২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

চট্টগ্রামে বৃষ্টির বাগড়াতেও জমজমাট ঈদ বিনোদন

  • চট্টগ্রাম ব্যুরো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-08-13 23:47:03 BdST

দিনভর বৃষ্টি বাগড়া দিলেও বন্দর নগরীর প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটির কয়েকটা দিন কাটাতে ছুটে যাচ্ছে বিনোদনপ্রেমী মানুষ।

ঈদের পরের দিন মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, নেভাল, ফয়’স লেক, চিড়িয়াখানা, শিশু পার্কগুলো ছাড়াও পারকি, কাট্টলি, হালিশহর সমুদ্র সৈকত মুখর হয়ে উঠেছে মানুষের পদচারণায়; কর্ণফুলীর পাড়েও বেড়াতে যান অনেকে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে নেমেছে জনস্রোত। ঈদের ছুটি উপভোগে বাদ যায়নি নারিকেলতলা সমুদ্র সৈকতও। প্রায় সব সৈকতেই এখন  নানা বয়েসী মানুষের মিলনমেলা।

সৈকতে এসে কেউ মেতেছেন সমুদ্র স্নানে, কেউ উড়াচ্ছেন ঘুড়ি। কেউ  একটু অ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করতে চড়ছেন স্পিড বোটে। আবার অনেকে বেড়ানোর সাথে সাথে তাজা ইলিশ কিনে ফিরছেন বাড়িতে।

ঈদের আগের দিন ও পরের দিন ছাড়াও ১৫ অগাস্টের সরকারি ছুটির পরে রয়েছে দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি। সব মিলিয়ে রোববারের আগে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসার সম্ভাবণা ক্ষীণ।

ছুটির এই সময়ে ঢাকার বনানী থেকে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামে ঈদ করতে এসেছেন সাইদুর রহমান।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঈদের দিন কোরবানির পশু জবাই, স্বজনদের বাসায় বেড়ানোর মধ্যে দিয়ে সময় পার করলেও আজকে ছুটে এসেছেন কাট্টলি সৈকতের রানি রাসমনি ঘাটে।

সাইদুর বলেন, “ঈদের টানা ছুটিতে এবার চট্টগ্রামে এসেছি ভাইদের সাথে ঈদ করতে। অনেক বছর পর সবাইকে নিয়ে হয়েছে পারিবারিক মিলনমেলা।

“সব মিলিয়ে এবারের ঈদের আনন্দটা অনেক বেশি হচ্ছে। সকাল থেকে বৃষ্টির জন্য বাসা থেকে কয়েকবার প্রস্তুতি নিয়েও বের হতে পারিনি। বিকালের পর বৃষ্টি না হওয়ায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছি কাট্টলি বিচে।”

বৃষ্টি বেড়ানোতে বিঘ্ন ঘটালেও আটকাতে পারেনি সাইদুরের মতো আরও অনেককেই।

পাথরঘাটা থেকে স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে রাসমনি ঘাটে বেড়াতে এসেছেন মনির হোসেন। ভালো ইলিশ পেয়ে ২ হাজার আটশ টাকায় ৬টি কিনে নিলেন বলে জানালেন তিনি।

মাছের দাম নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মনির বলেন,  “ভালো মাছ দেখে কিনলাম। তবে বিক্রেতারা দাম হাঁকাচ্ছেন বেশি। বাজার দরের চেয়েও এখানে দাম বেশি মনে হচ্ছে।”

নগরীর রাসমনি ঘাটের আশেপাশে রয়েছে বেশকিছু জেলে পাড়া। সেখানকার লোকজন প্রতিদিন যায় সাগরে মাছ ধরতে। সকালে সাগরে গিয়ে মাছ ধরে নিয়ে এসে বিক্রি করেন ঘাটে। জেলেরা মাছ নিয়ে ঘাটে আসার সাথে সাথেই খাঁচি ভর্তি মাছ কিনে নেন সাধারণ লোকজন। আবার মাছ ব্যবসায়ীরাও জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে বিক্রি করেন ঘাটে। 

মাছের বাড়তি দামের কথা স্বীকার করলেন মাছ বিক্রেতা মো. ভূট্টো।

তিনি বলেন,  “আজ পূর্ণিমার জো চলছে। সাগরে মাছ ধরা পড়ছে বেশি। জেলেরা মাছ নিয়ে ঘাটে আসার আগেই দর্শনার্থীরা তাদের কাছ থেকে মাছ কিনে নেওয়ার জন্য দরদাম করতে শুরু করেছেন। যার কারণে জেলেরা মাছের দাম ধরছে বেশি। এজন্য আমাদেরও বেশি দামে মাছ কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে।” 

চট্টগ্রামের অন্যান্য সৈকতে মানুষজন সাগরে নামতে না পারলেও পতেঙ্গা সৈকতে সুবিধা আছে সমুদ্রে নামার। তাই এই সৈকতে গিয়ে মানুষের ভিড় বেশি দেখা গেল। অনেকেই মেতেছেন সমুদ্র স্নানে। আর অনেকে সৈকতে উড়াচ্ছেন ঘুড়ি।  

অতিরিক্ত দর্শনার্থীদের চাপ সামলাতে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে নেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে সাব-কন্ট্রোল রুম।

পতেঙ্গা থানার ওসি উৎপল বড়ুয়া বলেন, “এবার ঈদে লম্বা ছুটি হয়েছে। সেজন্য বিনোদনপ্রেমী লোকজন বেড়াতে যাচ্ছেন বিভিন্ন স্থানে।

“তবে বৃষ্টির কারণে মঙ্গলবার সকালে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে লোকজন কিছুটা কম হলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ভিড় বাড়ছে। এ ভিড় পরের দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে আমাদের ধারণা।”

যারা ঘুরতে এসেছেন তারা যে কোনো অভিযোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে জানাতে পারেন উল্লেখ করে ওসি বলেন, ”সাধারণ মানুষ যেন খুশি মনে ঘুরতে পারে তাই আমাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আশেপাশের দোকান ও স্পিড বোট চালকদেরও নির্দেশনা দিয়ে রাখা হয়েছে যেন কেউ অতিরিক্ত দাম না নেন।

“আমরা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে একটি অভিযোগ খাতা রেখেছি। কোনো দর্শনার্থীর অভিযোগ থাকলে তাকে থানায় যেতে হবে না। নিয়ন্ত্রণ কক্ষেই সে তার অভিযোগ জানাতে পারবেন।”

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে এসে ভিড়ে হারিয়ে ফেলছেন বন্ধু, ভাই কিংবা পরিবারের সদস্যটিকে এমন কয়েকটি ঘটনা জানা যায়।

পুলিশের স্থাপন করা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানানোর পর সেখান থেকে মাইকে কিছুক্ষণ পরপর ঘোষণা আসছে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির নাম ধরে।

সৈকতে বেড়াতে এসে সাথে থাকা শিশুদের সাবধানে রাখার পরামর্শও দেন পতেঙ্গা থানার ওসি উৎপল বড়ুয়া। 

তিনি বলেন, “আজকে (মঙ্গলবার) অন্তত পাঁচজন শিশুকে হারিয়ে ফেলেছেন বেড়াতে আসা অভিভাবকরা। আমরা মাইকিং করে তাদের খুঁজে নিয়ে পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছি।”

এছাড়া ইভটিজিং রোধেও সাদা পোশাকের পাশাপাশি নারী পুলিশ ও টুরিস্ট পুলিশ সদস্যরাও টহলে আছে বলে জানান ওসি উৎপল।

সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি চট্টগ্রামের ফয়’স লেক ও সি ওয়ার্ল্ডেও মানুষের আনাগোনা বেশ দেখা গেছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ফয়’স লেকে প্রবেশে নেওয়া হচ্ছে ৪০০ টাকা এবং সি ওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করতে নেওয়া হচ্ছে ৬০০ টাকা। তবে সি ওয়ার্ল্ডের পেছনের গেইট দিয়ে কেউ প্রবেশ করলে তাহলে তাকে গুনতে হবে ৪৫০ টাকা।

ফয়’স লেক হয়ে সি ওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করলে নৌকা ভ্রমণের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে আগত দর্শনার্থীদের। ফয়’স লেকে টিকেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি বিভিন্ন রাইডে চড়া যাবে।

এদিন টিকেট কেটে ফয়’স লেকে প্রবেশ করেছেন তিন হাজার ৮৩৫ জন দর্শনার্থী।

ফয়’স লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক পরিচালনাকারী সংস্থা কনকর্ডের সহকারী ব্যবস্থাপক (বিপণন) অভিজিত পাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,  “সকাল থেকে ফয়’স লেক ও সি ওয়ার্ল্ডে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেছে। বিকালের দিকে সি ওয়ার্ল্ডে নানা বয়েসী মানুষের চাপ বাড়ছে।”

সাধারণ সময়ে সাড়ে ৬টায় পার্ক বন্ধ করে ফেলা হলেও ঈদের ছুটিতে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা পার্কে ঘোরাফেরা করতে পারবেন বলে জানান তিনি।

আর সাতটা পর্যন্ত খোলা রাখা হয়েছে টিকেট কাউন্টার।

চট্টগ্রাম নগরীর ফয়'স লেক এলাকাতেই রয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। ঈদের ছুটিতে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে গিয়েছেন সেখানে।

চিড়িয়াখানার সাদা বাঘ, উট পাখি, এমু পাখি, জেব্রাসহ নানা প্রজাতির পাখি আকৃষ্ট করছে সাধারণ দর্শনার্থীদের।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. শাহাদাৎ হোসেন শুভ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,  “এবার বৃষ্টির কারণে দর্শনার্থীরা কম এসেছেন। গত ঈদে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার লোক সমাগম হলেও এবার তা কম হয়েছে।”

সকালে লোক সমাগম কম হলেও বিকালে তা বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি।

ঈদের পরদিন ৫০ টাকা করে টিকিট কেটে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার হাজার দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করেছে।