যাচাই-বাছাইয়ের পর ‘সঠিক’ ব্যক্তির হাতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ‘ঈদ উপহার’

  • আবদুর রহিম হারমাছি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-23 02:08:34 BdST

bdnews24

কোভিড-১৯ মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ঈদ উপহার’ হিসেবে যে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা ঈদের দিনও পাবেন দরিদ্র মানুষ।

চারটি মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (এমএফএস) মাধ্যমে দেওয়া এই অর্থ শুক্রবার পর্যন্ত ৩০ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

প্রতিদিনই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নতুন তালিকা পাঠানো হচ্ছে এমএফএসগুলোর কাছে। সে তালিকা অনুযায়ী টাকা পৌঁছে দিচ্ছে তারা।

প্রথমে তালিকা নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় এখন তালিকা যাচাই-বাছাই করে ‘সঠিক দরিদ্র’ মানুষকে খুঁজে বের করার কাজটি করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি।

শুক্রবার পর্যন্ত বিটিআরসি ১১ লাখের সঠিক তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। শনিবার দুপুরের মধ্যে আরও ১৫ লাখের তালিকা পাঠানো হবে। এভাবে যতক্ষণ ৫০ লাখ না হবে ততক্ষণ তালিকা পাঠানো হবে।

বিটিআরসির এই তালিকা অনুযায়ী এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা পৌঁছে দিচ্ছে প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে।

বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র শুক্রবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুরোধ করার পর আমরা এই কাজটি করছি। আমরা খুবই চেষ্টা করছি যাতে ঈদের আগেই সবার হাতে টাকা যায়।”

বিটিআরসির কর্মকর্তারা রাত জেগে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবা নগদের মাধ্যমে ১৭ লাখ, বিকাশের মাধ্যমে ১৫ লাখ, রকেটের মাধ্যমে ১০ লাখ এবং শিওরক্যাশের মাধ্যমে ৮ লাখ পরিবারের কাছে এই টাকা পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

যেভাবে তালিকা আসছে তাতে ঈদের আগেই অধিকাংশ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর ‘ঈদ উপহার’ পেয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগে আমাদের কাছে ৫ লাখ ১৫ হাজারের তালিকা এসেছিল। বৃহস্পতিবার এসেছে ৭৮ হাজার ৮৮৬ জনের তালিকা।

“এদের সবার টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন তালিকা আসলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে। আজ আমরা জুমের মাধ্যমে অনলাইনে আমাদের সারা দেশের এজেন্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। সবাইকে বলেছি,  প্রয়োজনে ঈদের দিনও প্রধানমন্ত্রীর এই ঈদ উপহার সঠিক মানুষটির কাছে পৌঁছে দিতে হবে।”

ডাক বিভাগের প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ‘নগদ’। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ভালো উদ্যোগ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে নগদের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং এজেন্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিআরসির একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রথমে যে তালিকা করা হয়েছিল তাতে ২০ শতাংশ মানুষ এই সুবিধা পাওয়ার উপযুক্ত ছিলেন না। একই মোবাইল নম্বর বার বার ছিল। কারও নাম ও মোবাইল নম্বরের সঙ্গে আঙুলের ছাপ মিলতো না।

“সে কারণেই নতুন করে যাচাই-বাছাই করে তালিকা করতে হচ্ছে।”

এই নগদ টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র। একজন দুই বার বা একাধিক বার পাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

তালিকা নিয়ে জটিলতার কারণে পুরো কার্যক্রম এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দেখভাল করছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চারটি এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে নতুন গাইডলাইনও দেওয়া হয়েছে।

তাতে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের এনআইডি ডেটাবেজ থেকে এনআইডি/স্মার্ট আইডি পরীক্ষা করে এমএফএসগুলোকে সুবিধাভোগীর হাতে টাকা দিতে হবে।

যারা সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন ভাতা পান, যেমন- বেদে, গৃহিণী, হিজড়া, পথ শিশু, স্বামী পরিত্যক্তা, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, ইমাম, চা শ্রমিক, বস্তিবাসী, ভিক্ষুক, ভবঘুরে, বেকার- এরা প্রধানমন্ত্রীর এই ‘ঈদ উপহার’ পাবে না।

এছাড়া এমএফএসগুলোকে আরও কিছু শর্ত মেনে চলতে বলা হয়েছে নতুন নীতিমালায়।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউসকে কয়েকবার মোবাইলে ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। দুই বার এসএমএস পাঠিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সঠিক মানুষটির কাছে যেন টাকাটা যায় সেটি নিশ্চিত করার কারণেই নতুন করে তালিকা করা হচ্ছে। এখানে অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই, চেষ্টা করলেও লাভ হবে না। আর তালিকায় নাম থাকলেই কেউ নগদ টাকা পেয়ে যাবে, বিষয়টি এমনও নয়।

“একজন সুবিধাভোগীকে তিনটি উপায়ে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি সঠিক ব্যক্তি। প্রথম হচ্ছে তার জাতীয় পরিচয়পত্র, দ্বিতীয় হচ্ছে তার মোবাইল নম্বর এবং তৃতীয় হচ্ছে তার নাম। একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে পুরো কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই তিনটি তথ্যে গরমিল পাওয়া গেলে তার নাম বাদ পড়বে। এখানে কারও চেষ্টা বা তদবিরের সুযোগ থাকছে না।”

ঈদের আগে সবাই এই টাকা পাবেন কি না- এ প্রশ্নের উত্তরে ওই কর্মকর্তা বলেন, “সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। ঈদের দিনও দেওয়া হবে। কিছু বাকি থাকলে ঈদের পর দু-একদিনের মধ্যেই সব দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।”

গত ১৪ মে গণভবন থেকে বোতাম চেপে এই নগদ সহায়তা বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সুবিধাভোগীরা যাতে ঈদের আগে ওই অর্থ হাতে পান, তা নিশ্চিত করতে পরে চারটি মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নির্দেশনায় বলা হয়, এই নগদ সহায়তা দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরবরাহ করা সুবিধাভোগীদের তালিকা অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর (এনআইডি) যাচাই করে অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

সেই সঙ্গে নগদ সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য এজেন্ট পয়েন্টে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৫০ লাখ পরিবারকে এই নগদ সহায়তা দিতে সরকার ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতি পরিবারে চারজন সদস্য ধরে এই নগদ সহায়তার সুবিধা পাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ।

এই নগদ সহায়তা দিতে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, শিক্ষক এবং সমাজের ‘গণ্যমান্য ব্যক্তিদের’ সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করেছে।

রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক, পোল্ট্রি খামারের শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক ও হকারসহ নিম্ন আয়ের নানা পেশার মানুষের নাম এসেছে এই তালিকায়।

ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবা নগদের মাধ্যমে ১৭ লাখ, বিকাশের মাধ্যমে ১৫ লাখ, রকেটের মাধ্যমে ১০ লাখ এবং শিওরক্যাশের মাধ্যমে ৮ লাখ পরিবারের কাছে এই টাকা চলে যাবে।

টাকা পাঠানোর খরচও সরকার বহন করবে। ওই টাকা ক্যাশআউট করতে সুবিধাভোগীদের কোনো খরচ দিতে হবে না।

বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সরকারের কাছ থেকে যে তালিকা পাচিছ সেই তালিকা ধরে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর এবং নাম যাচাই-বাছাই করে  সঠিক ব্যক্তির কাছে এজেন্টের মাধমে টাকা পৌঁছে দিচ্ছি। এটা চলতে থাকবে, যখনই তালিকা আমাদের কাছে আসবে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি আমরা।”

বেসরকারি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এমএফএস প্রতিষ্ঠান ‘রকেট’।

ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমরা ৩ লাখ ৫ হাজারের তালিকা পেয়েছিলাম। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে সব কিছু মিলিয়ে ৬০ শতাংশ সঠিক মানুষকে টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের টাকা পাঠানোর কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে।

“আমাদের ১০ লাখ লোককে পৌঁছানোর যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেটা আসলে ঈদের আগে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না- সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তালিকা না আসলে আমাদের তো আর কিছু করার নেই।”