লেনদেন ভারসাম্যে ৩.৩ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত

  • আবদুর রহিম হারমাছি, প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-09-28 00:14:23 BdST

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩০ কোটি ডলার।

গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল মাত্র ২০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৪৮৪ কোটি ৯০ লাখ (প্রায় ৫ বিলিয়ন) ডলারের বড় ঘাটতি নিয়ে

তার আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল আরও বেশি, ৫১০ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৯৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

ব্যালেন্স অফ পেমেন্টে এই বড় উদ্বৃত্তের খবরে ‘খুশি’ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি আগেই বলেছিলাম, বাংলাদেশের অর্থনীতি মহামারীর ধকল সামলে ঘুঁরে দাড়িয়েছে। তার প্রমাণ অর্থবছরের দুই মাসেই ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এই উদ্বৃত্ত।”

তার দাবি, কেবল ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতির সবগুলো সূচকই এখন ‘ভালো অবস্থায়’ আছে। মহামারী শুরুর পরপরই এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার ২০টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা এবং এর পরপরই শিল্পোৎপাদনে ফেরার ‘সময়োপযোগী’ পদক্ষেপেই তা সম্ভব হয়েছে।

“পুরো দেশ এখন এর সুফল পাচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্র ভালো করছে। সব সূচকই ঊর্ধ্বমুখী। কোনো দেশেই এ অবস্থা খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

এই মহামারীর মধ্যেও প্রবাসীরা যে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স দেশে পাঠাচ্ছেন, তা ‘অবিশ্বাস্য রকম অবাক করেছে’ অর্থমন্ত্রীকে।

“চলতি অর্থবছরের দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি রেমিটেন্স তারা দেশে পাঠিয়েছেন। সবাই যখন আশঙ্কা করেছিল, মহামারীর ধাক্কায় রেমিটেন্স একেবারে কমে যাবে, কিন্তু তা না হয়ে উল্টো বেশি বেশি রেমিটেন্স দেশে পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এতে আমরা সাহস পাচ্ছি। মহামারী মোকাবেলা করাও আমাদের সহজ হচ্ছে।”

অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ২৪ দিনে ১৮১ কোটি ৩১ লাখ ডলার পঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত অগাস্ট মাসের পুরো সময়ের প্রায় সমান। অগাস্ট মাসে ১৯৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

অর্থমন্ত্রী তথ্য দেন, জুলাই-অগাস্ট সময়ে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় আড়াই শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

তবে ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের এই বড় উদ্বৃত্তি কতটা টেকসই হবে, সে বিষয়ে সংশয় আছে গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরের।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, রেমিটেন্স এবং রপ্তানি আয়ে ভর করে ব্যালেন্স অফ পেমেন্টে বড় উদ্বৃত্তি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় কম থাকার বিষয়টিও ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় এ খাতে আমদানি ব্যয় কম হচ্ছে। এছাড়া ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য আমদানিও কম হচ্ছে।

আহসান মনসুর বলেন, “এ কথা ঠিক যে, এই কঠিন সময়ে ব্যালেন্স অফ পেমেন্টে বড় উদ্বৃত্ত থাকা আমাদের অর্থনীতির জন্য স্বস্তির। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই উদ্বৃত্ত কতদিন থাকবে। দুই মাসের তথ্য দিয়ে বোঝা যাবে না। আরও দুই-তিন মাস গেলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।”

করোনাভাইরাসের অভিঘাতে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে বেসামাল, সেখানে বাংলাদেশের রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারা কতদিন থাকবে, সেটাই তার দৃষ্টিতে একটি ‘বড় প্রশ্ন’।

“অনেক প্রবাসী কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেকে তার শেষ সঞ্চয়টুকু দেশে পাঠাচ্ছেন। সে কারণে রেমিটেন্স বেড়েছে। আগামী দিনগুলোতে রেমিটেন্সে খুব ভালো খবর আসবে বলে আমার কাছে মনে হয় না। রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই শঙ্কা আমার।

“অন্যদিকে আমদানি খরচ বেড়ে গেলে এই উদ্বৃত্ত থাকবে না। রিজার্ভও এই উচ্চতায় থাকবে না। তাই সার্বিক বিবেচনায়, আত্মতুষ্টিতে না ভুগে এখন বিচক্ষণতার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। আর এক্ষেত্রে আমি রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে বলবো,” বলেন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মনসুর।

[নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় চলতি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাব উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হল, নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়]

বাণিজ্য ঘাটতি তিন ভাগের এক ভাগ

বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।

প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ হয়েছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) তা কমে ৬৯ কোটি ৮০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।

গত বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ২০৫ কোটি ডলার।

জুলাই-অগাস্ট- দুই মাসে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৭৬৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করেছে। আর আমদানিতে ব্যয় করেছে ৭৪৩ কোটি ২০ লাখ ডলার।

এ হিসাবেই জুলাই-অগাস্ট সময়ে পণ্য বাণিজ্যে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

এই দুই মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। আর আমদানি ব্যয় কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ।

সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতিও কমেছে। গত বছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে এ খাতের ঘাটতি ছিল ৫০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আর এ বছরের একই সময়ে তা কমে ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।

মূলত বীমা, ভ্রমণ ইত্যাদি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়।

রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি ৫০ শতাংশ

জুলাই-অগাস্ট সময়ে ৪৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত বছর এই দুই মাসে পাঠিয়েছিলেন ৩০৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই মাসে রেমিটেন্সে এতো বেশি প্রবৃদ্ধি কখনই হয়নি।

সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও বড় উদ্বৃত্ত

সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও (ওভারঅল ব্যালেন্স) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে গত অর্থবছর শেষ হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে ২৪৭ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে। অথচ গত বছরের জুলাইয়ে এক্ষেত্রে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।

আর্থিক হিসাবে ঘাটতি

আর্থিক হিসাবে (ফাইনানশিয়াল অ্যাকাউন্ট) প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে গত অর্থবছর শেষ হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ১৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ১০ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

আহসান মনসুর বলেন, করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে গত অর্থবছরের শেষ দিকে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার মোটা অংকের ঋণের কারণে আর্থিক হিসাবে বেশ ভালো উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশি ঋণ-সহায়তা তেমন না আসায় এই ঘাটতি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ বাংলাদেশে এসেছে ৫১ কোটি ডলার। গত বছরের এই দুই মাসে এসেছিল ৭৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

শতাংশ হিসাবে এই দুই মাসে বিদেশি ঋণ-সহায়তা কমেছে ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

এফডিআই কমেছে ২৪.৭%

জুলাই-অগাস্ট সময়ে ৩৬ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাংলাদেশে এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এ হিসাবে দুই মাসে এফডিআই কমেছে ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসে তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার পর যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটাকেই নিট এফডিআই বলা হয়।

 

আরও পড়ুন

মহামারীকালে লেনদেন ভারসাম্যে বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে অর্থবছর শুরু  

বাণিজ্য ঘাটতি ১৮ বিলিয়ন ডলার