‘এইরকম হইলে তো না খায়া মরতে হইব’

  • মিঠুন চৌধুরী, চট্টগ্রাম ব্যুরো বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-03-26 15:45:54 BdST

নগরীর কাজীর দেউড়ি মোড়ে আলমগীর কালু খালি রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। রিকশা নিয়ে বেরিয়েছেন আনেক আগে, কিন্তু যাত্রী পাচ্ছিলেন না।

“রিকশা চালায়া চলি। জমানো টাকা তো নাই। ঘরে থাকলে খামু কী? তাই বাইর হইছি। কিন্তু ভাড়া পাইতেছি না। এইরকম হইলে তো না খায়া মরতে হইব।”

নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তারের মধ্যেমানুষজন ঘরবন্দী হয়ে পড়ায় আলমগীরের মতো চট্টগ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর এই একই চিন্তা।

যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত সব বন্ধ। হাটবাজারে নিত্যপণ্যের কিছু দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতাও কম। সব মিলিয়ে সুনসান শুধু পেটের দায়ে রাস্তায় বেরিয়েছেন কিছু মানুষ। নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলো উপার্জনের চিন্তায় শঙ্কিত। সরকারিভাবে তাদেরকে খাদ্য সহায়তা এখনও শুরু হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, দ্রুত নিম্ন আয়ের মানুষকে খাবার পৌঁছে দেওয়া উচিত।

বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর বহদ্দারহাট মোড়, জিইসি মোড়, খুলশী, লালখান বাজার, কাজীর দেউড়ি, এনায়েত বাজার, জামালখানসহ নগরীর বেশিরভাগ সড়ক ছিল কার্যত ফাঁকা।

রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিলেন প্রাইভেট কারের চালক বাচ্চু। স্কুল-অফিস সবকিছু বন্ধ হলেও মালিক ছুটি দেয়নি।তাই প্রতিদিনের মত মালিকের বাসায় হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন বাচ্চু। ঘষ্টাখানেক বসে থেকে তিনি ফিরছিলেন বাসায়।

বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার একটি গার্মেন্টে কাজ করেন খুলশী অপরুপা হাউজিং এলাকার বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন ও আঞ্জুমান আরা বেগম দম্পতি।

মোয়াজ্জেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিনদিনের ছুটি কারখানায়। বলেছে এই তিনদিন বাসা থেকে বের না হতে। তারপর আবার যেতে বলেছে। মাস প্রায় শেষের দিকে, কখন বেতন দিবে তা জানি না।

“এই মাসের শুরুতে বেতন পেয়ে বাজার করছিলাম। সেগুলোও প্রায় শেষের পথে। এরকম কতদিন চলবে বুঝতেছি না। খুব চিন্তায় আছি।”

অটোরিকশার চালক মো. কায়সারকে তার মালিক নিষেধ করেছেন গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হতে।

তিনি বলেন, “ঘরে দুই মেয়ে, এক ছেলে, মা আর বউ আছে। গাড়ি তো বাইর করি নাই। পকেটে অল্প কয়টা টাকা আছে। দুয়েকদিন টেনেটুনে চালান যাবে। তারপর কি করব কিছু বুঝতেছি না।”

জনসমাগমে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে বলে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা এসেছিল আগেই।

আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সোমবার সরকার ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সব অফিস-আদালতে ছুটি ঘোষণা করে।

এরপর মঙ্গলবার সড়ক, নৌ ও আকাশপথে সবধরনের যোগাযোগও বন্ধের ঘোষণা এলে ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মত কার্যত অবরুদ্ধ দশার মধ্যে পড়ে।

এরমধ্যে বুধবার স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী জানান, নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে-ফেরা’ কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা দেওয়া হবে।

পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জানান, গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ দেওয়া হবে।জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অফিস-আদালতে লম্বা ছুটির কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাসিন্দা অনেকেই বাড়ি চলে গেছেন। নগরীতে তাই মানুষের আনাগোনা কম দুইদিন ধরেই।

আর ছুটির প্রথম দিনেই নগরীর রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য। কোথাও দুয়েকটি ওষুধের দোকান খোলা আছে। করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সচেতনতা বিষয়ক মাইকিং করছিল স্থানীয় প্রশাসন।

এর মধ্যেই রিকশাচালক আনোয়ার সকালে রিকশা নিয়ে জিইসি মোড়ে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “ঘরে বউ, একটা বাচ্চা আর মা আছে। পুলিশ বলছে রিকশা নিয়ে বাসায় চলে যেতে। সকালে মাত্র ৬০ টাকা ভাড়া মারছি। এখন বাসায় যাইতেছি।”

এনায়েত বাজার মোড়ে আরেক রিকশাচালক সাদেক হোসেন বাবু বলেন, “ডেইলি নিজের খরচ ১০০ থেকে দেড়শ টাকা। পেটের দায়ে রাস্তায় নামছি ভাই। না বাইর হইলে খামু কি?

“কিন্তু ভাড়া নাই। কেউ মেডিকেলে যায়, কেউ বাজারে যায়। এরকম অল্প পেসেঞ্জার আছে। আর কোনো মানুষ তো বাইর হয় নাই।”

টিআইবি সনাক চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি আকতার কবির চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে করোনাভাইরাসের আতঙ্কের চেয়েও বড় আতঙ্ক কাজ না থাকা।

“পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার যদি কয়েক কোটি মানুষকে খাবার দিতে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না? আমাদের মহানগরগুলোতে বসবাসকারী শ্রমজীবী মানুষরা কেন একবেলা উপোস থাকবে? কেন তারা উদ্বিগ্ন থাকবে?”

তিনি বলেন, “সর্তকর্তার পাশাপাশি কেউ যেন না খেয়ে না থাকে সে ব্যবস্থা দ্রুত করা উচিত। তাদের হাতে অবিলম্বে দৈনন্দিন জীবনধারণের উপকরণ পৌঁছে দিতে হবে।”

ওয়ার্কার্স পার্টির চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহান বলেন, যেদিন থেকে ছুটি সেদিন থেকেই নিম্ন আয়ের মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী দরিদ্রদের খাবার দেওয়ার যে নির্দেশনা দিয়েছেন মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

“বাংলাদেশে এ ধরনের পরিস্থিতি এই প্রথম। দরিদ্র মানুষের খাবার নিশ্চিত করা না গেলে করোনাভাইরাস ঠেকানোর উদ্যোগ সফল হবে না।”

এ প্রসঙ্গে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, নগরীতে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে এবং উপজেলাগুলো স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় নিম্ন আয়ের মানুষদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।

“বরাদ্দ এসেছে। তবে বিতরণ এখনও শুরু হয়নি। ছুটি আজ মাত্র শুরু হল। প্রয়োজন বিবেচনা করে সহায়তা দেওয়া হবে। মাঠে থাকুন, দেখতে পাবেন।”