‘লেজেগোবরে’ অবস্থায় অর্থনীতি সচল হবে না: আহসান মনসুর

  • আবদুর রহিম হারমাছি, প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-30 23:59:34 BdST

bdnews24

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দুই মাস লকডাউন শেষে অর্থনীতির চাকা সচল করার জন্য এমন একটা সময় বিধিনিষেধ শিথিল করে সবকিছু খুলে যাচ্ছে, যখন দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অবস্থায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করা কতটা সম্ভব?  

অর্থনীতির গবেষক আহসান এইচ মনসুর বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অফিস, গণপরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করা হচ্ছে যে উদ্দেশ্যে, তা সফল না হয়ে উল্টো বিপদ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তার মতে, দুই মাসে লকডাউন যথাযথভাবে ‘কার্যকর করা যায়নি’ বলেই ভাইরাসের বিস্তার এখনও বাড়ছে।

সরকারের ভাষায় সেই সাধারণ ছুটি বা ঘরবন্দি দশা শেষে অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি গণপরিবহনও চালু হচ্ছে রোববার।

ঈদ সামনে রেখে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ই সরকার বেশ কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছিল। কারখানা, দোকান-পাট, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

এরপর গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা আসে, ৩১ মে রোববার থেকে অফিস খুলবে, বাস-লঞ্চ-ট্রেন-বিমান চলবে, খুলবে পুঁজিবাজার, ব্যাংকে লেনদেন হবে আগের মতোই। সেদিনই দেশে একদিনে সর্বাধিক কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের তথ্য দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

তারপর দিন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে রেকর্ড ২ হাজার ৫২৩ জন হয়। পরীক্ষা কম হওয়ায় শনিবার শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে, নতুন ১ হাজার ৭৬৪ জন শনাক্ত হয়েছে। তবে মৃত্যু হয়েছে ২৮ জনের, যা দেশে একদিনের হিসেবে সর্বাধিক।

ভাইরাস সংক্রমণের দিক থেকে নাজুক এই পরিস্থিতির মধ্যে এভাবে সব খোলার সিদ্ধান্তে মোটেই খুশি নন আহসান এইচ মনসুর।

শনিবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সরকার যত চেষ্টাই করুক না কেন, এখনকার এই লেজেগোবরে অবস্থা দিয়ে অর্থনীতি সচল করা যাবে না। কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অর্থনীতি সচল করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এসব খোলা হবে। ১৫ জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তবে ততদিনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অবস্থায় থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। কেননা এর আগে ‘লকডাউন’ও ঠিকভাবে করা যায়নি, যে কারণে ভাইরাস এখন ৬৪ জেলায়ই ছড়িয়ে পড়েছে।

বৈশ্বিক মহামারী আকার ধারণ করা কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত প্রথম রোগী বাংলাদেশে ধরা পড়েছিল গত ৮ মার্চ। রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়াতে লেগেছিল প্রায় এক মাস।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এক মাসের মধ্যে ৪ মে রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়, ততদিনে দোকান-পাট, কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত এসেছিল। এরপর এই মাসের বাকি দিনগুলোতে ধারাবাহিকভাবে রোগী বেড়ে ৪৪ হাজার ছাড়িয়েছে।

এ পরিস্থিতির মধ্যে সব কিছু খুলে দিলে অর্থনীতি সচল হবে কি না-এ প্রশ্নের উত্তরে আহসান এইচ মনসুর বলেন, “কী বলব আপনাকে…? আমি নিজেই আতঙ্কিত! খুব আতঙ্কিত। দেশের সব মানুষ আতঙ্কিত। আমরা কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি…? কিছুই বুঝতে পারছি না।

“ধনীরা সব দেশ থেকে পালাচ্ছে। এই ধনীরাই পোশাক কারখানা-মার্কেট খুলে দিয়ে সারা দেশে মহামারী ছড়িয়ে দিয়ে এখন নিজেরা বাঁচতে দেশ ছাড়ছে। আর ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মানুষ প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।”

এ বিষয়টিকে ‘খুবই দুঃখজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, “এই আতঙ্ক-ভয়ের মধ্যে অর্থনীতি সচল হবে কী করে? কে বিনিয়োগ করবে? কোথা থেকে বিনিয়োগ করবে? অর্থ পাবে কোথায়? আর কার জন্য কী পণ্য উৎপাদন করবে? কে সেই পণ্য কিনবে? কয়েক মাস ধরে কাজ-কর্ম নেই। টাকা পাবে কোথায়?

“আমার বিবেচনায়, এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে সব কিছু খুলে দিয়ে ৫০ শতাংশ অর্থনীতিও সচল করা যাবে না।”

দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসা আহসান মনসুর বলেন, “এই যে অর্ডার আছে, অর্ডার আছে বলে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হল। কিন্তু তাতে কী হল? এপ্রিলে মাত্র ৪০ কোটি ডলার পোশাক রপ্তানি করলাম আমরা। কয় টাকা এটা? ৩ হাজার কোটি টাকা। এই কয়েকটা টাকার জন্য কি বিপদটাই না ডেকে আনলাম আমরা। তার মাশুল দিতে হচ্ছে এখন গোটা দেশবাসীকে।

“পরিস্থিতি এতটাই খারাপের দিকে যাচ্ছে যে, এখন হয়ত আমাদের দেখতে হবে, দেশের কোটি কোটি মানুষ কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। লাখ লাখ মানুষকে আইসিইউতে রাখতে হচ্ছে। কিন্তু সেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কি আমাদের আছে? তাহলে কি সত্যিকারের মহামারীই আমাদের দেখতে হবে?”

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “চার মাস সময় পেয়েছি আমরা। খুব কম সময় না। কী করেছি আমরা? দুই মাস লকডাউনের নামে ছুটি কাটিয়েছি। কিছুই কি বন্ধ রাখতে পেরেছি? আমি মনে করি, এটা সরকারের একটা বিরাট ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায় সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে।

“আমি জোর দিয়ে বলছি, এই দুই মাস যদি আমরা সত্যিকারের লকডাউন করতে পারতাম তাহলে এতদিনে আমরা এই কোভিড-১৯ ভাইরাসকে আমাদের দেশ থেকে বিদায় করে দিয়ে সব কিছু নতুনভাবে শুরু করতে পারতাম। তাতে আমাদের অর্থনীতিও সচল হতে শুরু করত। সবচেয়ে বড় যে কাজটি হত সেটি হল দেশের মানুষের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক দূর হয়ে যেত। নতুন শক্তি সঞ্চার করে সবাই যে যার কাজে ঝাপিয়ে পড়ত।

“কিন্তু কী করলাম আমরা? একেবারে ‘লেজেগোবরে অবস্থা’ বানিয়ে ফেলেছি! গরু যেমন ভীষণ ভয় পেয়ে গেলে লেজ না তুলে গোবর ত্যাগ করে। গোবরমাখা লেজের তখন যে অবস্থা হয় আমাদের আবস্থা হয়েছে এখন সেটাই।”

পারিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেলে নতুন নতুন জটিলতা দেখা দেবে বলেও হুঁশিয়ার করছেন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারমান আহসান মনসুর।

তিনি বলেন, “শুধু কি অর্থনীতি? আর্থ-সামাজিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা দেবে অস্থিরতা-আস্থার অভাব। সরকারের ওপর তখন চাপ আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে ভয়াবহ এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি আমরা।

“এখন কী হচ্ছে? যাদের সামর্থ্য আছে তারা দেশ থেকে পালিয়ে যাবে। আর যাদের সামর্থ্য নাই তারা দেশে থাকবে; আর মরবে!”

আহসান মনসুরের ধারণা, আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত ভয়াবহ এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যেতে হবে। 

“আর তা হলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। অর্থনীতির ক্ষতি হয়ত তিন-চার অথবা পাঁচ বছর পর কাটিয়ে উঠা যাবে। মানুষের জীবন চলে গেলে সে ক্ষতি আমরা কীভাবে পূরণ করব?”

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু মহামারীর কারণে তাতে বড় ধাক্কা লাগবে বলে মনে করেন আহসান মনসুর।

“অর্থবছর শেষ হতে আর এক মাস বাকি। মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাসের প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। এপ্রিল, মে ও জুন-এই তিন মাস আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধই ছিল বলা যায়। সে হিসাবে জিডিপিতে এর বড় প্রভাব অবশ্যই পড়বে। তার চেয়েও বড় কথা, আগামী কয় বছর এই প্রভাব থাকবে সেটাই এখন বড় বিষয়।”

পরামর্শ

আহসান মনসুর বলেন, এই সংকট মোকাবেলা করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে মার্চ মাসের শুরুতেই তিনি কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন।

“সারা দেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ জোনে ভাগ করতে সরকারকে অনুরোধ করেছিলাম। আমি বলেছিলাম, রোড জোন অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ সব ধরনের কাজ বন্ধ থাকবে; একেবারে জরুরি অবস্থার মত। কোনো কিছু চলবে না, সবাই বাসায় থাকবে।

“হলুদ জোনে দেখে-শুনে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে অনুরোধ করেছিলাম। আর সবুজ জোনে মোটামুটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে বলেছিলাম।

কিন্তু সেরকম কিছু বাস্তবে যে হয়নি, সে কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যদি আমরা সেটা করতাম তাহলে হয়ত রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত কোভিড-১৯, সারা দেশে এতটা ছড়িয়ে যেত না। এক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হত।”

এখন তাহলে কী করা উচিৎ?

আহসান মনসুর বলেন, “এখন আমি আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে একটি অনুরোধ করতে চাই। আর সেটি হল, কোভিড-১৯ এর ‘ভ্যাকসিন’ যেটা খুব দ্রুতই আসবে বলে শোনা যাচ্ছে সেটা যেন বাংলাদেশের মানুষ সঙ্গে সঙ্গে পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

“আর এজন্য এখনই চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে সংকট আরও কিছু দিন থাকবে মনে হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যাবে না।

“চীনে কিন্তু সামলে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলোরও বেশ উন্নতি হয়েছে। ওই সব দেশের সহায়তা নিয়ে আমাদের এখানে যারা ভ্যাকসিন উৎপন্ন করে তাদের মধ্যে একটা অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপন করে দিতে হবে সরকারকে। ওই ভ্যাকসিনের জন্য দেশগুলো একেকটি নির্দিষ্ট অংকের কমিশন নেবে।”

এই কাজটি এখনই শুরু করার পরামর্শ দেন আহসান মনসুর।