‘অপারেশন জ্যাকপট’: অচলাবস্থা কাটার আশা

  • সাজিদুল হক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-08-13 23:51:18 BdST

bdnews24
একাত্তরে অপারেশন জ্যাকপটে বিধ্বস্ত নৌযানের এই ছবিটি প্রকাশিত হয়েছে বাংলাপিডিয়ায়

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে অচলাবস্থা কাটার আশা জেগেছে।

সিনেমাটি যাতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নির্মাণ করা যায়, সে ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে এ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

১৯৭১ সালের ১৫ অগাস্ট চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে একযোগে বাংলাদেশের নৌ কমান্ডোদের প্রথম অভিযান হয়, যার নাম ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’।

নৌ-কমান্ডোদের দুঃসাহসিক এ অভিযানের চলচ্চিত্রায়ন করতে ২০১৭ সালের মার্চে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘মনপুরা’ খ্যাত নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিমকে।

দুই বছরে নৌ-কমান্ডোদের সঙ্গে কথা বলে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও চূড়ান্ত করেন তিনি; লোকেশন নির্ধারণের কাজও অনেকটা এগিয়ে রাখা হয়, পরিকল্পনা করেন কাস্টিং নিয়েও। সংগীত পরিচালক হিসেবে এ আর রহমানকে নেওয়ার পরিকল্পনা কথা সেসময় জানিয়েছিলেন সেলিম।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিনেমাটি নির্মাণের জন্য ৩০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান (ডিপিপি) পাঠানো হয়।

কিন্তু নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় পরিকল্পনাটি গ্রহণ না করে প্রস্তাবনাটি পুর্নমূল্যায়ন করার জন্য চিঠি পাঠায় চট্টগ্রাম বন্দরকে।

‘অপারেশন জ্যাকপটে’ ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ নৌ-কমান্ডোর  

অপারেশন জ্যাকপটের ৩০ কোটি টাকার ‘গরিবি বাজেট’  

অনিশ্চয়তায় ‘অপারেশন জ্যাকপট’র মহরত  

অপারেশন জ্যাকপটের চিত্রনাট্য প্রধানমন্ত্রী দেখবেন: নৌমন্ত্রী  

‘অপারেশন জ্যাকপট’র চলচ্চিত্রায়ন হচ্ছে  

এরপর ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সিনেমার কাজ ‘স্থগিত’ হয়ে যায়। যদিও সে সময় বিষয়টি স্বীকার করেনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এদিকে এ সিনেমার কাজ শুরু হওয়ার সময় ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলেন একাত্তরের নৌ কমান্ডো আবু মুসা চৌধুরী।

সিনেমাটির নির্মাণ পরিকল্পনার সময় নৌমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন শাজাহান খান, বর্তমানে যিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম শাজাহান খান বলেন, “কাজ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেটি এগোয়নি। সংসদীয় কমিটি এবার উদ্যোগ নিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সিনেমাটি করা যায় কিনা। সে ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছে। আশা করছি এবার ভালো ফলাফল পাব।”

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সাবেক এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছবিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে এতদিনে হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কিছু আমলার কারণে সেটা করা যায়নি। সংসদীয় কমিটিতে সে সময় আমরা এগুলো নিয়ে আলোচনাও করেছিলাম। চলচ্চিত্রটি হওয়া দরকার।”

নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিনেমাটি যদি করা যায়, তাহলে খুব ভালো একটি কাজ হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় একটি অধ্যায় ‘অপারেশন জ্যাকপট’। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে যদি আমরা চলচ্চিত্রটি জাতিকে উপহার দিতে পারি, তবে দারুণ একটা কাজ হবে।”

জীবনবাজির ‘জ্যাকপট’ 

১৯৭১ সালের মার্চের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সাবমেরিন পি এন এস ম্যাংরো ফ্রান্সে যায় পাকিস্তানি সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষণের জন্য। সেই ৪১ নৌসেনার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি অফিসার। তাদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা জেনে পালিয়ে লন্ডনের ভারতীয় দূতাবাসে আশ্রয় নেন।

এরপর মাদ্রিদ, জেনিভা, রোম ও বার্সেলোনা হয়ে তারা দিল্লি পৌঁছান। ঐতিহাসিক পলাশীর ভাগীরথির তীরে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ওই নয়জনসহ মোট ১৪৮ জন নৌ কমান্ডো অপারেশন জ্যাকপটের জন্য প্রস্তুত হন।

মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের যুদ্ধাঞ্চলকে যে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, তার মধ্যে ১০ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিলেন নৌ-কমান্ডোরা।

১৯৭১ সালের ১০ অগাস্ট কমান্ডোরা বাংলাদেশে ঢোকেন এবং ১৫ অগাস্ট মধ্যরাতে অপারেশন পরিচালনার জন্য চূড়ান্ত সংকেত পান।

চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ৬০ জনের কমান্ডো গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী (বীরউত্তম)। অপারেশন পরিচালিত হয় সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে।

‘জেনানা হ্যায় ছোড় দো’  

‘দেহরক্ষীকে বলেছিলাম, ধরা পড়লে গুলি করতে’  

‘অপারেশন জ্যাকপটের’ প্রস্ততি যেভাবে  

অপারেশন জ্যাকপট: মুক্তিযুদ্ধের ‘টার্নিং পয়েন্ট’  

মুক্তিযোদ্ধারা জানতেন, তাদের এই অভিযান সফল হলে বাঙালি জাতিকে তা এগিয়ে নেবে বিজয়ের বন্দরের পথে। আর ব্যর্থতার ফল হবে মৃত্যু। এ কারণে লিম্পেট মাইন নিয়ে মরণপন সেই অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন জ্যাকপট’।

১৫ অগাস্ট রাত ১২টায় শুরু হয় অপারেশন। কমান্ডোরা জাহাজে মাইন সংযোজন করে ফিরে আসেন। কিছু মাইন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বিস্ফোরিত হয়। ‘এমভি হরমুজ’ ও ‘এমভি আল-আববাস’ নামে দুটি পাকিস্তানি জাহাজসহ বেশ কয়েকটি বার্জ ও জাহাজ ধ্বংস হয়।

সাবমেরিনার আহসানউল্লাহর (বীরপ্রতীক) নেতৃত্বে ৪৮ জন নৌ-কমান্ড মোলা বন্দরে অভিযান চালান। তাদের বসানো মাইনে বন্দরের ছয়টি জাহাজ ধ্বংস হয়।

চাঁদপুর নদীবন্দর অভিযানে ছিলেন সাবমেরিনার বদিউল আলমের (বীরউত্তম) নেতৃত্বে ২০ জন নৌ-কমান্ডো। তারাও কয়েকটি জাহাজ ধ্বংস করেন।

সাবমেরিনার আবদুর রহমান (বীরবিক্রম) ও শাহজাহান সিদ্দিকের (বীরবিক্রম) নেতৃত্বে ২০ জনের কমান্ডো দল নারায়ণগঞ্জ ও দাউদকান্দি নদীবন্দরে সফল অভিযান পরিচালনা করেন।

বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌ-অভিযানের খবর ফলাও করে প্রচারিত হয়। একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ বিরাজ করছে বলে বহির্বিশ্বে যে প্রচার পাকিস্তান সরকার চালাচ্ছিল, নৌ-কমান্ডোদের ওই সফল অভিযানের মাধ্যমে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এরপর কোনো বিদেশি জাহাজ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসতে রাজি হয়নি।

১৯৯৭ সালে কমোডর হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর ভাষায়, অপারেশন জ্যাকপট ছিল মুক্তিযুদ্ধের ‘টার্নিং পয়েন্ট’।