ঈদের আগে সব শ্রমিকের বেতন নিয়ে ‘অনিশ্চয়তা’

  • আবদুর রহিম হারমাছি, প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-19 01:39:47 BdST

bdnews24

করোনাভাইরাস সঙ্কটে শ্রমিকদের বেতন দিতে সরকার যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল করেছে, সেখান থেকে ঋণ নিয়ে ৮০ শতাংশ কারখানার মালিক শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের বেতন দিয়েছেন।

ঋণের জন্য আবেদন করা পোশাক কারখানার মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত ৯০ শতাংশের বেশি মালিক ইতোমধ্যে শ্রমিকদের বেতন দিয়েছেন।

ঈদের ছুটির আগেই সব কারখানার শ্রমিক বেতন পাবেন বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ নেতারা।

কিন্তু নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমই’র সদস্যভুক্ত অর্ধেক কারখানার মালিক এখনও শ্রমিকদের বেতন দিতে পারেননি।

ঈদের ছুটির আগে মাত্র দুই কর্মদিবসে সব কারখানার শ্রমিকরা বেতন পাবেন কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথাও জানিয়েছেন বিকেএমইএ নেতারা।

বিজিএমইএর সচিব মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে এপ্রিল মাসের বেতন দেওয়ার জন্য তাদের সংগঠনভুক্ত ১ হাজার ৬১৫ জন কারখানা মালিক আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে সোমবার পর্যন্ত ১ হাজার ৫০৯টি কারখানার শ্রমিকরা বেতন পেয়েছেন।

তবে ভিন্ন চিত্র বিকেএমইএ’র সদস্য কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে।

বিকেএমই’র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সোমবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে এপ্রিল মাসের বেতন দেওয়ার জন্য তাদের সংগঠনভুক্ত ৮৩৮ জন কারখানা মালিক আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে এখন পর্ষন্ত ৪৪০টি কারখানার শ্রমিক বেতন পেয়েছেন।

তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে ৩১২টি কারখানার মধ্যে ২১৫, ঢাকার আশাপাশে আশুলিয়া ও গাজীপুরে ৩৬০টি কারখানার মধ্যে ১৮০টি এবং চট্টগ্রামে ৮৬টি কারখানার মধ্যে ৪৫টি কারখানায় বেতন দেওয়া হয়েছে।

বাকি কারখানাগুলোর বেতন মঙ্গল ও বুধবারের মধ্যে দেওয়া সম্ভব হবে কি না-এ প্রশ্নের উত্তরে হাতেম বলেন, “সত্যি কথা বলতে কি অনিশ্চিত! বুঝতে পারছি না কী হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আমাদের দিক থেকে সব কাজ সম্পন্ন করে ব্যাংকগুলোতে জমা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো দেরি করছে, অনেক ব্যাংক শর্তের বাইরেও নানা প্রশ্ন তুলছে।

“মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরও বেশ চাপ পড়েছে। একসঙ্গে এত শ্রমিকের টাকা পাঠাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।”

সব মিলিয়ে ঈদের আগে সব শ্রমিকের বেতন পাওয়াটা এখন ‘অনিশ্চিত’ হয়ে পড়েছে বলে জানান হাতেম।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউনে দেশ, বাস-ট্রেন চলাচল বন্ধ, এর মধ্যে কারখানা খোলার খবরে হেঁটে ঢাকায় ফিরছেন পোশাক কর্মীরা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরায় শনিবার এমন দৃশ্য দেখা যায়। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউনে দেশ, বাস-ট্রেন চলাচল বন্ধ, এর মধ্যে কারখানা খোলার খবরে হেঁটে ঢাকায় ফিরছেন পোশাক কর্মীরা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরায় শনিবার এমন দৃশ্য দেখা যায়। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

শ্রমিকরা ঈদের বোনাস পাবেন কি না- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “বেতনই পরিশোধের বিষয়ই অনিশ্চত; বোনাসের বিষয়টি আরও অনিশ্চিত।”

তবে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বোনোসের বিষয়ে আশার কথা শুনিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “আমাদের সদস্যভুক্ত ৩৩টি কারখানার বোনাস ইতোমধ্যে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর বোনাস ঈদের ছুটির আগে দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, যে সব শ্রমিক এপ্রিল মাসে কাজে অনুপস্থিত ছিলেন তারা তাদের বেতনের ৬০ শতাংশ পাবেন। আর যারা ২৬ এপ্রিল সীমিত আকারে কারখানা খুলে দেওয়ার পর কাজ করেছেন তারা এই পাঁচ দিনের (২৬ থেকে ৩০ এপ্রিল) সম্পূর্ণ বেতন এবং বাকি ২৫ দিনের ৬০ শতাংশ বেতন পাবেন।

ঈদের বোনাস কারখানার মালিকরা তাদের নিজস্ব অর্থ থেকে দেবেন। প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বোনাসের জন্য কোনো অর্থ ঋণ দেওয়া হবে না।

প্যাকেজের নীতিমালা অনুযায়ী, পোশাক কারখানাগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলো ২ শতাংশ সহজ সুদে (সার্ভিস চার্জ) এই ঋণ দিচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণোদনা প্যকেজের অর্থ ইতোমধ্যে ছাড় করেছে।

পোশাক কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল বলে জানান তিনি।

মে ও জুন মাসের বেতন-ভাতার জন্য নতুন করে আবেদন করতে হবে জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, “সে ক্ষেত্রে যদি প্রণোদনা প্যাকেজের ৫ হাজার কোটি টাকায় না হয় সেটা সরকার বিবেচনা করবে।”

রপ্তানিমুখী পোশাক করাখানার শ্রমিকদের এপ্রিল, মে ও জুন মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার।

বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেওয়া করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশেও দেখা দেওয়ার পর এর বিস্তার রোধের পদক্ষেপে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রপ্তানিমুখী শিল্প বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পরে ২ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা ঘোষণা করে।

নীতিমালায় বলা হয়, যেসব কারখানা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করছে, তারাই এই তহবিলের অর্থ পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবে।

এই তহবিল থেকে ২ শতাংশ সুদে দুই বছরের জন্য ঋণ দেওয়া হবে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকে।

এই ঋণের অর্থ জোগাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। সেজন্য ব্যাংকগুলোকে অর্থ জোগাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তহবিল থেকে কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ তিন মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ঋণ নেওয়া যাবে। ব্যাংকগুলো ঋণের অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীর ব্যাংক অথবা মোবাইল ব্যাংক হিসাবে সরাসরি দেবে।

বিজিএমইএ’র মোট ২ হাজার ২৭৪ সদস্যের মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণের জন্য আবেদন করে ১ হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠান। তাদের সবাইকেই ঋণ আবেদনের সনদ দিয়েছে বিজিএমইএ।

অন্যদিকে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র ১ হাজারের বেশি সদস্যের মধ্যে আবেদন করেছে ৮৩৮টি প্রতিষ্ঠান। তারাও ব্যাংকের কাছে ঋণ আবেদনের সনদ পেয়েছে।

উৎপাদনের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ পণ্য রপ্তানি করছে এমন সচল প্রতিষ্ঠান এই প্যাকেজের আওতায় ঋণ পাবে।

৪৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পেতে কারখানা মালিকরা আবেদন করেছেন। ২ মে ছিল আবেদনের শেষ দিন।