কপিরাইট আইন: ‘ধোপে টিকছে না’ শাকিব খানের যুক্তি

  • সাইমুম সাদ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-07-01 17:00:49 BdST

নব্বইয়ের দশকের ‘পাগল মন’ গানের তিন স্বত্ত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়া গানটি ‘রিমেক’ করায় কপিরাইট আইন লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে চিত্রনায়ক ও প্রযোজক শাকিব খানকে।

গানটির স্বত্ত্বাধিকারী হিসেবে গীতিকার প্রয়াত আহমেদ কায়সার, সুরকার আশরাফ উদাস ও কণ্ঠশিল্পী দিলরুবা খানকে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর কপিরাইট সনদ দিয়েছে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস।

কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শাকিব খান সনদপ্রাপ্ত স্বত্ত্বাধিকারীদের অনুমতি ছাড়া ‘পাগল মন’ গানের ‘পিক লাইন’ ও সুর তার ‘পাসওয়ার্ড’ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করে থাকলে তা হবে কপিরাইট আইনের ৭১ ধারার লঙ্ঘন।

আর অভিযোগ প্রমাণিত হলে কপিরাইট আইনের ৮২ ধারায় ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

‘পাসওয়ার্ড’ চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রযোজক শাকিব খান দাবি করেছেন, গানের রেকর্ডিংয়ের আগে শিল্পী দিলরুবা খানের কাছ থেকে ‘মৌখিকভাবে’ অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।

তবে তা উড়িয়ে দিয়ে দিলরুবা খান বলেছেন, শাকিব খানকে তিনি কোনো অনুমতি দেননি। গানের সুরকার আশরাফ উদাসও একই কথা বলেছেন।

কপিরাইট অফিস বলছে, কপিরাইট হিসেবে নিবন্ধিত কোনো গান ব্যবহারের জন্য স্বত্ত্বাধিকারীর স্বাক্ষরসহ লিখিত চুক্তি থাকতে হবে; মৌখিক অনুমতির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।

কপিরাইট আইনের ১৯ ধারায় কোনো ‘কর্ম’ ব্যবহারের আগে লিখিত অনুমতি নেওয়ার কথা স্পষ্ট বলা আছে; ফলে অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হলে তা হবে বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

শাকিব খান এর আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন, গানের মাত্র দুই লাইন ব্যবহার করলে অনুমতি নিতে হবে কেন?

এ বিষয়ে জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, “দুই লাইন না, অনুমতি ছাড়া দুটি শব্দ কিংবা সামান্য সুরও ব্যবহার করলে সেটা বেআইনি। গান শুনে কেউ যদি বুঝতে পারেন এই গানের সুরটা ওই গানের; তাহলেও সেটা কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন।”

শাকিব খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এসকে ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত ‘পাসওয়ার্ড’ চলচ্চিত্রটির ২০১৯ সালে মুক্তি পায়। প্রযোজনার পাশাপাশি তাতে অভিনয়ও করেছেন শাকিব।

তার সঙ্গে ছবির প্রযোজক হিসেবে ছিলেন মোহাম্মদ ইকবাল। পরিচালনা করেছেন মালেক আফসারী।

গত ৭ মার্চ ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে ‘পাসওয়ার্ড’র প্রযোজক শাকিব খানের কাছে গানটির তিন স্বত্ত্বাধিকারীর পক্ষে উকিল নোটিস পাঠিয়েছিলেন ব্যারিস্টার ওলোরা আফরিন।

একই নোটিসে টেলিকম অপারেটর রবির বিরুদ্ধে গানটি অনুমতি ছাড়াই বিজ্ঞাপনচিত্রে ব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

বিষয়টির সুরাহা না পাওয়ায় রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশনে অভিযোগ করেন ওলোরা।

পরে কপিরাইট আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সোমবার গুলশান থানায় জিডি করেন দিলরুবা খান।

শাকিব খান ও রবির বিরুদ্ধে ‘শিগগিরই’ আদালতে মামলা করবেন বলে জানান ওলোরা।

‘পাগল মন’ সমাচার

বাংলাদেশ বেতারের জন্য আশির দশকের শুরুর দিকে গানটি লিখেছিলেন প্রয়াত গীতিকার আহমেদ কায়সার। সুরকার আশরাফ উদাসের সুরে দিলরুবা খানের কণ্ঠে গানটি শ্রোতামহলে বেশ সাড়া ফেলে।

পরে নব্বইয়ের দশকে পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল তার পরিচালিত চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করেন; গানের শিরোনাম থেকে চলচ্চিত্রের নামও দেন ‘পাগল মন’। বকুলের সঙ্গে ছবিটি সহপ্রযোজনা করেন নাদের চৌধুরী।

পাগল মন গানের সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী

পাগল মন গানের সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী

আশরাফ উদাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গানটি বকুলকে শুধু চলচ্চিত্রে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলাম আমরা। আর অন্য কোনো অধিকার তাকে দিইনি।”

পরে অনুপম রেকর্ডিং মিডিয়ার কর্ণধার আনোয়ার হোসেনের কাছে ‘পাগল মন’ সিনেমার ‘ডিজিটাল রাইটস’ বিক্রি করেছেন তোজাম্মেল হক বকুল।

এর আওতায় সিনেমাটি ইউটিউবসহ ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশের অনুমতি পান আনোয়ার।

‘পাগল মন’ চলচ্চিত্রের সহপ্রযোজক নাদের খান ‘পাসওয়ার্ড’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। গানটি রিমেক করার আগে তার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছিল বলে প্রযোজক মোহাম্মদ ইকবালের ভাষ্য।

তবে গানটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া কিংবা না দেওয়ার কোনো অধিকার নাদের খানের নেই বলে জানিয়েছে কপিরাইট অফিস।

জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, গানটি ‘পাগল মন’ চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি করা হলে প্রযোজকের অধিকার থাকত। কিন্তু চলচ্চিত্রের জন্য নয়, বাংলাদেশ বেতারের জন্য গানটি তৈরি করা হয়েছে। পরে চলচ্চিত্রে শুধু ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

অনুপম রেকর্ডিং মিডিয়ার কর্ণধার আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকেও অনুমতি নেওয়ার কথা বলেছেন ইকবাল।

তবে আনোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “সেই গান ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা তো আমার নাই। আমি শুধু ডিজিটাল রাইটস নিয়েছি। তবে দুই লাইন নিয়ে গান করলে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো আপত্তি নেই।”

কপিরাইট অফিসও বলছে, আনোয়ার হোসেন শুধু চলচ্চিত্রের ‘ডিজিটাল রাইটস’ পেয়েছেন; গানের অনুমতি দেওয়া কিংবা না দেওয়ার কোনো অধিকার তার নাই।