পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

ভাষার আকুতি নিঃশ্বাসের মত: মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা

  • চট্টগ্রাম ব্যুরো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-09-17 21:33:45 BdST

bdnews24

মাতৃভাষায় কথা বলতে না পারলে হৃদয়ে যে ক্ষরণ তৈরি হয়, মানুষের জন্য তার মায়ের ভাষা যে প্রশ্বাস বায়ুর মতই প্রাণদায়ী, সে কথা সকল ভাষার মানুষকে মনে করিয়ে দিলেন শৈশবে নিজের ভাষায় পড়ার সুযোগ না পাওয়া মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা।

শুক্রবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে নিজের আবেগ এভাবে তুলে ধরলেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকজয়ী এই গবেষক।

দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার চিত্র, মাতৃভাষায় শিক্ষা পরিস্থিতি, মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষার মত বিষয়ে গবেষণায় ভূমিকার জন্য চলতি বছর সরকার মথুরা বিকাশ ত্রিপুরাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকে ভূষিত করে।

সে উপলক্ষেই চট্টগ্রামের নাগরিক সংগঠন পিপলস ভয়েস তাকে সংবর্ধনা জানাতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

খাগড়াছড়ি জাবারং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা অনুষ্ঠানে বলেন, “মাতৃভাষায় যখন কথা বলতে পারি না, তখন মনে হয় যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। শৈশব থেকে মাতৃভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ পাইনি। শিক্ষার প্রয়োজনে অন্য একাধিক ভাষা শিখেছি। ভাষার আকুতি আমার নিঃশ্বাসের মত। মাতৃভাষায় বলতে না পারলে ভিতরে ক্ষরণ তৈরি হয়।” 

ভাষার জন্য বাংলার মানুষের রক্ত দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “সেই চেতনার সিঁড়ি বেয়ে স্বাধীন সার্বভৌম এই দেশ। আমরা গর্ববোধ করি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের জন্য। সারাবিশ্বের মানুষ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নিজ নিজ ভাষার গৌরব উদযাপন করে। এই স্বীকৃতি আমার জন্যে গর্বের। শুধু আমার মাতৃভাষা নয়, সকলের মাতৃভাষা নিয়ে কাজ করার দায়িত্ব তৈরি হয়েছে।”

অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার হাতে ক্রেস্ট ও প্রতিকৃতি তুলে দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শিরীন আখতার।

তিনি বলেন, “সব ভাষা রক্ষায় আমাদের একতাবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশে মিশ্র সংস্কৃতি। অনেক ভাষাভাষী লোক পাশাপাশি আছি। প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। বাংলাদেশের আপামর মানুষের মাতৃভাষা সংরক্ষিত হোক, চর্চা হোক এটাই আমরা চাই।”

তিনি বলেন, যদি একটি জনগোষ্ঠী নিজের মাতৃভাষা চর্চা করতে না পারে, তাহলে তারা এগিয়ে যেতে পারবে না।

“বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হলে ক্ষুদ্র মন নিয়ে নয়, সবাইকে নিয়ে এগোতে হবে। পাহাড়ের জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে এগিয়ে নিতে অবশ্যই আমাদেরকে কাজ করতে হবে। বাংলা ভাষাও অনেক সংগ্রাম করেছে। কোনো নৃ-গোষ্ঠী যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে আসে, তাদের ভাষা মূলধারায় ঠাঁই করে নেয়।”

কবি ও সাংবাদিক হাফিজ রশিদ খান বলেন, “আদিবাসীদের কাছে প্রকৃত আলো পৌঁছায় না। চুক্তি হলে মনে করি একটা বোঝাপড়া হলো। আমরা খুব হাততালি দিই। প্রকৃত পরিস্থিতি তা নয়। আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়েও নানা বাধার মুখে পড়েছি।

“ইউরোপীয় ভাবধারায় কথামালা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত সৌন্দর্য্য কখন আমাদের সামাজিক সৌন্দর্যে রূপ নেবে সে চেষ্টা করতে হবে। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা এককভাবে লড়াই করে যাচ্ছেন। আজকের আয়োজন তার প্রতি আমাদের অন্তরের অর্ঘ্য।” 

গবেষক শরীফ শমশির বলেন, “প্রতি ভাষায় একজন করে বিদ্যাসাগর থাকেন, যিনি নিজ মাতৃভাষার বর্ণমালা ও ভাষার ভিত্তি গড়ে দেন। ত্রিপুরা ভাষায় অন্যতম বিদ্যাসাগর মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা।”

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিপলস ভয়েসের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আতিকুর রহমান; সংবর্ধিত অতিথির জীবনী পাঠ করেন কাজী মুশফিকুস সালেহীন।

পিপলস ভয়েসের সভাপতি শরীফ চৌহানের সভাপতিত্বে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে লেখক-সাংবাদিক নজরুল কবীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিএম দিনময় রোয়াজা এবং চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের গ্রন্থাগার সম্পাদক মিন্টু চৌধুরী বক্তব্য দেন। 

চট্টগ্রাম মহানগর ত্রিপুরা কল্যাণ ফোরাম এবং ত্রিপুরা স্টুডেন্ডস ফোরাম বাংলাদেশ মেট্রোপলিটন শাখা অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত অতিথিকে ফুল দিয়ে সম্মান জানায়।