১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

সোনায় হেরফের হয়নি, হয়েছে ইংরেজি-বাংলায় ভুল: বাংলাদেশ ব্যাংক

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2018-07-17 19:45:55 BdST

bdnews24

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা সোনায় অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক রবিউল হোসেন এবং ভল্টের দায়িত্বে থাকা কারেন্সি অফিসার আওলাদ হোসেন চৌধুরী বলছেন, ভল্টে রক্ষিত সোনায় কোনো ধরনের হেরফের হয়নি; স্বর্ণকারের ভুলে ভাষার গণ্ডগোলে ৪০ হয়ে গেছে ‘এইটি’।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর যেভাবে ভল্টে সোনা রেখেছিল, তা সেভাবেই রয়েছে বলে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই দুই কর্মকর্তা।

আওলাদ বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রুটি বলতে যা আছে, নথিভুক্ত করার সময় ইংরেজি-বাংলার ভুল। এর বাইরে অন্য ত্রুটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই।”

এদিকে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বিষয়টি নিয়ে বুধবার মন্ত্রণালয়ে এক জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। বৈঠকে গভর্নরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যানসহ সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বুধবারের কার্যসূচিতে এই বৈঠকের খবর জানা যায়। অর্থমন্ত্রী বিদেশ থাকায় প্রতিমন্ত্রী এই উদ্যোগ নিয়েছেন।

দৈনিক প্রথম আলো ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ভুতুড়ে কাণ্ড’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর এই সংবাদ সম্মেলন ডাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধানের তথ্যের ভিত্তিতে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ৯৬৩ কেজি সোনা পরীক্ষা করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের সোনার চাকতি ও আংটির জায়গায় এখন আছে মিশ্র বা সংকর ধাতু। আর ২২ ক্যারেটের সোনা হয়ে গেছে ১৮ ক্যারেট।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এক বছরের বেশি সময় অনুসন্ধান করে তারা ওই অনিয়ম পেয়েছেন।

“বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, তারা বিষয়টি অনুসন্ধান করে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তি নিশ্চিত করবেন বলে আশা করছি।”

কিন্তু অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ সম্মেলনে আওলাদ বলেন, সোনার ক্যারেটের বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে ‘সঠিক বলা হয়নি’।

“শুল্ক গোয়েন্দারা আমাদের সোনা দেওয়ার সময় তা ২২ ক্যারেট বললেও আমরা পরিমাপ করে পাই ১৮ ক্যারেট। তারা যে যন্ত্রের সাহায্যে এই মান পেয়েছেন তা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকার কষ্টিপাথর দিয়ে সোনার মান যাচাই করেছেন। সেই সনদ অনুযায়ী সোনা ছিল ১৮ ক্যারেটের।”

আওলাদ বলছেন, ক্যারেটের ওই গড়মিলের বিষয়টি তারা চিঠি দিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগকে জানিয়েছিলেন। সেখানে আণবিক শক্তি কমিশনের মত তৃতীয় কোনো পক্ষকে দিয়ে ওই সোনার মান যাচাই করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে রাজি না হয়ে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ বিষয়টি ‘মেনে নিয়েছিল’।

“শুল্ক গোয়েন্দাদের দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে আমাদের চিঠি দেওয়া হয়। এর জবাব আমরা ১১ জুলাই লিখিতভাবে দিয়েছি।”

শুল্ক গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কাস্টম হাউসের গুদাম কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেন।

“বাংলাদেশ ব্যাংক তখন ওই চাকতি এবং আংটি যথাযথ ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ (১৯ দশমিক ২ ক্যারেট) বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়।

“কিন্তু দুই বছর পর শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শন দল ওই চাকতি ও আংটি পরীক্ষা করে তাতে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২ ক্যারেট) সোনা পায়। আংটিতে পায় ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ সোনা (৩ দশমিক ৬৩ ক্যারেট)। ধারণা করা হচ্ছে ভল্টে রাখার পর এগুলো পাল্টে ফেলা হয়েছে।

“প্রতিবেদন বলছে, ভল্টে থাকা সোনার চাকতি এবং আংটি পরীক্ষার পর দেখা গেল এগুলো সোনার নয়, অন্য ধাতুর মিশ্রনে তৈরি। এতে সরকারের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।”

এর জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ সম্মেলনে আওলাদ হোসেন বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের দেওয়া সোনা জমা রাখার সময় খাঁটি সোনা ৪০ শতাংশই ছিল।

“কিন্তু ইংরেজি বাংলার হেরফেরে সেটা ৮০ শতাংশ লিখে ভুলবশত নথিভুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত শখ জুয়েলার্সের স্বর্ণকার এই ভুলটি করেছিলেন।”

এ বিষয়ে নির্বাহী পরিচালক রবিউল বলেন, “পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'ছিল সোনা, হয়ে গেলো অন্য ধাতু' এটা মোটেই সঠিক নয়। যেই কর্মকর্তা আমাদের কাছে এই সোনা জমা রেখেছিলেন, তিনি আমাদের প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন এই লিখে- ‘যে সোনা জমা দেওয়া হয়েছিল তা ঠিক আছে, কোনো হেরফের হয়নি’।"

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কর্মকর্তা বলেন, সোনা কত শতাংশ খাঁটি তা নিয়ে এনবিআর চিঠি দেওয়ার পর তারা স্বর্ণকারকে জবাব দিতে বলেছিলেন।

“তিনি আমাদের জানিয়েছেন, সোনার ৪০ শতাংশ গুণগত মান পাওয়া গেলেও লেখার সময় 'ক্ল্যারিকাল মিসটেক' হয়ে ৪০ হয়েছে ৮০ শতাংশ।”

রবিউল বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে ছয় স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অটুট রয়েছে। চাইলেই কেউ প্রবেশ করতে পারে না।

“যদি স্বয়ং গভর্নরও যেতে চান, তাকে যথাযথ পাস ও অনুমোদন নিয়ে ঢুকতে হবে। যার ফলে ভল্টে রক্ষিত সম্পদের কোনো ধরনের হেরফের করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক শহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের আট সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সোনা রেখেছিলেন, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

“সেখানে সবার উপস্থিতিতেই প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের জন্য সব তথ্য উপাত্ত যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়।"

তিনি বলেন, “যে ধরনের অসামঞ্জস্যের কথা এসেছে… যদি বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে এ বিষয়টি নিয়ে তারা আবারও অনুসন্ধান করবেন, তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর প্রস্তুত রয়েছে।”