পেঁয়াজ নিয়ে ধুঁকছে ভারতও

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-11-16 22:19:55 BdST

বাংলাদেশে পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় যোগানদাতা ভারতেও এবারও এই খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা চলছে।

বৈরী আবহাওয়ায় এবার পেঁয়াজের উৎপাদন কমে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে তা ভারতের খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ক্রেতা অসন্তোষ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, এ বছরের প্রথম দিকে খরা এবং বর্ষা মৌসুমে অতি বৃষ্টিতে ভারতের পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রধান এলাকাগুলোতে এর চাষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য মতে, নয়া দিল্লির কাছে পেঁয়াজের বড় পাইকারিবাজার আজাদপুরে দুদিন আগে এক মণ পেঁয়াজের দাম ১৯০৮ রুপিতে উঠেছে, যা বছরের শুরুর দিকের দামের ৫০০ শতাংশ বেশি।

মুম্বাইয়ের সবজি বিক্রেতা শচীন গঙ্গাবানি বলেন, “দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। আমাদের ব্যবসাও একদম কমে গেছে। লোকজনের এক কেজির জায়গায় এখন এক পোয়া কিনছে।”

ভারতে বছরে দুই দফায় পেঁয়াজের চাষ হয়।কমোডিটিজ ডেটা ফার্ম মিনটেকের বিশ্লেষক রুতিকা গোধেকারের তথ্য মতে, তীব্র খরার কারণে এবার প্রথম দফার আবাদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদন ২০১৮ সালের অর্ধেকে নেমে এসেছে।

১৫ টন পচা পেঁয়াজ বের হল খাতুনগঞ্জের আড়ত থেকে  

“ভারতে পেঁয়াজের দাম চড়েছে এই ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে।”

দ্বিতীয় দফা চাষের পেঁয়াজ এখন তোলা হচ্ছে। এই দফায়ও ফসলটি ক্ষতির মুখে পড়েছে অতি বৃষ্টির কারণে।

গোধেকার বলছেন, আবাদ এবং উৎপাদন কম হওয়ার পাশাপাশি পেঁয়াজের মানও খারাপ হয়েছে।

এখনও বৃষ্টি চলতে থাকায় আগামী বছরের জন্য মানসম্পন্ন বীজ সংগ্রহ নিয়েই কৃষকরা চিন্তায় পড়েছেন বলে জানান তিনি।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে সেই সময় পেঁয়াজের চড়া দাম নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্য ভালো কোনো বিষয় নয়।

পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির জেরে ১৯৮০ সাল থেকে ভারতের একাধিক সরকারের পতন হয়েছে। ১৯৯৮ সালের স্থানীয় নির্বাচনে মোদীর দল বিজেপির পরাজয়ের পেছনেও পেঁয়াজ মূল্য বৃদ্ধি বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা হয়ে থাকে।

মূল্য বৃদ্ধির মুখে ভারত সরকার তার মজুদে থাকা ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ছে।

এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে তিন গুণ করে ভারত। তার কয়েক দিনের মাথায় পেঁয়াজ রপ্তানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মজুদের সীমাও বেধে দেওয়া হয়।

এরপরেও পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করে অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে ভারত সরকার।

এদিকে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার পর বাংলাদেশে এই পণ্যের দাম বেড়ে ৬০-৭০ টাকা থেকে এখন আড়াইশ টাকায় উঠেছে।

ভারতের নিষেধাজ্ঞা আসার পর অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সরকার রাজি করালেও এখনও তা ফলপ্রসূ হয়নি।

পেঁয়াজ সঙ্কটে কার কী দায়  

এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৮০২ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতিপত্র (আইপি) নেওয়া হলেও পেঁয়াজ এসেছে মাত্র ৬ হাজার ১৪১ টন। এস আলম গ্রুপ ৫৫ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিলেও এখনও তাদের কোনো পেঁয়াজ দেশে পৌঁছায়নি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে পেঁয়াজের মোট উৎপাদন ২৪ লাখ টন। বিভিন্ন কারণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ১৮ লাখ টনের মতো দেশি পেঁয়াজ টিকে থাকে। এর সঙ্গে বার্ষিক চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে ৯ থেকে ১০ লাখ টন আমদানি করতে হয়। অর্থাৎ দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৮ লাখ টন।

সেই চাহিদা পূরণে এবার ভারত থেকে মাত্র তিন লাখ টন পেঁয়াজ পাওয়া গেছে জানিয়ে বাণিজ্য সচিব জাফর উদ্দিন বলেছেন, “আমাদের নয় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। কিন্তু এর মধ্যে ভারত থেকে পেয়েছি মাত্র তিন লাখ টন। যেখানে ৯ লাখ টন পাওয়ার কথা সেখান থেকে যদি মাত্র তিন লাখ টন পাই তাহলে চলে কী করে?”

এই চাহিদা পূরণে অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানিতে না যাওয়ার পেছনে ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কার কথা বলেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের কথায় সায় দিয়েছেন বাণিজ্য সচিবও।  

“সবার ধারণা ছিল ভারত পূজার পর পর পেঁয়াজ ছেড়ে দেবে। ভারত পেঁয়াজ ছেড়ে দিলে ভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ এনে পোষানো যাবে না। সেই ভয়ে ব্যবসায়ীরা বড় আমদানিতে যায়নি,” শুক্রবার বলেন তিনি।