রিজার্ভ চুরি: মামলায় হারলো বাংলাদেশ ব্যাংক

  • নিউজ ডেস্ক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-03-23 15:38:52 BdST

bdnews24

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলা খারিজ হয়ে গেছে বলে খবর এসেছে ফিলিপিন্সের সংবাদমাধ্যমে।

ফিলিপিন্সের ইংরেজি সংবাদমাধ্যম ইনকোয়ারারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সিভিল মামলার অন্যতম বিবাদী সোলায়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোর মালিক কোম্পানি ব্লুমবেরি রিসোর্টস গ্রুপ সোমবার ফিলিপিন্সের স্টক এক্সচেঞ্জে এ তথ্য জানায়।

ব্লুমবেরি তাদের ঘোষণায় বলেছে, নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট গত ২০ মার্চ মামলা খারিজ করে রায় দেয়।

চার বছর আগে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশের রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের আশায় দায়ের করা ওই মামলায় রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) এবং ওই ব্যাংকের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ডজনখানেক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছিল।

বিবাদীরা কয়েক বছর ধরে ‘জটিল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে’ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় বলে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা ওই মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছি।

ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিবাদীদের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রের’ ওই অভিযোগ খারিজ করার পাশাপাশি আদালত বিদাদীদের েআনা একটি আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে।

বিবাদীদের ওই আবেদনে বলা হয়েছিল, এই মামলা পরিচালনার আইনি এখতিয়ার নিউ ইয়র্কের আদালতে নেই। সেই আবেদন খারিজ করে আদালত বলেছে, নিউ ইয়র্কে এ মামলা চলতে পারে।

এই রায়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “আরসিবিসি ব্যাংক ও জড়িত অন্যান্যদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি টেকনিক্যাল বিষয় বিবেচনায় ফেডারেল আদালতে বিচারের জন্য গ্রহণ করেনি। অর্থাৎ এ সিদ্ধান্তের ফলে আরসিবিসি, সোলায়ার, মাইডাস এবং অন্যান্য বিবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, চুরি, রূপান্তরের ষড়যন্ত্র এবং অন্যান্য অভিযোগগুলির বিষয়ে সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের পরিবর্তে নিউ ইয়র্ক স্টেট আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে।

“এক্ষেত্রে মামলাটি নিউ ইয়র্কের আদালতের বিচারিক এখতিয়ারভুক্ত প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসি এবং অন্যান্য বিবাদীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।”

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে (ফেড) রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়।

এর মধ্যে একটি মেসেজের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় একটি ‘ভুয়া’ এনজিওর নামে ২০ মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেওয়া হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।

বাকি চারটি মেসেজের মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেওয়া হয় ফিলিপিন্সের মাকাতি শহরে রিজল কমার্সিয়াল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায় ‘ভুয়া তথ্য’ দিয়ে খোলা চারটি অ্যাকাউন্টে।

অল্প সময়ের মধ্যে ওই অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়, ফিলরেম মানি রেমিটেন্স কোম্পানির মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রা পেসোর আকারে সেই অর্থ চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোর কাছে।

এর মধ্যে একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশ সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও বাকি অর্থ উদ্ধারে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। জুয়ার টেবিলে হাতবদল হয়ে ওই টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে, তারও কোনো হদিস মেলেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রিজার্ভের অর্থ চুরির কাজে ‘অজ্ঞাতনামা উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের’ সহায়তা নেয় আসামিরা। ‘নেস্টেগ’ ও ‘ম্যাকট্রাক’ এর মত ম্যালওয়্যার পাঠিয়ে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট নেটওয়ার্কে ঢোকার জন্য পথ বের করে। পরে নিউ ইয়র্ক ফেড থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়া হয় নিউ ইয়র্ক ও ফিলিপিন্সে আরসিবিসির অ্যাকাউন্টে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ওই অ্যাকাউন্টগুলোর ওপর আরসিবিসি এবং এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। কী ধরনের অপরাধ হচ্ছে জেনেও অ্যাকাউন্ট খোলা, বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর এবং পরে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়গুলো ঘটতে দিয়েছেন।”

ওই মামলা হওয়ার পর গতবছর ৬ মার্চ ফিলিপিন্সের সিভিল কোর্টে আরসিবিসির পাল্টা মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে। সাইবার চুরির ঘটনায় আরসিবিসির নাম জড়িয়ে ‘মানহানি’ করার অভিযোগে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ কোটি পেসো (১৯ লাখ ডলার) দাবি করা হয় সেখানে।

ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই সাইবার জালিয়াতির ঘটনা জানাজানি হলে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মানুষ বিষয়টি জানতে পারে ঘটনার এক মাস পর, ফিলিপিন্সের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে।

বিষয়টি চেপে রাখায় সমালোচনার মুখে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন আতিউর রহমান; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে আনা হয় বড় ধরনের রদবদল।

বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপিন্সে ঢোকার বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে দেশটির সিনেট কমিটি তদন্ত শুরু করে। ওই ঘটনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার পর আরসিবিসি তাদের শাখা ম্যানেজর দেগিতোকে বরখাস্ত করে।

আর ফিলিপিন্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা পাচার ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় ১ কোটি ৯১ লাখ ডলার জরিমানা করে আরসিবিসিকে।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশেও একটি মামলা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে দায়ের করা ওই মামলায় সরাসরি কাউকে আসামি করা হয়নি। তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ গত চার বছরেও আদালতে প্রতিবেদন দিতে পারেনি।