মহামারীতে আয়হীন যৌনকর্মীরা ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কায়

  • নিউজ ডেস্ক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-06-06 11:13:06 BdST

bdnews24
মেলবোর্নের যৌনকর্মীরা পড়েছেন জীবিকার সঙ্কটে। ছবি: রয়টার্স

সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিধিনিষেধের আওতায় বন্ধ হয়েছে স্ট্রিপ ক্লাব আর যৌনপল্লী। তাতে বিশ্বজুড়ে রাতারাতি রোজগারের পথও হয়েছে বন্ধ যৌনকর্মীদের।

মহামারীর এই সময়ে আয় ও স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কায় যৌনকর্মীদের অনেকেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনলাইনে সেবা দিচ্ছেন। বাকিদের আর্থিক সহায়তা পেতে ছুটতে হচ্ছে দাতব্য সংস্থাগুলোর কাছে।

বিভিন্ন দেশের যৌনকর্মীদের দুর্ভোগ তুলে ধরা হয়েছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।

মেলবোর্নে গত ১০ বছর ধরে এসকর্টের কাজ করে খদ্দেরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এস্টেল লুকাস। কোভিড-১৯ মহামারী আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মে তার কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। খদ্দেরদের কাছে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলার এত দিনের চেষ্টা বিফলে যাবে বলে মনে হচ্ছে তার।   

“এটা বলাই যায় যে আমি আগামী ছয় মাস কোনো কাজ করতে না পারলে খদ্দেরদের অনেকেই আমাকে ভুলে যাবে।”

“খদ্দেরের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ হতে হয়, যা এই পরিস্থিতিতে সম্ভব হচ্ছে না।”

কোভিড-১৯ মহামারীর আগে গড়পড়তার চেয়ে বেশি আয় করতেন লুকাস। ভেবেছিলেন তাতে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের শহরতলিতে তার বাড়ির ঋণ শিগগিরই শোধ করতে পারবেন।

এখন বলতে গেলে তার আয় নেই। অনলাইনে এই ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করছেন। তবে কিন্তু এটা শারীরিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারবে না বলেও বুঝে গেছেন।

“আমি অনলাইনে ব্যবসাটা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু সবাই তো প্রযুক্তিতে পারদর্শী নয়। আমার অনেক খদ্দের তো স্মার্টফোনই ব্যবহার করতে জানেন না।”

অস্ট্রেলিয়ার অনেক জায়গায় রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে খোলা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হলেও যৌনপল্লী খোলার ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা নেই। এই অনিশ্চয়তা, আর খোদ করোনাভাইরাসের অনেক অজানা বিষয় নিয়ে অনেক যৌনকর্মী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

কোভিড-১৯ মহামারীতে যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তারা অস্ট্রেলিয়ার সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পাবেন। তবে এজন্য তাদের দেখাতে হবে যে তারা আয়কর দেন। কিন্তু নিবন্ধনহীন যৌনকর্মীদের পক্ষে তা দেখানো সম্ভব হবে না।

অধ্যাপক টিলা স্যান্ডার্স

অধ্যাপক টিলা স্যান্ডার্স

বিশ্বের অনেক দেশেই যৌনকর্মীরা এই সঙ্কটের মুখে আছে বলে জানালেন ইউনিভার্সিটি অফ লেস্টারের অপরাধতত্ত্বের অধ্যাপক টিলা স্যান্ডার্স।

“সরকার অধিকাংশ মানুষকেই সামাজিক সুরক্ষা দিতে সমর্থ হয়েছে, বিশেষ করে যাদের আত্ম-কর্মসংস্থান ব্যবস্থা ছিল। তবে যৌনকর্মীরা এসবের আওতায় পড়েনি।”

যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করছেন এমন সংগঠনগুলো এখন জরুরি তহবিলে সাহায্য করতে সবাইতে আহ্বান জানাচ্ছে।

লাস ভেগাস সেক্স ওয়ার্কার কালেকটিভ অনলাইনে এরই মধ্যে ১৫ হাজার ৬৮০ পাউন্ড যোগাড় করতে পেরেছে। ইতালিতে একটি সংগঠন যৌনকর্মীদের সহায়তায় ১৯ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করেছে।

অধ্যাপক স্যান্ডার্স জানান, এই অর্থে যৌনকর্মীরা বকেয়া বিল দিতে পারবে ও খাবার কেনার খরচ মেটাতে পারবে।

কোনো কোনো যৌনকর্মী বাধ্য হয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ায় জরিমানার মুখে পড়ার এবং ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।

স্যান্ডার্স বলেন, “উন্নয়নশীল দেশে যৌনকর্মীরা সাধারণত পুরো পরিবারের প্রধান অন্ন যোগানদাতা। এই পরিস্থিতি পুরো পরিবারকেই সঙ্কটে ফেলেছে।”

ইংলিশ কালেকটিভ অফ প্রস্টিটিউটসের নিকি অ্যাডাম বিবিসিকে বলেন, “যুক্তরাজ্যে অধিকাংশ যৌনকর্মীই একজন মা। যদি তারা কাজ চালিয়ে যান তাহলে বুঝতে হবে তারা অর্থের জন্য মরিয়া হয়ে আছেন।

অবশ্য কাজ করতে চাইলেও অনেক যৌনকর্মী এই সময় তা চালিয়ে যেতে পারছেন না।

বাংলাদেশে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর প্রবেশমুখে পুলিশ পাহারা বসিয়ে কোনো খদ্দের ঢুকতে দিচ্ছে না।

বিশ্বের বড় যৌনপল্লীগুলোর একটি এই দৌলতদিয়া যৌনপল্লী। টিনের চালার ঘর আর সরু গলির এই পল্লীতে ১ হাজার ৩০০ নারীর ও তাদের ৪০০ শিশুর বাস।

গত মার্চ থেকেই এই যৌনপল্লী বন্ধ রাখায় জরুরি পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন যৌনকর্মীরা। নির্ভর করছেন দাতব্য সংস্থাগুরোর দানের ওপর।

এই যৌনপল্লীর একজন নাজমা (ছদ্মনাম) বিবিসিকে বলেন, “আমরা এখন কাজ করতে পারছি না। আমাদের কোনো রোজগার নেই, এটা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার।”

দৌলতদিয়ার যৌনকর্মীরাও রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। ছবি: রয়টার্স

দৌলতদিয়ার যৌনকর্মীরাও রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। ছবি: রয়টার্স

নিজের গ্রামে বোনের কাছে থাকা তিন সন্তানের খরচ দিতে হয় নাজমার। ৩০ বছর আগে মাত্র সাত বছর বয়সে এই যৌনপল্লীতে আসেন তিনি। অর্থের প্রয়োজন থাকলেও এই মহামারীতে কাজ করার বিপদ নিয়েও শঙ্কিত নাজমা।

“যদি আমরা এ সময় কাজ করতে পারতামও, মানুষের জীবন তো ভাইরাসের সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিতে থাকতো। আমরা খদ্দেরের সঙ্গে বিছানায় যেতে ভয় পেতাম। আমরা তো জানি না কে আক্রান্ত হতে পারে।”

ঢাকার একজন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী শ্রাবন্তী হুদা জানান, বাংলাদেশের সরকার ও স্থানীয় সংস্থাগুলো কিছু জরুরি সহায়তা দিলেও তা সবার জন্য পর্যাপ্ত নয়। অনেক নারী কোনো কিছুই পায়নি।

“যে অনুদান দেওয়া হয়েছে সরকার থেকে তা দিয়ে সন্তানের জন্য এক প্যাকেট গুঁড়োদুধও কেনা যায় না।”

মে মাসের শুরুর দিকে বেসরকারিভাবে কিছু জরুরি সেবা বিতরণে কাজ করেছিলেন শ্রাবন্তী। যৌনপল্লীর ১ হাজার ৩০০ নিবন্ধিত নারীর হাতে কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য তুলে দেওয়া হয় তাদের পক্ষ থেকে।

তিনি বলেন, “এ সময় একজন নারী এসে জানান যে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইনসুলিন ও ডায়বেটিক ওষুধ জোগাড় করতে পারছেন না।

“আরেকজন নারী এসে বলেন, দুই মাস আগে লকডাউন শুরুর পর থেকে তিনি উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ কিনতে পারেননি।”

বিশ্বজুড়েই যৌনকর্মীরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার সঙ্কটে রয়েছে বলে জানান অধ্যাপক স্যান্ডার্স। যেখানে এইডস রোগী থাকায় অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের চাহিদা বেশি সেখানে এই সমস্যাও বেশি।

নাইরোবিতে উবার অ্যাপের মতো একটি অ্যাপ বানানোর কাজ করা একটি দলে কাজ করছেন অধ্যাপক স্যান্ডার্সও। এই অ্যাপ দিয়ে যৌনকর্মীরা জরুরি ওষুধ ঘরে বসেই পাবেন।

স্যান্ডার্স বলেন, “একটি পরিবহন সেবার মাধ্যমে এসব ওষুধ পৌঁছে যাবে যৌনকর্মীদের কাছে। তাদের কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না।”

দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর আরেক নারী জানান, যৌনপল্লীগুলো খুলেও দেওয়া হলেও আগের অবস্থা ফিরে আসতে অনেক সময় লাগবে।

“মানুষ ভয় পাচ্ছে যে আমাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হলে তারা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। আমরাও তাদের মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারি।”