সঞ্চয়পত্রে ফিরছে সবাই, চড়ছে বিক্রি

  • আবদুর রহিম হারমাছি, প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-28 00:04:57 BdST

পুঁজিবাজারে দৈন্যদশা, ব্যাংক খাতে দুরবস্থার প্রেক্ষাপটে আবার চড়েছে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি।

চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা; এই অঙ্ক গত সাত মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

এর আগে গত বছরের জুলাই মাসে ২ হাজার ২১২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল।

অর্থনীতির গবেষক আহসান এইচ মনসুর বলছেন, আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে বেঁধে এবং ব্যাংক খাতের দুরবস্থার খবরে সবাই আবার ‘সবচেয়ে নিরাপদ’ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সঞ্চয়পত্রে মুখ ফিরিয়েছে।

ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার কম এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দার কারণে গত কয়েক বছর ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এতে সরকারের ঋণের বোঝাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছিল।

বিক্রির চাপ কমাতে গত বছরের ১ জুলাই থেকে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার উপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একইসঙ্গে এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার শর্ত আরোপসহ আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে কমতে শুরু করে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সঞ্চয়পত্র বিক্রির তথ্যে দেখা যায়-

>> চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ৭ হাজার ৬৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে।

>> অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিক্রি হয় ২ হাজার ২১২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

>> অগাস্টে বিক্রি হয় ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

>> সেপ্টেম্বরে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯৮৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

>> অক্টোবরে ৮২২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

>> নভেম্বরে নিট বিক্রি নেমে আসে ৩২০ কোটি ৬২ লাখ টাকায়।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ বাজেটের অন্যান্য খরচ মেটাতে গত এক দশকে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার যে প্রবণতা দেখা গেছে, বিক্রি কমে আসায় তার সঞ্চয়পত্রের উল্টো দিক দেখতে হয় সরকারকে।

যে টাকার সঞ্চয়পত্র সরকার বিক্রি করে, তার চেয়ে ৪০৮ কোটি ৪৪ টাকা বেশি খরচ হয়ে যায় সুদ-আসল পরিশোধে। অর্থাৎ ডিসেম্বরে নিট বিক্রি ৪০৮ কোটি ৪৪ টাকা ঋণাত্মক (-) হয়।

তবে ২০২০ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে এসে আবার উল্টে গেছে হিসাব-নিকাশ।

কেন আবার বাড়ছে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি- এ প্রশ্নের উত্তরে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খুবই স্বাভাবিক।

“এপ্রিল থেকে ব্যাংকের যে কোনো স্কিমের আমানতের সুদ হার হবে ৬ শতাংশ। বেশ কিছদিন ধরেই এই ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। শেয়ার বাজারের মন্দা তো লেগেই আছে। নানান খবরে ব্যাংকের প্রতিও আস্থা রাখতে পারছে মানুষ।

“কড়াকড়ি আরোপ করায় এবং মুনাফার উপর করের হার বাড়ায় অনেকেই সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এখন মানুষ যখন দেখছে, অন্য যে কোনো বিনিয়োগের চেয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে মুনাফা বেশি, ঝুঁকি নেই। সে কারণেই আবার সবাই সঞ্চয়পত্রই কিনছে।”

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ঠিক করেছিল সরকার। এর মধ্যে জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৭ হাজার ৬৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

বিক্রি কমায় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিতে না পেরে সরকার ব্যাংক থেকে প্রচুর ঋণ নিচ্ছিল। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার।

অথচ পুরো বছরে নেওয়ার কথা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়লে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমবে বলে জানান আহসান মনসুর।

আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়।

সঞ্চয়পত্র নিয়ে অধিদপ্তরের বক্তব্য

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সঞ্চয় অধিদপ্তর বলেছে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে মুনাফার হার কমানোর বিষয়ে নানামুখী বিভ্রান্তিকর ও অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য সম্বলিত সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে, যা এ খাতে বিনিয়োগকারী তথা সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

এ বিষয়ে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের বক্তব্য হচ্ছে-

>> অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত বিদ্যমান সঞ্চয় স্কিমসমূহের মুনাফার হার কমানো হয়নি। সঞ্চয়পত্রসমূহের মুনাফার হার যথাক্রমে একইরূপ (৫ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র: ১১.২৮%, ৩ মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্র: ১১.০৪%, পরিবার সঞ্চয়পত্র: ১১.৫২% ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র: ১১.৭৬%) বলবৎ রয়েছে।

>>  এছাড়া, অনিবাসী বাংলাদেশীদের জন্য বিদ্যমান ৩টি বন্ডের মুনাফার হারও কমানো হয়নি। অর্থাৎ ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ১২ শথাংশ, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড-৬ দশমিক ৫ শতাংশ বলবৎ রয়েছে।

>> বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সব ব্যাংক ঋণের সুদের হার একক অঙ্কে (৯ শতাংশ) নামিয়ে  আনার সরকারি অনুশাসনের ধারাবাহিকতায় গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন (১) ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক- সাধারণ হিসাব এবং (২) ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক- মেয়াদী হিসাবের মুনাফার হার কমানো হয়েছে।

তবে বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশের ডাকঘরগুলো অটোমেশন প্রক্রিয়ায় আনার পর আগামী ১৭ মার্চ থেকে ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদ আগের হারে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।