লেনদেন ভারসাম্যে ৪৩২ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত

  • প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-01-28 10:49:04 BdST

bdnews24
করোনাভাইরাস মহামারীকালে সঙ্কট কাটিয়ে প্রায় পুরোপুরি সচল হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি: সুমন বাবু

মহামারীর মধ্যেও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩২ কোটি ২০ লাখ ডলার।

জুলাই-নভেম্বর সময়ে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪০১ কোটি ১০ লাখ (৪.০১ বিলিয়ন) ডলার। আর প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ৩৫৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে লেনদেন ভারসাম্যে কোনো উদ্বৃত্ত ছিল না; বরং ১৬৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঘাটতি ছিল।

মহামারীর কারণে আমদানি কমায় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফনে এই বড় উদ্বৃত্ত হয়েছে বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

তবে গত দুই মাস ধরে আমদানিতে গতি আসায় এবং রপ্তানি আয়ের ধীরগতির কারণে লেনদেন বড় উদ্বৃত্ত ধরে রাখা কঠিন হবে বলে তিনি মনে করছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আহসান মনসুর বলেন, “বহু প্রত্যাশিত টিকাদান শুরু হয়ে গেছে। সবার মধ্যে এক ধরনের সাহস আসতে শুরু করেছে। সব কিছু ঠিকমত চললে অর্থনীতিতে গতি আসবে বলে মনে হচ্ছে। তখন আমদানি বাড়লে হয়ত এই বড় উদ্বৃত্ত থাকবে না। তবে রেমিটেন্সের পাশপাশি যদি রপ্তানি বাড়ে তাহলে উদ্বৃত্ত নিয়েই অর্থবছর শেষ হবে।”

নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় চলতি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাব উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হল, নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৪৮৪ কোটি ৯০ লাখ (প্রায় ৫ বিলিয়ন) ডলারের বড় ঘাটতি নিয়ে।

তার আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল আরও বেশি, ৫১০ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৯৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে

প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ করেছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে অর্থাৎ জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তা কমে ৬৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৮২২ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

এই ছয় মাসে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ এক হাজার ৮৭৬ কোটি ১০ লাখ ডলার আয় করেছে। আর আমদানিতে ব্যয় করেছে দুই হাজার ৫২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

এই সময়ে রপ্তানি আয় বেড়েছে দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর আমদানি ব্যয় কমেছে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।

সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতিও কমছে

গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সেবা খাতে ঘাটতি ছিল ১৬৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর এ বছরের একই সময়ে তা কমে ৮৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।

মূলত বীমা, ভ্রমণ ইত্যাদি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়।

রেমিটেন্সে উল্লম্ফন অব্যাহত

অর্থবছরের ছয় মাসে এক হাজার ৩২৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত বছর এই ছয় মাসে পাঠিয়েছিলেন ৯৬৮ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের মত নতুন বছরের শুরুতেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।

২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের ২১ দিনে (১ থেকে ২১ জানুয়ারি) ১৪৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।

সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে বড় উদ্বৃত্ত

সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালেন্স) উদ্বৃত্ত রয়েছে আরও বেশি। অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

২০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ হয়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ৬১৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে।

গত বছরের এই ছয় মাসে মাত্র ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।

আর্থিক হিসাবেও উদ্বৃত্ত

আর্থিক হিসাবেও (ফাইনানশিয়াল অ্যাকাউন্ট) উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

অর্থবছরের তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৭৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের ঘাটতি ছিল। জুলাই-নভেম্বর সময়ে তা ৯৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্তে চলে আসে। ছয় মাসে সেই উদ্বৃত্ত বেড়ে হয়েছে ২২০ কোটি ১০ লাখ ডলার।

গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ২০৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।

বিদেশি ঋণ-সহায়তা বেড়েছে ১২%

চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ বাংলাদেশে এসেছে ২৮৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত বছরের এই ছয় মাসে এসেছিল ২৫৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

শতকরা হিসাবে এই ছয় মাসে বিদেশি ঋণ-সহায়তা বেড়েছে ১২ দশমিক ০৮ শতাংশ।

আহসান মনসুর বলেন, করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার মোটা অংকের ঋণের কারণে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

এফডিআই কমেছে ৮%

ঋণ-সহায়তা বাড়লেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে।

জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ১৫৫কোটি ৩০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ। গত বছরের একই সময়ে পেয়েছিল ১৬৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এই ছয় মাসে এফডিআই কমেছে ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

এই সময়ে নিট এফডিআই এসেছে ৪৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৫৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

এ হিসাবে নিট এফডিআই কমেছে ২১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।