পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

বিনিয়োগবান্ধব নীতির কারণেই রপ্তানিতে বিস্ময়কর ভিয়েতনাম: রেহমান সোবহান

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-09-17 22:07:41 BdST

বিনিয়োগ আকর্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ এবং নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সুবিধা ও নীতির কারণেই ভিয়েতনাম রপ্তানি বাণিজ্যে ‘বিস্ময়কর’ সাফল্য পেয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

শুক্রবার ‘রপ্তানিতে ভিয়েতনামের দুর্দান্ত এগিয়ে যাওয়া: বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বাংলাদেশের ‘দূরদর্শী অর্থনৈতিক কূটনীতি’ জোরদার করতে হবে। জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সারা বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে।

“এসব ক্ষেত্রে সফল একটি রাষ্ট্র ভিয়েতনাম। এ দেশটি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কীভাবে তারা বাণিজ্য ও বিনিয়োগে এগিয়ে গেল, কেন বাংলাদেশ পারল না।”

ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করে রেহমান সোবহান বলেন, ৩০ বছর আগেও অর্থনীতির প্রায় সকল সূচকে ভিয়েতনামের চেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।

সময়মত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ না করায় বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ভিয়েতনামের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে বলেন মন্তব্য করেন তিনি।

রেহমান সোবহান বলেন, “এই সময়ের সরকারগুলোর কাছে বার বার সুযোগ এলেও দক্ষতা, বিচক্ষণতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাবে সেসব সুযোগ কাজ লাগাতে পারেনি।”

তিনি বলেন, ১৯৯০ সালের পর বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সরকারগুলো পেয়েছিল।

“কোরিয়ান কোম্পানি ইয়াংওয়ান এখন পর্যন্ত তাদের জমির মালিকানা বুঝে পায়নি। ১৯৯৬ সাল থেকে চেষ্টা করছে তারা।

“স্যামসাং কেন বাংলাদেশ থেকে ভিয়েতনামে চলে গেল? এসব প্রশ্নের জবাব জানা খুব দরকার। স্যামসাংয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা অন্য উদ্যোক্তাদেরও এদেশে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।”

ওই সময়টায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা নীতিমালাও করা হয়নি মন্তব্য করে অনুষ্ঠানের সম্মানীয় অতিথি অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, “এমনকি বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ আনতে কাজ করেনি।”

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, ফাইল ছবি

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, ফাইল ছবি

তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রথমে বিনিয়োগ করে ইয়াংওয়ান। তারা স্যামসাংকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য নিয়ে এসেছিল।

“কিন্তু সহযোগিতা না পেয়ে সেই বিনিয়োগ চলে গেল ভিয়েতনামে। ওই বিনিয়োগ দিয়েই ভিয়েতনামে ইলেকট্রনিকস পণ্যের রপ্তানির গতি ব্যাপকভাব বেড়ে যায়।”

পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশ সেই প্রথম বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল জানিয়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, “এই ব্যর্থতা থেকে বড় ধরনের সুযোগ হারিয়েছে বাংলাদেশ।”

২০১০ সালে মনমোহন সিংয়ের সময়ে ভারতের সঙ্গে শুল্কমুক্ত রপ্তানি চুক্তির সুযোগগুলোও বাংলাদেশ ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছে না বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জিএসপি সুবিধা বাতিল করেছে কত আগে, কিন্তু আদৌ তা ফিরিয়ে আনার জন্য তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না।

“অথচ ভিয়েতনাম একটি সমাজতান্ত্রিক ধারার এবং বেশি ইংরেজি না জানা দেশ হয়েও তাদের মেধা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানি সুবিধা আদায় করেছে। ইউরোপের সঙ্গে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার চুক্তি করেছে। অথচ আমরা তা এখনো করতে পারিনি।”

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান অনুষ্ঠানে বলেন, “হাজার বছর ধরে আমরা অন্যদের দ্বারা শাসিত হয়ে আসছি। তাই শাসন ব্যবস্থা ও নীতিমালা গ্রহণে আমাদের অদক্ষতা থাকতে পারে।

“তবে সুশাসনে তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে এটা আমাদের কাছে অন্যরকম মনে হয়। দে আর ওয়ান পার্টি স্টেট। এক দলের দেশ। বাংলাদেশের রাজনীতি তা নয়।”

তিনি বলেন, ভিয়েতনামের অনেক কিছুর সঙ্গে বাংলাদেশে মিল নেই। তারপরও আলোচনা থেকে উঠে আসা বিভিন্ন সুপারিশ এবং পরামর্শ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) আয়োজনে এ ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংস্থার চেয়ারম্যান ড. জায়দি সাত্তার।

পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ তার মূল প্রবন্ধে ভিয়েতনাম এবং বাংলাদেশের তুলনামূলক অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরেন।

তিনি জানান, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৩২০ ডলার, ভিয়েতনামের ছিল মাত্র ১৩০ ডলার। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের আয় দাঁড়ায় ১৯৪০ ডলার, আর ভিয়েতনামের ২৫৯০ ডলার।

ওই সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, আর ভিয়েতনামের ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে এসে ভিয়েতনামের হয়েছে ২৬১ বিলিয়ন ডলার আর বাংলাদেশের হয়েছে ৩০২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

১৯৯০ সালে ভিয়েতনামের ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় ২০১৯ সালে হয়েছে প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

ভিয়েতনামে ১৯৯০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ, বাংলাদেশের ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৯ সালের চিত্র হচ্ছে ভিয়েতনামে দারিদ্র্যের হার নেমে এসেছে ১ দশমিক ৯ শতাংশে আর বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার রয়েছে গেছে ৯ দশমিক ২ শতাংশে।

এমসিসিআই সভাপতি নিহাদ কবীর বলেন, “কোনো উদ্যোক্তা কেন বাংলাদেশ ছাড়ল সরকার কখনো তো জানতে চায় না। উদ্যোক্তাদের কী সমস্যা, তারা কী সহযোগিতা চায় তা কেউ জানতে চায়নি।

“বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক সত্যেও কেন বিদেশি উদ্যোক্তারা এদেশে বিনিয়োগ না করে ভিয়েতনামে যাচ্ছে? এর কারণ বের করা উচিত।”

বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মানব সম্পদের দুর্বলতার কথা তুলে ধরে উৎপদানশীলতা ও দক্ষতার ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন এই ব্যবসায়ী।

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, “বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে। যেমন ভিয়েতনামের কাস্টমস থেকে পণ্য ক্লিয়ার করতে সময় লাগে ২-৩ ঘন্টা, আর বাংলাদেশে ২-৩ সপ্তাহ।”  

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন- বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি রুবানা হক বলেন, “রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য দরকার। এমনকি পোশাকের খাতের মধ্যেই বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন।

“এখনো পাঁচটি পণ্য নির্ভর এই খাত। ম্যান মেইড ফাইবারের বিভিন্ন পণ্যে বৈচিত্র্য আনা যায়। পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি সেবা সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মনযোগ বাড়ানো দরকার।”