সিনেপ্লেক্সের টিকেটে প্রযোজকদের অংশ ঠিক করে দেবে সরকার

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-18 18:03:16 BdST

bdnews24

সিনেপ্লেক্সগুলোতে বিক্রি হওয়া টিকেটের কত শতাংশ অর্থ প্রযোজকরা পাবেন, তা ঠিক করে দেবে সরকার।

চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক, পরিচালক ও প্রদর্শক সমিতির নেতাদের সঙ্গে মঙ্গলবার সচিবালয়ে বৈঠকের পর তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ একথা জানান।

এর আগে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতে চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক, পরিচালক ও প্রদর্শক সমিতির নেতারা তাদের দাবি-দাওয়াগুলো মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। তথ্য সচিব কামরুন নাহারও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

সভার শুরুতে তথ্যসচিব বলেন, “হল কমতে কমতে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, হল মালিকরা হল ভেঙে ফেলছেন। এটা কীভাবে সমাধান করা যায়, সেই উপায় বের করতে হবে।”

চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশেক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বলেন, “আগে বলতাম প্রযোজক বাঁচলে চলচ্চিত্র বাঁচবে, এখন বলছি হল বাঁচলে চলচ্চিত্র বাঁচবে।”

বাংলাদেশে এক সময় ১ হাজার ৩০০ সিনেমা হল ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “গত বার ১৭০টি হলে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া গেছে। এবার ৮০টির উপর হল খুঁজে পাইনি। আমাদের চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে হবে।”

চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার প্রদর্শকদের কাছ থেকে প্রযোজকদের অর্থ কম পাওয়ার অভিযোগ তোলেন। 

তিনি বলেন, সিনেপ্লেক্সগুলোতে একটি টিকেট বিক্রি করে ৪৫০ টাকা নেওয়া হলে সেখান থেকে প্রযোজককে মাত্র ৫৫ টাকা দেওয়া হয়।

আর অন্য প্রেক্ষাগৃহগুলোতে ২৫০ টাকার টিকেট থেকে ৩৩ টাকা, ২০০ টাকার টিকেট থেকে ১৭ টাকা এবং ১৬০ টাকার টিকেট থেকে ১৩ টাকা প্রযোজক পান বলে জানান তিনি।

প্রযোজকরা হল মালিকদের কাছ থেকে ট্যাক্স বাদে টিকেটে বিক্রির অর্ধেক টাকা যাতে পান, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান গুলজার।

তিনি বলেন, “ভালো সিনেমা আমদানি করে হলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। কিন্তু আমাদের সিনেমাও যেন বাড়ে সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে।”

প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের সংগঠন চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি কাজী শোয়েব রশীদ দেশে ‘ভালো’ চলচ্চিত্রের অভাবের বিষয়টি তুলে ধরে তাদের ব্যবসায় এর প্রভাব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “দেশীয় ছবির মান যথেষ্ট ভালো হচ্ছে না কেন? ব্যবসা যদি লাভজনক না হয়, তাহলে কেউ বিনিয়োগ করবে না। সিনেপ্লেক্স বা গোডাউন বানিয়ে ভাড়া দিলে যদি বেশি টাকা পাওয়া যায়, তবে হল তো বন্ধ করে দেবেই।”

চলচ্চিত্রকে শিল্প ঘোষণা করা হলেও এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কোনো সুবিধা পাচ্ছে না বলে দাবি করেন রশীদ।

দেশীয় চলচ্চিত্র যথেষ্ট মুক্তি না পেলে প্রতি মাসে এক বা ‍দুটি বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি চান তিনি।

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ্ত কুমার দাস বলেন, “দেশীর ছবির অভাবে সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রযোজক ছবি না বানালে তার খরচ থাকে না, কিন্তু হলে সিনেমা না চললেও প্রতিদিনই খরচ হয়।”

প্রেক্ষাগৃহে বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্যিক হারে নেওয়ার তথ্যটি তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিকাল ৫টার পর সেই বিল আরও বেড়ে যায়। এসব নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। চলচ্চিত্র শিল্পের বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানিতে এনবিআর ট্যাক্স ধার্য করে রেখেছে।”

প্রেক্ষাগৃহগুলোতে টিকেট বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তা থেকে সরকারের ট্যাক্স বাদ দিয়ে সিনেমা হল মালিক ও প্রযোজক যাতে সমান ভাগ পায়, তা নিশ্চিত করার দাবি জানান সুদীপ্ত।

সবার বক্তব্য শুনে তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতপক্ষে চলচ্চিত্রের বিশেষ করে সিনেমা হলের যে অবস্থা, অনেকগুলো হল বন্ধ হয়ে গেছে। হল না থাকলে তো চলচ্চিত্র বাঁচবে না, কারণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মূল মাধ্যম হচ্ছে হল।

“আপনারা বলছেন, সিনেমা হল থেকে প্রযোজকরা টাকা পায় না। প্রথম দিকে আমরা সিনেপ্লেক্সগুলোতে একটা পারসেন্টেজ নির্ধারণ করে দিতে পারি, পরবর্তী ধাপে আমরা সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হলে যাব।”

হাছান বলেন, “সিনেপ্লেক্সে টিকেটের দাম কোনো জায়গায়ই ৩০০ টাকার কম নয়। সেখানে থেকে প্রযোজক মাত্র ৩০ টাকা পাবেন, এটা হওয়া উচিৎ নয়।”

নির্দিষ্ট সংখ্যক সিনেমা মুম্বাই থেকে আমদানির বিষয়ে পরিচালক ও প্রযোজক সমিতি একমত রয়েছে জানিয়ে হাছান বলেন, “আমি এ ব্যাপারে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, এ ব্যাপারে শিল্পী সমিতি এখন পর্যন্ত সম্মতি দেয়নি। আমি সব পক্ষের সম্মতি ছাড়া এটা করতে চাই না। অতীতে একবার করা হয়েছিল, সেটা নিয়ে আন্দোলন হয়েছে।”

হল মালিকদের কীভাবে স্বল্প সুদে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ দেওয়া যায় তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে পুশ করলে ঠিকমতো আগাচ্ছে না। এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে হলে কীভাবে কী করা যায়, সেটা নিয়ে গতকালও কথা বলেছি। আমরা আশা করছি, যেভাবে লেগে আছি অবশ্যই একটা সমাধানে পৌঁছাতে হবে।”

প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের কম হারে বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দেবেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তথ্যমন্ত্রী।

এছাড়া চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট মালামাল আমদানির ক্ষেত্রে শিল্প হিসেবে সুবিধার জন্য এনবিআরের সঙ্গে কথা বলবেন জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু শিল্প ঘোষণা করলেই এনবিআর ট্যাক্স সুবিধা দিতে পারে না। এক্ষেত্রে এনবিআরের গেজেট নোটিফিকেশনে পরিবর্তন আনতে হবে।

চলচ্চিত্রে সঙ্কট কাটিয়ে তুলতে সরকার সচেষ্ট জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের লক্ষ্য চলচ্চিত্রকে অতীতের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া নয়, এই চলচ্চিত্র বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করবে এবং বিশ্ববাজারে স্থান দখল করবে, এটাই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য।”

তিনি বলেন, “সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হল বন্ধ হলেও সিনেপ্লেক্স বাড়ছে। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে ঢাকায় ১০/১৫টির বেশি হবে। চট্টগ্রাম শহরেও ৬/৭টি হয়ে যাবে। দেশের অন্যান্য যায়গায়ও হচ্ছে।

“একটি প্রতিষ্ঠান সারাদেশে ১০০টি সিনেপ্লেক্স করার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এক থেকে দুই বছরের মধ্যে যে সঙ্কট সেটা কেটে যাবে।”

চলচ্চিত্রে অনুদানের অর্থ ৫ কোটি টাকা থেকে ১০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানান তথ্যমন্ত্রী। একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান ৬০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ লাখ টাকা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

হাছান মাহমুদ আরও বলেন, “আমরা নীতিমালা পরিবর্তন করতে যাচ্ছি, অনুদানের যে ছবিগুলো বানানো হবে, তা হলে মুক্তি দিতে হবে। আগে অনুদানের ছবি হলে মুক্তি দিত না, আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিত।”