পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

বাংলাদেশের দরকার ‘জলবায়ু দূতিয়ালি’

  • মঈনুল হক চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-10-18 01:00:47 BdST

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ঠেকাতে উন্নত দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রত্যাশার ব্যবধান ঘোচানোর চেষ্টা এবারও হয়ে উঠতে পারে আসন্ন গ্লাসগো সম্মেলনের মূল বিষয়।

এবারের সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ? বৈশ্বিক বিতর্ক ও মত পার্থক্য, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেছেন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের স্বাধীন কারিগরি উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ন্ত্রণে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোয় হতে যাচ্ছে কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ-কপ এর ২৬তম সম্মেলন, যা কপ ২৬ নামেই পরিচিত।

সম্মেলনকে সামনে রেখে ড. আহসান বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আলাপকে নিছক আলাপ মনে করবার কোনো কারণ নেই। এটা একেবারেই দূতিয়ালি এবং এটা হতে হবে বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ।

নানা কারণে কপ ২৬ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও এবারের সম্মেলন ঘিয়ে এই পর্যন্ত আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি হওয়ার আভাস না দেখে হতাশ এই গবেষক। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আরও উচ্চকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের আরও সরব হওয়ার উপরও জোর দিচ্ছেন আহসান।

কপ ২৬ কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ?  

গুরুত্ব কতটা?

আহসান আহমেদ বলেন, “গুরুত্বটা গত কয়েকটি বছরের তুলনায় একটু ভিন্ন। প্রতি বছরই ভিন্ন ভিন্ন ইস্যু থাকে। এবছর কয়েকটি ইস্যু রয়েছে যেগুলো অমীমাংসিত ছিল। ফলে আলোচনাটা একটা গভীর পর্যায়ে পৌঁছেছে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝড়ের মতো দুর্যোগ বাড়ছে বাংলাদেশে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝড়ের মতো দুর্যোগ বাড়ছে বাংলাদেশে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর এক ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে এই সম্মেলন ঘিরে, আবার উন্নত দেশগুলো সার্বিক একটা কাঠামোর ভেতরে থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলছে।

“কিন্তু সেটা নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে। ফলে সেটা নিয়ে সঙ্কট তৈরি হয়েছে। গ্লাসগোতে প্রাধান্য পেতে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি বিষয়। মোটা দাগে চারটি বিষয়। কিন্তু মূল প্রতিপাদ্য আসলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নির্ধারণ।”

প্যারিস চুক্তির ধারাবাহিকতা তুলে ধরে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, মূলত কার্বন নির্গমন কমানো নিয়ে কথা হচ্ছে, যেটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ। এ কার্বনঘটিত যৌগগুলোর ব্যাপারে উন্নত অর্থনীতির দেশ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এগোতে চাইছে।

“সারাবিশ্ব একত্রিত হয়ে ঐকমত্য হয় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করার চেষ্টা করব। কিন্তু আমরা মাঝখানে যেটা জেনেছি, খুব নিরাশার গল্প। আইপিসিসি (জাতিসংঘ গঠিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল) আমাদের নির্গমনের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে বলেছে, অতি দ্রুত এবং অতি দ্রুতটাও আরও বেশি দ্রুত আমরা যদি নির্গগমন না কমাতে পারি বিশ্বব্যাপী তাহলে ভয়াবহ পরিণতির দিকে পৃথিবী এগিয়ে যেতে পারে।”

আহসান বলেন, তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী প্যারিস সম্মেলনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সবাই উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে যে যার দেশে নির্গমন কমালেও ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার সীমানা ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর চেয়ে কম হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না।

“যে যার মতো করে যদি এগোয়, তাহলে সম্ভবত ২০৫০ এর মধ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা সেটাও বোধ হয় ঠিক থাকবে না। অর্থাৎ আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী আয়োজন যথেষ্ট না। আমাদের ২১০০ সালে যেখানে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকবার কথা, আমরা ২০৫০ এর ভেতরে ২১০০ সালের টার্গেট অনেক দূর পার করে ফেলব। এবং আমাদের ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে পৃথিবী চলে যাবে, এটা একদম সুনিশ্চিত।”

আহসান বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী উচ্চাকাঙ্ক্ষার দশক শুরু করার কথা ছিল। অর্থাৎ ২০২০ এর দশকটা হবে উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের দশক।

“ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, আমরা বোধ হয় এ দশকটা শুরু করবার সময়কালে এ দশকই পাব না। কারণ এখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষায় পৌঁছানোর জন্য নির্গমন হ্রাসের ক্ষেত্রে হোক, অর্থায়নের ক্ষেত্রে হোক, কারিগরি সহযোগিতার ক্ষেত্রে হোক-সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের ধীরে চল নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে।”

জলবায়ু পরিবর্তন: আইপিসিসির প্রতিবেদনে মানবজাতির জন্য সতর্কবার্তা

১৪২ বছরে সবচেয়ে উষ্ণতম মাস জুলাই  

দেন-দরবার আর অর্থায়ন

জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে উন্নত দেশগুলোর অর্থায়নের যে প্রতিশ্রুতি ছয় বছর আগে প্যারিস সম্মেলনে এসেছিল, তা পূরণ এখনও হয়নি।

অর্থায়নের ক্ষেত্রে অনেক দেশ ইতোমধ্যে ‘ফাঁকি দেওয়া’ শুরু করে দিয়েছে, মন্তব্য আহসান আহমেদের।

তিনি বলেন, বহু বছর আগে পৃথিবীময় ঐকমত্য ছিল যে, দরিদ্র দেশগুলো যেহেতু নানাভাবে বছরের পর বছর শতাব্দী ধরে তারা লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে, কলোনাইজড হয়েছে, তাদের অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়েছে, মানুষ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছে । সুতরাং এ ক্ষতিপূরণের জন্য উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো তাদের গড় জাতীয় আয়ের দশমিক ৭ শতাংশ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিতে থাকবে। যতদিন না পৃথিবীকে দারিদ্র্যমুক্ত করা যায়।

“মোদ্দা কথা হলো, যে দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অর্থায়ন করবার কথা সে অর্থায়ন আগের চেয়ে কমছে। আমাদের মতো দেশগুলো উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে তাদের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে নির্গমন হ্রাস করব, অথচ উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য আমাদের যে অর্থায়ন দরকার এটা তারা আর নানাভাবে দিতে চাচ্ছে না।”

কপ ২৬ এর প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা। ছবি: রয়টার্স

কপ ২৬ এর প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা। ছবি: রয়টার্স

বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার করে তহবিল তৈরি করে সেটা কার্বন নির্গমন হ্রাসের ক্ষেত্রে কাজ করবে বলে প্যারিস সম্মেলনে প্রতিশ্রুতি এসেছিল।

আহসান বলেন, “কিন্তু এখনও পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে আমরা ৮০ বিলিয়নের নিচে আটকে আছি। এবং এ টাকার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ যেটুকু এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বিভিন্ন করপোরেট সেক্টরকে অর্থায়ন করে এ টাকা দেওয়া হচ্ছে।

“ফলে অভিযোজনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলো মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত কাজের মাধ্যমে জনগণের কাছে সেবাটা পৌঁছায়, উন্নয়নশীল দেশগুলো টাকাটা সেভাবে পাচ্ছে না।”

এটা ‘ব্যবসায়িক খাতে আটকে গেছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “৫০ শতাংশ অর্থায়ন অভিযোজনের কথা থাকলেও সেখানটায় মনোযোগ নেই, সারা বিশ্বব্যাপী অভিযোজনের অর্থায়ন মাত্র ১৩ শতাংশ।

“এটা মোটেই কাম্য নয়। অর্থায়নে যে ফারাকটা তৈরি হয়েছে সেটা যদি পুরোটা অভিযোজনে দেওয়া যেত প্রতিবছর, তাহলে সম্ভব হতো অভিযোজনে একটা গতি পেত। কিন্তু সেটা পায়নি।”

তিনি বলেন, “আপাত দৃষ্টিতে অতি নগন্য পরিমাণ যে টাকা অভিযোজনে ব্যয়িত হচ্ছে সেখানটায় দেখা যাচ্ছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে, তবুও খানিকটা আসছে। কিন্তু আফ্রিকা অঞ্চল যেখানটা ইতোমধ্যে খরায় পুড়ছে, কোনো কোনো জায়গায় বন্যা ভাবও আছে, খরা-বন্যা যুগপৎ একই বছরে ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে আক্রমণ করছে। সেসব জায়গায় যতটা দ্রুত অর্থায়ন দরকার ছিল তাদের কৃষিকে বাঁচানো, গণমানুষের জীবিকা পুনর্গঠনের জন্য সেখানটায় মনোযোগ এখনও পর্যন্ত কম।

“ফলে অর্থায়ন, অর্থায়নের ক্ষেত্রে যে ঐকমত্য, মত ও পথের নানা বিভ্রান্তিতে পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো ভুগছে। এ ভোগান্তি মেয়াদী ভোগান্তিতে পরিণত হচ্ছে।”

কার্বনের বাজার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার কথাও বলেন আহসান আহমেদ, যে ধারণার সূত্রপাত হয়েছে ১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকল স্বাক্ষরের পর।

এই বাজারের মাধ্যমে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো বায়ুমণ্ডলে অধিকতর কার্বন নিঃসরণের অধিকার অর্জন করে এবং উন্নয়নশীল বিক্রেতা দেশগুলো তাদের কার্বণজনিত দাবি পূরণের সক্ষমতা অর্জন করে।

বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন লক্ষ্য।

বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন লক্ষ্য।

কিয়োটো প্রটোকলের আওতায় শিল্প বিপ্লবের পর থেকে যেসব দেশ মূলত নির্গমন বাড়ানোর জন্য দায়ী (অতিরিক্ত তালিকার ১-৩৯ টা দেশ) তারা অর্থায়ন করবে। আর তুলনামূলকভাবে সহযোগিতা প্রত্যাশী উন্নয়নশীল দেশে তারা অর্থায়ন করবে, যাতে কম কার্বন ব্যবহার করেও তারা অর্থনৈতিক শক্তিটাকে সুদৃঢ় করতে পারে।

আহসান বলেন, “অর্থায়ন অতি প্রয়োজনীয় এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তির বেশিভাগ গবেষণা করে বের করা হয়েছে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে। এখন এটা যদি তারা উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে চায়, তাহলে আমাদের জন্য কোণঠাসা অবস্থা। ফলে সেখানেও সহযোগিতা লাগবে।”

কার্বন নির্গমন হ্রাস করতে উন্নয়নশীল দেশে সহযোগিতা, প্রযুক্তি কেনা ও অতি উচ্চমূল্যে ব্যবহারকারীকে ভাড়ায় আনতে গিয়ে অর্থনীতিতে ভাল প্রভাব রাখার বদলে বরং একটা খারাপ প্রভাব রেখে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তার।

“এক্ষেত্রে নির্গমন হ্রাস ঘটবে সামান্যই, কারণ আমার আগ্রহ থাকবে না বেশি ব্যয়ে এ ধরনের প্রযুক্তি আনবার জন্য। তার ফলে তারা (উন্নত দেশ) হয়ত বারবার আমাদের দায়ী করবে। আমি তো বলেছিলাম প্রযুক্তি দেব, এরা তো কিনছে না। অনেকটা এ ধরনের দোষারোপের খেলা চলতে থাকবে।”

তিনি বলেন, ২০০৯ কোপেনহেগেন সম্মেলনে ১০৯টি দেশের সরকার প্রধান উপস্থিত হয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে এত বড় সম্মেলন হয়নি। সেখানে একটা কথা ছিল যে, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো তাদের নিজেদের দেশের ভেতর অর্থনীতির পুনর্গঠন করবে, যাতে নির্গমন হ্রাস করা যায়।

নির্গমন কমাতে ওই চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে আহসান উদ্দিন বলেন, “সেটা সবক্ষেত্রে, যতগুলো ক্ষেত্রে করা যায়। কিন্তু সেই দায় থেকে এখন উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো, তারা একটা দায় মোচনের পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।”

প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ফারাক

গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের সদস্য আহসান আহমেদের ভাষ্যে, আসলে কোনোটাই যেন ঠিকমতো হচ্ছে না। এগুলো নিয়েই গ্লাসগোতে ব্যাপক আলোচনা হবে।

“অভিযোজন নিয়ে বড় একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে, প্রত্যাশার সঙ্গে ফারাক তৈরি হয়েছে প্রাপ্তির, হঠাৎ করে মিটবে বলে মনে হচ্ছে না। এটা এমন ভোজবাজির ব্যাপার না, আরও আনুষাঙ্গিক অনেক আলাপ রয়েছে।

বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যার মতো দুর্যোগ বাড়ছে বাংলাদেশে।

বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যার মতো দুর্যোগ বাড়ছে বাংলাদেশে।

তিনি বলেন, “ক্ষয়ক্ষতির যে আলোচনাটা এবারও মুখ্য আলোচনার বিষয়। সেখানে ক্ষয় ও ক্ষতির প্রস্তুতি যত বাড়বে, তত দুর্যোগের ঝুঁকি কমবে। এটা বিশ্বের সবাই মেনে নিয়েছে। কিন্তু এখানটায় অর্থায়ন সেভাবে আসছে না।”

সহযোগিতার মাত্রা বাড়ানোর বিষয়ে একটা মোটা দাগের ঐকমত্য থাকলেও তা কার্যকরের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশের প্রত্যাশা এক রকম, উন্নত দেশগুলো, যারা নির্গমন বেশি ঘটায়, তাদের আগ্রহ কম দেখছেন আহসান।

“প্রত্যাশা বিপুলভাবে মার খেয়েছে। আলোচনা যথেষ্ট এগোতে পারেনি। কারণ, অভিযোজনের একটা লক্ষ্য তৈরি করে দেওয়ার কথা ছিল, সময়ে সময়ে সেটা এগোতে থাকবে। কিন্তু এখানে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রায় নেতিবাচক।”

তবে এ বিষয়ে মোটাদাগের ঐকমত্য থাকার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন,“সেটাকে কার্যকরী ভূমিকায় আনতে যা করতে হবে, তা হয়নি। কপ-২৫ এ একটা কমিটি করে দেওয়া হয়েছে, এ বছর প্রতিবেদন দেবে।

“আগাম যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, প্রতিবেদন হবে অত্যন্ত ঢিলেঢালা। সুস্পষ্টভাবে যে পথে গেলে খুবই দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা কমিয়ে আনা বিষয়ক তথ্যাদি অত্যন্ত দুর্বলভাবে উপস্থাপিত হবে আশা করা হচ্ছে।

“সেখান থেকে একটা ধারণা পাওয়া যায় যে, আমাদের প্রত্যাশা হয়ত পূরণ হবে না। আমরা এসব ক্ষেত্রে নেই নেই করে হলেও ১০-১৫ বছর প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে আছি।”

বাংলাদেশের কী করণীয়?

সহযোগিতা প্রত্যাশী উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় এ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি চুলচেরা বিশ্লেষণগুলো তুলে ধরতে হবে।

“উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো, যাদের কারণে যাদের কার্বন আকাশ ভর্তি করে দিয়েছে; তারা একদিনে সব মেনে নেবে এমন আশা করা বোকার স্বর্গে বাস করার মতোই। তারা তাদের মার্কেট, তাদের বাজার, তাদের জীবন যাপন প্রক্রিয়া, তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া, তাদের প্রতিবেশ রক্ষার সবটাতে ঠিক মতো করেই এগোচ্ছে। ওরা চেষ্টা করবে এগুলো যত ধীরে ধীরে করতে হয়।”

গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের স্বাধীন কারিগরি উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ।

গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের স্বাধীন কারিগরি উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ।

তার মতে, “আমাদের প্রস্তুতি থাকতে হবে- কোনো একটা বিষয়ে যদি আমরা ভালো জানি, আমরা আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরব। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কেউ জিজ্ঞাসা করলে সহযোগিতার কথাগুলো তুলব, জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়ের কথা বলব, আবার একই সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজও করব।”

“আমার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলে তবে আমার কথা আন্তর্জাতিক মহল শুনবে। শুধু শুধু সম্মেলনে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করলাম, তাতে শুনে ফেলবে? আমার বিশ্লেষণ, আমার বক্তব্য এটা যদি চুলচেরা সঠিক না হয়, মনোগ্রাহী না হয়, তাহলে আমি আসলে যে সহযোগিতার জন্য যাই, খালি হাতে ফিরতে হবে,” বলেন তিনি।

আবার দেশে কী কী করা হচ্ছে, তাও তুলে ধরার পরামর্শ দেন এই গবেষক।

“আমাদের মতো দেশ যার নির্গমনণ এখনও কম, আগামীতে হবে। এ নির্গমনের কথা বিবেচনা করে আমাদের টেক্সটাইল শিল্পে, গার্মেন্টসের শিল্পে যাতে নির্গমণ হ্রাস করা যায়…

“আমরা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড-সবুজ জলবায়ু তহবিল থেকে আড়াইশ মিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা পেয়েছি। পাওয়া যে যায় না তা তো নয়, তার মানে আমাদের এ প্রস্তুতিও থাকতে হবে কীভাবে আন্তর্জাতিক সুবিধা থেকে আমাদের জন্য সহযোগিতা নিয়ে আসতে পারি।”

‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে’ একথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের সদস্য আহসান বলেন, “ওখানে আমাদের অংশগ্রহণ করতে হবে, চেঁচামেচি করতে হবে, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে যে আমি আমার চেষ্টাটুকু করছি।”

জলবায়ু দূতিয়ালির কাজে জোর দেওয়ার সুপারিশ করে তিনি বলেন, “জলবায়ু দুতিয়ালি অর্থাৎ ক্লাইমেট ডিপ্লোমেসি- এটায় আমাদের মনোযোগী হতে হবে। প্রয়োজনে এটার জন্য ট্রেইনিং দরকার, কোর্স দেওয়া দরকার।

“আমি কী কী বুঝি? কারণ মূলত মোটা দাগের জিনিসগুলোও যদি না বুঝি তাহলে কুশল বিনিময়ের পর আমার যা বলা দরকার তা বলতে পারব না। আমার জানতে হবে, জানাতেও হবে। দুটোই দরকার।”

এছাড়া জনমানুষকে কতটা জানানো হবে? কীভাবে জানানো হবে? কীভাবে অংশগ্রহণে সহযোগিতা করা হবে? এই বিষয়গুলো নিয়ে কপ সম্মেলনে যাওয়ার আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হওয়া দরকার বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।