প্রয়োজনে সীমিত পরিমাণে চাল আমদানির পরিকল্পনা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-08-09 19:18:02 BdST

bdnews24

আউশ ও আমনের উৎপাদনসহ সার্বিক পরিস্থিতি প্রতিদিন নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে সীমিত পরিমাণে চাল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

রোববার বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-ব্রি আয়োজিত ‘কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা : বাংলাদেশ কী চাল ঘাটতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনায় কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ও খাদ্যমন্ত্রী সাধন মজুমদার একথা জানান।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, “আউশ-আমনে চলমান বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও আমনের উৎপাদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে সীমিত আকারে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে।

“যদি আমনের ফলন ভালো না হয়, বন্যা প্রলম্বিত হয়, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ঠিকমতো কাটিয়ে ওঠা না যায়, তবে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, শেষ দিকে পোকার আক্রমনে আউশের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে তিনি সন্দিহান। বন্যার কারণে আমনের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত না হলে তখন চাল আমদানির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তুত রয়েছে।

এবার বন্যায় দেশের ৩৪ জেলায় দেড় লাখ হেক্টরেরও বেশি ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। প্রথম ধাপে ২৮টি জেলার প্লাবিত এলাকায় প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি নিরূপণ করা হলেও বন্যা এখনও চলায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব এখনও করতে পারেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষিতে চলমান বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সব ধরনের কার্যক্রম চলছে। আমন মৌসুমে উৎপাদন বাড়াতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, আগামী রবি মৌসুমের সব ফসলে উৎপাদন বাড়াতে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এবার বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও মিল মালিকরা চুক্তিমূল্যে সরকারকে চাল সরবরাহ করছিলেন না। চালকল মালিকরা সরকারকে চাল না দিলে প্রয়োজনে আমদানি করা হবে বলে বেশ কিছু দিন ধরেই হুঁশিয়ার করে আসছিলেন খাদ্যমন্ত্রী।

চলতি বছর সাড়ে ১৯ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে সরকার। সে অনুযায়ী ৩৬ টাকা কেজি দরে মিলারদের কাছ থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল, ৩৫ টাকা কেজিতে দেড় লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ২৬ টাকা কেজিতে আট লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান কেনার কথা ছিল।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতিতে কিছু মিল মালিক ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ করতে গড়িমসি করে সরকারের কাছে চালের দাম বাড়ানোর দাবি তোলেন। অনেক মিল মালিক চুক্তিমূল্যে চাল না দেওয়ায় মজুদের লক্ষ্য পূরণ করা নিয়ে বিপাকে পড়ে সরকার।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত বছর জুন পর্যন্ত সরকারিভাবে চালের মজুদ ছিল ১২ দশমিক ৫৬ লাখ টন, যা এবার কমে ৯ দশমিক ২৭ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।

খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি তুলে ধরে আমদানির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমানারা খানুম আলোচনায় বলেন, “এখন আমাদের চাল ও গম মিলিয়ে এখন ১২ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন মজুদ রয়েছে। তা দিয়ে আমাদের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চলবে। কিন্তু এরপর আমাদের গুদাম খালি হয়ে যাবে।

“তখন আমাদের আরও ১০ লাখ মেট্রিক টনের মতো ঘাটতি দেখা যাবে। সে ঘাটতি পূরণের জন্য আমাদের ১৫ লাখ মেট্রিক টনের মতো আমদানি করতে হবে।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, এ বছর আউশ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ৪৪ হাজার ৮শ মেট্রিক টন। অন্যদিকে ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন আবাদের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৫৬ লাখ মেট্রিক টন।

সেমিনারে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ব্রির মহাপরিচালক শাহজাহান কবীর মূল প্রবন্ধে জানান, বোরো চাষিরা এ বছর গড়ে বিঘা প্রতি ১ হাজার ৬০৪ টাকা লাভ করেছেন, যেখানে গত বছর তাদের লোকসান গুণতে হয়েছিল। এবছর কর্তনকালীন সময়ে এবং ১ থেকে ২ মাসের মধ্যে কৃষক গতবছরের তুলনায় কম পরিমাণ ধান বাজারে বিক্রি করেছেন।

তিনি বলেন, একদিকে ভবিষ্যৎ খাদ্য ঘাটতির শঙ্কা অন্যদিকে ধানের দাম বেশি থাকায় অল্প ধান বেচেই কৃষক কৃষি ও পরিবারের খরচ বহন করতে পেরেছেন। অধিকন্তু বেশি দামের আশায় ধান মজুদ করার প্রবণতা বাড়তে দেখা গিয়েছে।

ব্রির গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ধানের ক্ষেত্রে গতবছর জুন মাসে কৃষকের গোলায় মোট মজুদের ২০ শতাংশ ধান ছিল, যা এবছর একই সময়ে প্রায় ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

চাল উৎপাদন খরচের ক্ষেত্রে মওসুমে বিদ্যমান সর্বনিম্ন দামে মিল মালিকরা যে ধান ক্রয় করেন সেটি থেকে কেজি প্রতি চাল উৎপাদনে ২৭ দশমিক ৮৬ টাকা খরচ হয়। অন্যদিকে সর্বোচ্চ দাম বিবেচনায় দেখা যায় কেজি প্রতি চাল উৎপাদনে ৩৫ দশমিক ৮০ টাকা খরচ হয়। গড় বিবেচনায় এক কেজি চাল উৎপাদনে ৩২ দশমিক ৩৪ টাকা ব্যয় হয়।

খাদ্যৗমন্ত্রী সাধন বলেন, “আমদানির আগে আমাদেরকে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থকেই গুরুত্ব দিতে হবে। এই দুইয়ের মাঝে সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে সরকারি মজুদ সঠিক পরিমাণ রাখতে হবে।”

তিনি বলেন, “৯৮ শতাংশ মিলার চুক্তি করেছে। তারা অগাস্ট মাস পর্যন্ত চাল দেবে। আমরা আশা করছি, প্রতি কেজিতে ১ টাকা লাভ হলেও মিলাররা চুক্তি অনুযায়ী আমাদের সময়মতো চাল সরবরাহ করবেন।

“তবে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, ন্যাশনাল সিকিউরিটির জন্য গুদামে যে পরিমাণ চাল মজুদ থাকার কথা, তা আছে কি না। যদি তা না থাকে, তবে মিলাররা সুযোগ নেবে; তারা চালের দাম বাড়িয়ে দেবে। সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।”