পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

পাট থেকে রপ্তানি আয় বাড়ছেই

  • আবদুর রহিম হারমাছি, প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-08-06 19:16:59 BdST

করোনাভাইরাস মহামারীকালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হলেও পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে রপ্তানি আয় বাড়ছেই।  

নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি আয় করেছে বাংলাদেশ।

এই খাত থেকে এক মাসে ১০ কোটি ৩৫ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা গত অর্থবছরের জুলাই মাসের চেয়ে ৩৮ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি।

মহামারীর পর থেকে পাট পণ্য রপ্তানি বেড়ে যাওয়ার মধ্যে গত জুলাই মাসে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকলে উৎপাদন বন্ধ করে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে অবসরে পাঠায়।

বিজেএমসির আওতাধীন এই পাটকলগুলোতে উৎপাদিত চট, বস্তা, থলে বিদেশে রপ্তানি হত।

রপ্তানি বাড়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর অভাব অনুভব করছেন এই খাত সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ পাটপণ্য রপ্তানিকারক সমিতির (বিজেজিইএ) চেয়ারম্যান এম সাজ্জাদ হোসাইন সোহেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নে বলেন, “সেটা তো একটু পড়বেই।

“বিজেএমসি পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি করত। আমরাও তাদের কাছ থেকে নিয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতাম। তাই প্রথম দিকে একটু প্রভাব পড়বেই।”

তবে বেসরকারি পাটকলগুলো সক্রিয় হলে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করেন সোহেল।

“বেসরকারি পাটকলগুলো যদি এই জায়গাটা দ্রুত নিতে পারে তাহলে খুব বেশি সমস্যা হবে না। আবার সরকার বলছে, বন্ধ মিলগুলো পিপিপি’র মাধ্যমে দ্রুত চালু করা হবে। দেখা যাক কী হয়।”

মহামারীর সঙ্কটে রপ্তানিতে ধসেও ব্যতিক্রম শুধু পাট

মহামারীর সঙ্কটে রপ্তানিতে ধসেও ব্যতিক্রম শুধু পাট  

পাটকল বন্ধে কৃষকেরও ক্ষতি  

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) মঙ্গলবার যে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৩৯১ কোটি (৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে দেশ। এর মধ্যে ১০ কোটি ৩৫ লাখ ১০ হাজার ডলার এসেছে পাট ও পাট পণ্য রপ্তানি থেকে ।

সার্বিক হিসেবে পাট রপ্তানি থেকে আয় ৩ শতাংশের নিচে হলেও আগের বছরগুলোর তুলনায় এই অঙ্কে আশা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত মাসে পাটসুতা (জুট ইয়ার্ন) রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৬ শতাংশ। কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার; আয় বেড়েছে ৫৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ডলারের। আয় বেড়েছে ৪৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। এছাড়া পাটের তৈরি অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৮০ লাখ ডলারের।

পাটের তৈরি এসব পণ্য রপ্তানিও হয়। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

পাটের তৈরি এসব পণ্য রপ্তানিও হয়। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ মোট ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার আয় করেছে।

ওই অঙ্ক ছিল আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি এসেছিল ৭ শতাংশ।

গত অর্থবছরে পাটসুতা রপ্তানি থেকে ৫৬ কোটি ৪৬ লাখ ডলার আয় হয়েছিল। অর্থাৎ মোট রপ্তানি ৬৪ শতাংশই এসেছিল পাটসুতা রপ্তানি থেকে।

কাঁচাপাট রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১৩ কোটি ডলার। পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছিল ১০ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের।

এছাড়া পাটের তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল ১৯ কোটি ডলারের।

এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে চামড়াকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে পাট খাত।

বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জাহিদ মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিশ্বব্যাপী পাট পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এখন শুধু বস্তা, চট ও থলে নয়, পাটসুতাসহ পাটের তৈরি নানা ধরনের পণ্য বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হচ্ছে।

করিম জুট স্পিনার্স লিমিটেডের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “আমরা করিম জুট মিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাটের তৈরি একটি পণ্য রপ্তানি করি, যা দিয়ে বিএমডব্লিউ গাড়ির ড্যাশবোর্ড ও সিট তৈরি হয়। এছাড়া এয়ারক্রাফটের কার্পেট তৈরিতেও আমাদের এই পাট পণ্যটি ব্যবহার হয়।”

করিম জুট মিল গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৫০ কোটি টাকার পাট পণ্য রপ্তানি করেছে বলে জানান জাহিদ।

তিনি বলেন, “কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে পরিবেশের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় বিশ্বে পাট পণ্যের চাহিদা নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। এই সুযোগটি যদি আমরা নিতে পারি তাহলে আমাদের এ খাতের রপ্তানি অনেক বাড়বে।”

পাটপণ্য রপ্তানিকারক সমিতির চেয়ারম্যান সোহেল বলেন, পাট ও পাটপণ্য রপ্তানিতে কিন্তু এখন সুসময় চলছে। করোনাভাইরাসের কারণে গেল অর্থবছরে তৈরি পোশাক, চামড়া, হিমায়িত খাদ্যসহ অন্য বড় সব খাতের রপ্তানি আয়ে যেখানে ধস নেমেছিল, সেখানে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে।

অর্থবছরের শেষ তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) করোনাভাইরাসের ধাক্কা না লাগলে গত অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি ২৫ শতাংশের মতো বেড়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মতো ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যেত বলে মনে করেন সোহেল।

মনিকগঞ্জের ঘিওর হাটে সোনালী আঁশ পাটের বিকিকিনি। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

মনিকগঞ্জের ঘিওর হাটে সোনালী আঁশ পাটের বিকিকিনি। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করে এক হাজার ২৬ কোটি (১.০২ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ওই একবারই এ খাতের রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল।

সোহেল বলেন, “সার্বিকভাবে পাট খাতের জন্য ভালো সময়ই যাচ্ছে এখন। বিশ্ব বাজারে দামও বাড়ছে। সবমিলিয়ে পাট নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখছি আমরা।”

তিনি মনে করেন, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমলেও পাটপণ্যের চাহিদা কমবে না। খাদ্যের জন্য ফসল ফলাতেই হবে, আর সেই ফসল মোড়কজাত বা বস্তাবন্দি করতে পাটের থলে লাগবে।

“অস্ট্রেলিয়া থেকে এরইমধ্যে অর্ডার পেতে শুরু করেছি আমরা। আমার বিশ্বাস, পরিবেশের বিষয়টি সামনে আরও জোরালোভাবে সামনে আসবে। আর তাতে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়বে।”

কৃষি অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক এম আসাদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হয়নি। 

“আমাদের পাটের রপ্তানি বাজার বরাবরই ভালো ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজী বন্ধসহ একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমরা সেই বাজার ধরতে পারিনি।”

“এখন মহামারীর কারণে পাট ও পাট পণ্য রপ্তানির যে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেটা আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারব সেটাই এখন বড় বিষয়,” বলেন আসাদুজ্জামান।

আরও খবর

পাওনা বুঝিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত  

শ্রমিক বিদায়ে পাটকল সমস্যার সমাধান হবে না: স্কপ  

ক্ষতির দায় বিজেএমসির ওপর চাপালেন পাটমন্ত্রী  

পাটকলে লোকসানের জন্য কার শাস্তি হয়েছে, প্রশ্ন বাম জোটের