মহামারীতে ৮৭% গরিব মানুষ খাদ্য-পুষ্টির সঙ্কটে: খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-07-16 18:04:22 BdST

bdnews24
করোনাভাইরাস সঙ্কটে নিম্ন আয়ের এমন অসংখ্য মানুষকে ত্রাণের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। (ফাইল ছবি)

করোনাভাইরাস মহামারীকালে দেশের গরিব মানুষের উপর জরিপ চালিয়ে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ দেখেছে, এই জনগোষ্ঠীর ৮৭ শতাংশই খাদ্য ও পুষ্টির সঙ্কটে রয়েছে।

‘দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির উপর কোভিড ১৯-এর প্রভাব’ শীর্ষক এই জরিপে ৯৮ শতাংশ গরিব মানুষের জীবন-যাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্রও এসেছে।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউনের কারণে বেশ কয়েক মাস গরিব মানুষের রোজগারের পর বন্ধ ছিল। বিধিনিষেধ শিথিলে সীমিত পরিসরে কাজ চললেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্কট কাটেনি।

তাদের নিয়ে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের জন্য জরিপটি পরিচালনা করেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ।

বৃহস্পতিবার সকালে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের ভার্চুয়াল এক আলোচনা সভায় তিনি জরিপের গবেষণাপত্রটি উপস্থাপনা করেন।

এই জরিপে দেশের ৮টি বিভাগের ৩৭টি জেলায় দৈবচয়ন পদ্ধতিতে, নির্দিষ্ট প্রশ্নমালার ভিত্তিতে অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ৮৩৪ জন উত্তরদাতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

নগর ও গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ ছিলেন নারী।

উত্তরদাতাদের মধ্যে রিকশা ও ভ্যানচালক, স্কুটার ও ট্যাক্সি ড্রাইভার, পরিবহন শ্রমিক, ছোট দোকানদার, ফেরিওয়ালা, নাপিত, বিউটি পার্লারের কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, খণ্ডকালীন গৃহকর্মী, ইটকল শ্রমিক, ছোট দোকানকর্মী, মালবাহী শ্রমিক, শিপিং ও ই-বাণিজ্য সরবরাহকারী শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক-এরকম নানা পেশার মানুষ ছিলেন। এদের বেশিরভাগই দিন এনে দিন খেয়ে বেঁচে থাকেন। এছাড়া ভিখারি, পথশিশু, প্রতিবন্ধী যারা প্রকৃত অর্থে বেকার, এমন উত্তরদাতাও ছিলেন।

নাজনীন বলেন, “জরিপ অনুযায়ী, দেশব্যাপী লকডাউন চলাকালে ৯৮ দশমিক ৩ শতাংশ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৮৭ শতাংশ দরিদ্র মানুষ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তির সমস্যায় পড়েছেন।”

জরিপে উঠে এসেছে, দরিদ্র পরিবারগুলোর পাঁচ শতাংশই দিনে মাত্র একবেলা খেয়েছেন। অথচ মহামারী শুরুর আগে উত্তরদাতাদের ৯১.৬ শতাংশ দিনে তিন বেলা এবং বাকিরা দু'বেলা খাবার খেতে পারতেন।

সব বিভাগেই দরিদ্র লোকেরা পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের তীব্র অভাবে ভুগছিলেন, যা তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকির সামনে ফেলে দিয়েছে। যদিও মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ এ সময় সাধারণ অসুস্থতায় ভুগেছেন বলে জানিয়েছেন।

তুলনামূলকভাবে ময়মনসিংহ ও সিলেটে খাবারের ঘাটতি বেশি ছিল বলে জরিপে দেখা গেছে। রংপুর অঞ্চলের দরিদ্ররা খাদ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুষ্টিকর খাদ্য সংকটে বেশি প্রভাব পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলে।

জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭ শতাংশ মানুষ তাদের পেশা পরিবর্তন করেছেন। তুলনামূলকভাবে সহজ বলে এদের বেশিরভাগই দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন। তবে বোরো ধান কাটার মৌসুম ছিল বলে কৃষি শ্রমিকরা সাধারণ ছুটি চলাকালীন কাজ পেয়েছেন।

জরিপে বলা হয়েছে, “করোনভাইরাসের সাথে সম্পর্কিত জীবিকার সাথে জড়িত দরিদ্র মানুষের আয়ের ক্ষতি হয়েছে। বেশিরভাগেরই ন্যূনতম সঞ্চয় না থাকায়, আয়ের এ সংকটকালে তাদের খাদ্য গ্রহণ এবং পুষ্টির অবস্থার উপর বাড়তি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।”

অবস্থার উন্নয়নে নাজনীন আহমেদ তার গবেষণাপত্রে বেশকিছু সুপারিশও তুলে ধরেন।

এগুলোর মধ্যে দরিদ্র মানুষের জরুরি খাদ্য সহায়তা সহজলভ্য করার জন্য বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ (নগদ সহায়তা বা অন্যান্য) বৃদ্ধি করা; বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাসহ নগদ অর্থ মোবাইল পরিসেবা ব্যবহার করে নিয়মিত সুবিধাভোগীদের কাছে প্রেরণ করা; দরিদ্র শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা; দরিদ্র মানুষের জন্য জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র, মধ্য ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোগের জন্য সরকার কর্তৃক ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজগুলি অবিলম্বে কার্যকর করা; কৃষির সরবরাহ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা; কোভিড-১৯ সম্পর্কিত স্বাস্থ্য সচেতনতা (মাস্ক ব্যবহার ও হাত ধোয়া) বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়েছে।

খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও পিকেএসএফের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে এ আলোচনা সভায় যোগ দেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমানারা খানুম। এতে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এস এম জুলফিকার আলী ও আইসিসিও কোঅপারেশন বাংলাদেশের কর্মসূচি প্রধান মো. আবুল কালাম আজাদ।

খাদ্য সচিব নাজমানারা বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ জরিপের ফলাফলকে মানতেই হবে যে, সকল মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা করোনাকালে সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় খাদ্য, বিশেষত চাল সরবরাহের দিকটি কঠোরভাবে নজরদারি করছে। যদিও শুধু চাল দিয়েই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।

“করোনা একটি নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাতে আরো মানুষ দারিদ্র্যে পতিত হতে পারে বলে আমরাও মনে করি। আমরা যে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজ এখনও করতে পারিনি সেটি একটি বড় সমস্যা। যেজন্য প্রধানমন্ত্রী ৫০ লক্ষ পরিবারের জন্য যে অর্থ সহায়তা প্রদানের কার্যক্রম উদ্বোধন করেছিলেন তা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। খাদ্য সহায়তার ক্ষেত্রে ১৫ লাখ উপকারভোগীর মধ্যে ৬ লাখ মানুষের সমস্যা রয়েছে, যা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। “

খাদ্য ও পুষ্টি সংকটের এ সময়ে সরকারের দরিদ্রদের সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি এক্ষেত্রে বেসরকারি খাত ও এনজিওদেরকেও যুক্ত করার প্রয়োজন বলে মনে করেন কাজী খলীকুজ্জমান।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশ এখন একটি জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এখন অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু হলেও অবস্থার উন্নতি যে খুব হয়েছে তা মনে হয় না।

আগামী দিনে আয়ের সুযোগ না বাড়লে দরিদ্র মানুষ খাদ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে আরো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে পতিত হবেন। টিকে থাকার জন্য মানুষের সুযোগগুলো কমে যাচ্ছে, এখন ধার দেয়ার মানুষও পাওয়া যাচ্ছে না। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম দিয়ে আমরা সকল দরিদ্র মানুষ তথা তাদের চাহিদাকে পূরণ করতে পারছি না। এজন্য দরিদ্র মানুষের একটি চলমান হালনাগাদ ডাটাবেজ থাকা দরকার। তাহলে খুব সহজেই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সহায়তাগুলো পৌঁছানো যাবে।”

এস এম জুলফিকার আলী বলেন, “এ জরিপে যে পাওয়া গেছে, সরকারি সহায়তা পেয়েছে অসহায় ও দরিদ্র শ্রেণির মাত্র অর্ধেক জনগোষ্ঠী, এ বিষয়টি নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে।”