১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ৬ মাঘ ১৪২৫

সুমিতা দেবীকে ‘মূল্যায়ন করা হয়নি’

  • সাইমুম সাদ, নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-01-07 18:52:55 BdST

bdnews24
ছবিটি পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া। সৌজন্যে: ভাষা রায়হান।

প্রথিতযশা অভিনেত্রী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক সুমিতা দেবীকে আজও যথাযথ ‘মূল্যায়ন করা’ হয়নি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন তার পরিবারের সদস্যরা; এমনকি তার মৃত্যুদিবসও মনে রাখেনি চলচ্চিত্র বিষয়ক সংগঠনগুলো।

রোববার (৬ জানুয়ারি) বাংলা চলচ্চিত্রের ‘ফাস্টলেডি’ খ্যাত এ অভিনেত্রীর মৃত্যুবার্ষিকী ছিল; এদিন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কোনও সংগঠনের তরফ থেকে কোনও আয়োজন করা হয়নি বলে জানালেন তার ছোট ছেলে অনল রায়হান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, “জীবিতকালেও মা অবমূল্যায়িত ছিলেন; আর মৃত্যুর পর তো মানুষ তাকে ভুলেই গেছে।”

অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য নিজের জাত-ধর্ম, বাবা-মা, পরিবার-পরিজন ও চিরচেনা কলকাতা শহরকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন তিনি।

তারুণ্যে সুমিতা দেবী। ছবি সৌজন্যে: ভাষা রায়হান।

তারুণ্যে সুমিতা দেবী। ছবি সৌজন্যে: ভাষা রায়হান।

১৯৩৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এ শিল্পীর পারিবারিক নাম হেনা ভট্টাচার্য। পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ফতেহ লোহানীর ‘আসিয়া’ ও ‘আকাশ আর মাটি’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে রূপালী পর্দায় অভিষেক ঘটে তার। ফতেহ লোহানীই তাকে ‘সুমিতা দেবী’ নামটি দেন।

‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করে রাতারাতি খ্যাতি পাওয়া এ শিল্পী তিন যুগেরও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘ওরা এগারো জন’, ‘সুজন সখী’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘আমার জন্মভূমি’, ‘চিত্রা নদীর পারে’র মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। আরও আছে ‘সোনার কাজল’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘দুই দিগন্ত’, ‘এই তো জীবন’, ‘অশান্ত প্রেম’।

অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাণেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘মোমের আলো’, ‘মায়ার সংসার’, ‘আদর্শ ছাপাখানা’ ও ‘নতুন প্রভাত’ চলচ্চিত্রে নির্মাণ শৈলী দেখিয়েছেন তিনি।

জহির রায়হানের পরিচালনায় উর্দু চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’-এ অভিনয় করেন তিনি। পরে আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে পরস্পরের প্রেমে পড়েন জহির রায়হান-সুমিতা; ১৯৬১ সালে সেই প্রণয়ে পরিণয়ে রূপ নেয়। তাদের সংসারে বিপুল রায়হান ও অনল রায়হান নামে দুই ছেলের জন্ম হয়।

বিয়ের পর ছাড়লেন নিজের ধর্ম

জহির রায়হানের সংসার শুরুর পর হিন্দু ধর্ম থেকে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত তিনি; পরে তার নাম হয় নিলুফার বেগম। ধর্ম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের বাবা-মা, ভাই-বোনদের সঙ্গেও দূরত্ব দেওয়াল তৈরি হয় তার। কলকাতার পুরো সমাজই সামাজিকভাবে বর্জন করেছিল তাকে।

স্বামী-নির্মাতা জহির রায়হানের সঙ্গে...ছবি সৌজন্যে: ভাষা রায়হান।

স্বামী-নির্মাতা জহির রায়হানের সঙ্গে...ছবি সৌজন্যে: ভাষা রায়হান।

“উনি ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে ছিলেন। ওনার ধর্মান্তরিত হওয়াটা পরিবারের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়াটা স্বাভাবিক ছিল না। তারপর থেকে পরিবারের কারও সঙ্গেই উনার যোগাযোগই ছিল না।” বলেন অনল রায়হান।

মায়ের এই ত্যাগকে ‘আইকনিক’ ত্যাগ হিসেবে দেখছেন তিনি।

অর্থ লগ্নি করলেন জহির রায়হানের সিনেমায়

বিয়ের পর স্বামী-নির্মাতা জহির রায়হানকে নির্মাণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও সহযোগিতা করেছিলেন তিনি। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরুর আগে জহির রায়হানের হাতে কোনও কানাকড়ি ছিল না। তখন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য শুরুতেই এফডিসিতে ২৫ হাজার টাকা জমা দিতে হত। তখনকার শীর্ষস্থানীয় নায়িকা হিসেবে এফডিসির প্রধানকে বলে সেই অর্থ মওকুফ করে নিয়ে নিয়েছিলেন সুমিতা দেবী।

শুটিং শুরুর পর দফায় দফায় চলচ্চিত্রের পেছনে অর্থ লগ্নি করে জহির রায়হানকে নির্মাণে উৎসাহিত করেন।

অবদান রাখলেন মুক্তিযুদ্ধে

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি; আর তথ্যচিত্র নির্মাণ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালান জহির রায়হান। মুক্তিযুদ্ধের সময় দু’জনের কাছেই কোনও টাকা-পয়সা ছিল না। নিজেদের সবটুকু অর্থ প্রবাসী সরকারের তহবিলে জমা দিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের এফডিসিতে থাকার ব্যবস্থা করেছেন সুমিতা; তাদের চুল কাটিয়েছেন, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন।

দিলীপ কুমারের সঙ্গে সুমিতা দেবী।ছবিটি পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া।

দিলীপ কুমারের সঙ্গে সুমিতা দেবী।ছবিটি পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া।

তখন তার কোলে দুই সন্তান অনল-বিপুল। মায়ের মুখ থেকে শোনা যুদ্ধদিনের সেই গল্প শোনালেন অনল, “মায়ের কাছ থেকে শুনেছি, এফডিসিতে ফ্লোরের মধ্যে দিনে পর দিন আমাদের পড়ে থাকতে হতো। তখন আমাদের খুব ভয়ংকর দিন কেটেছে। পরে গেরিলা যোদ্ধাদের সঙ্গে কলকাতায় রওনা করেছিলেন বাবা-মা।”

কলকাতায় যাওয়ার পথে একাধিকবার পাকিস্তানি আর্মিদের বন্দুকের নলের মুখ থেকে ফিরেছে পরিবারটি।

যুদ্ধের পুরো ৯ মাস দেশের জন্য কাজ করেছেন সুমিতা দেবী। কলকাতায় বাংলাদেশি শিল্পীদের সংগঠনের ব্যানারে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মিছিল-মানববন্ধন করেছেন। কলকাতার বাইরে দিল্লি হয়ে মাদ্রাজ থেকেও লোকজনের কাছ থেকে চাঁদা তুলে প্রবাসী সরকারের তহবিলে জমা দিয়েছেন।

শেষ জীবনে পড়েছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানলে

স্বাধীনতার বছর দশেকের মাথায় আশির দশকে সামরিক সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা এ গুণী শিল্পীকে। তার জীবনের শেষ দিনগুলি কেটেছিল নিরাপত্তাহীনতা আর উৎকণ্ঠায়। মেজর জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মাদ এরশাদের শাসনামলে দুই দফায় তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়। বাড়ির সামনে তোশক, বালিশ, টিভি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা হয়েছিল।

“তখন ম্যাজিস্ট্রেটের পা পর্যন্ত ধরেছিলেন মা। মা একজন যোদ্ধা; তার তখনকার মনের অবস্থাটা কল্পনা করতে পারছেন?”-আবেগতাড়িত হয়ে সেইদিন চোখের সামনে ঘটনা বর্ণনা করলেন তার ছেলে।

অনলের ভাষ্যে, “মারা যাওয়ার আগ অব্দি মা সবসময় ভয়ের মধ্যে ছিলেন। তার মনে শঙ্কা ছিল, এই বুঝি আবার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে এলো। মৃত্যুর আগে একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে যন্ত্রণার কিছু থাকে?”

ইউরোপের মতো দেশে সুমিতা দেবী জন্ম নিলে অন্তত সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারতেন; এই জীবদ্দশায় ধরনের হেনস্তার শিকার হতে হতো না, বললেন তার ছেলে।

সুমিতা দেবীর অবমূল্যায়ন কেন?

মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ শিল্পীকে স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও একুশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পদকে সম্মানিত করা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন কিংবা এফডিসিও তাকে মনে রাখেনি। এই মূল্যায়নহীনতা কেন? প্রশ্নটা করা হয়েছিল অনল রায়হানকে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে নিজের তিনটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরলেন তিনি।

অনল রায়হান ছবি: ফেইসবুক থেকে নেওয়া

অনল রায়হান ছবি: ফেইসবুক থেকে নেওয়া

এক. শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক আদর্শের কারণে এমনটা ঘটতে পারে। আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবীণদের ভুলে যাওয়ার অভ্যাসটা খুব পুরানো। প্রবীণরা জীবিতকালেই ঠিকঠাক মতো মূল্যায়ন পায় না, মারা যাওয়ার পর তো আর কোনও জায়গা থাকে না।

১৯৮৫ সালের পর থেকে আমাদের ‍দুই ভাইকে নিয়ে খুব আর্থিক সংকটে দিন কাটিয়েছেন মা। আমরা এগুলো দেখে বড় হয়েছি। অথচ ওনার মতো অভিনেত্রীর পাশে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থাকতে পারত; থাকেনি। আমার মনে হয়, এখন এফডিসিতে গেলে সুমিতা দেবীর কোনও ছবি দেখা যাবে কি না সন্দেহ আছে!

দুই. দ্বিতীয় কারণ হতে পারে ‘ধর্ম ’। উনি মুসলমান হয়েছিলেন কিন্তু ফিল্মে নামটা সুমিতা দেবীই রেখেছিলেন। ব্যাপারটা অনেকে হয়তো ভালোভাবে নিতে পারেননি।

তিন. মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের রাজনীতিতে অনেক রাজাকার ঢুকেছে। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধে সুমিতার দেবীর অবদান খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। ফলে সেখানে একজন সুমিতা দেবীর হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উনার পেশার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তারাই যদি মূল্যায়ন না করে তাহলে কী হবে? এখন অন্তত তাকে মূল্যায়ন করা হোক; একুশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পদকের মতো সম্মানে সম্মানিত করা হোক।