যর্থতার কারণে একজন পাওয়ার হিটিং কোচের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটে…

উড: পাওয়ার হিটিং কোচের প্রয়োজনীয়তা কিন্তু অনেক দলই অনুভব করছে এখন। খেলাটা দ্রুত বদলাচ্ছে। আমি এটাকে দারুণ ব্যাপার বলেই মনে করি। যে ব্যাপারটি উদ্ভাবন আমার হাত ধরে, সেটি এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত প্রায়।

বাংলাদেশ বা যে কোনো জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করতে পারলে দারুণ হবে। আমি যখন পাওয়ার হিটিং কোচকে স্পেশালাইজড করা নিয়ে কাজ শুরু করেছি, তখন থেকে স্বপ্ন দেখি, বিশ্বের শীর্ষ ফ্র্যাঞ্চাইজি দল, জাতীয় দলগুলোয় হিটিং কোচ থাকবে। আমি দেশে কাউন্টি ক্রিকেটে কাজ করি, বিগ ব্যাশে করি। এখন বিপিএলে এলাম। সামনে বিশ্বকাপে যদি কাজ করতে পারি, দারুণ হবে।